রিডিং রুম

অতিকায় হস্তি লোপ পাইয়া, টিকিয়া ছিল তেলাপোকা!

বাংলাদেশের অনেকগুলো নেতিবাচক ব্যাপারের শুরুটা করে গিয়েছিলেন এরশাদ। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা, পীর ফকির দরবেশদের রাষ্ট্রীয় ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা- এগুলো এরশাদের ‘অমূল্য’ কীর্তি। যদিও ব্যক্তিগত ভাবে ইসলামের ধারেকাছে ছিলেন না। নারী সঙ্গ নিয়ে তার সম্পর্কে নানা রকম কেচ্ছাকাহিনী প্রচলিত আছে। ধর্মকে তিনি ব্যবহার করেছেন পুরোপুরি রাজনৈতিক স্বার্থে এবং এর ধারাবাহিতায় বাংলাদেশ তার সেক্যুলার চরিত্র হারিয়ে পুরোপুরি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবার পথে। তার এই কীর্তির ফলাফল এতই মারাত্মক যে অন্য কোনো সরকারের পক্ষেও এখানে আর হাত দেয়া সম্ভব নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে গুন্ডাতন্ত্র কায়েম, সেশন জট এগুলোও এরশাদের সময়কার ঘটনা। হুমায়ূন আজাদের অধিকাংশ লেখায় (উপন্যাস এবং প্রবন্ধ) এই সময়ের নানা পচনশীল চরিত্র খুঁজে পাওয়া যায়। এই সময়টা বুঝার জন্য হুমায়ূন আজাদ খুব ভালো শিক্ষক।

বাংলাদেশের অন্যান্য যারা ক্ষমতায় এসেছেন এরশাদের আগে, তাদের কারো স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। অপঘাতে মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এরশাদের ক্ষেত্রে এমন হয়নি। এরশাদের একটি বহুল প্রচলিত নাম শুনলেই ব্যাপারটা বুঝতে পারা যায়- ‘বিশ্ব বেহায়া’। পরবর্তীতে রাজনৈতিক দাবা খেলায় সে মোটামুটি জাতীয় কমেডিয়ানের মর্যাদা পেয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রথমবারের মতো হত্যার চেষ্টা করা হয় তার সময়েই। সময়ের বিবর্তনের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল এরশাদ। আমরা জানি, তেলাপোকা টিকে থাকে কিন্তু অতিকায় হস্তি লোপ পেয়ে যায়। এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বহুল আলোচিত এবং ব্যবহৃত তেলাপোকা।

এরশাদ

এরশাদের সময়ে, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে ঠিক কতজন ছাত্রলীগ-আওয়ামীলীগ নেতাকর্মী নিহত বা আহত হয়েছে, আমার সেই সংখ্যাটি জানা নেই। আমি শুধু জানি আমার বাবা সেই আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। আন্দোলন কালে আহত হয়েছিলেন এবং এরশাদের পতনের পর চিরতরে রাজনীতি থেকে দূরে সরে এসেছিলেন। কেন?- এই প্রশ্নের উত্তরে বাবা বলতেন, ‘রাজনীতি আসলে আমাদের জন্য না।’

এরশাদের একটা ফ্যানবেজ আছে। বিশেষ করে রংপুর অঞ্চলের দিকে। ক্ষমতা হারানোর পরও কোন নির্বাচনেই সে হারেনি, জেলে থেকেও জিতেছে- এখান থেকে সেই ফ্যানবেজ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এরশাদের এই সমর্থকগোষ্ঠী ভোটের রাজনীতিতে তাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল এবং দুটি প্রধান দলের সাথেই জোটবদ্ধ হয়েছিল সে। ভোটের রাজনীতির কারণে এক সময়ের যার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল দলের নেতাকর্মীরা, তার সাথে গলা মিলিয়ে শ্লোগান দিতে হয়েছে। যদিও শেষ সময়ে আওয়ামীলীগ তাকে মোটামুটি নিষ্ক্রিয় এক কমেডিয়ানের পর্যায়ে নিয়ে এসেছিল।

তার অনেক সমর্থকগোষ্ঠি থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে যার সামান্য ধারণা আছে তার পক্ষে এরশাদের মৃত্যুতে শোকাতর হওয়া সম্ভব না। যার ফাঁসি হবার কথা, সে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা ভোগ করে স্বাভাবিক ভাবে মৃত্যু বরণ করেছে। তার মৃত্যুতে শোক বা আনন্দ না, নিষ্ক্রিয়তাই হতে পারে বিদায় জানানোর সব থেকে ভালো উপায়!

 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button