ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

নিজ মেয়েকে যৌনপল্লীতে বিক্রির চেষ্টা; সমাজ কোথায় যাচ্ছে আসলে?

মাঝে মধ্যে মনে হয় এই সংবাদপত্র, টেলিভিশন, ফেসবুক সব বন্ধ করে বসে থাকি। প্রতিদিন যে ধরণের খবর শুনি তাতে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাব পুরোপুরি, এমন মনে হয়। বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ এত বেশি বেড়ে যাচ্ছে যে, এদের কথা শুনলেও অবিশ্বাস্য মনে হয়। কোন জগতে বাস করছি আসলে? সব কিছু কেমন সাররিয়েলিস্টিক মনে হয়৷ সব দুঃস্বপ্ন মনে হয়। কিন্তু, এই খবরগুলোকে এড়িয়ে গেলেও খবরগুলো মিথ্যা হয়ে যায় না। বিটিভি দেখে বাতাবিলেবুর ফলন দেখে শান্তি পাওয়ার ভাব ধরলেই সর্বত্র শান্তি আছে এটা বিশ্বাসযোগ্য? সম্পর্কগুলো কেন যে এমন হয়ে যাচ্ছে সত্যিই বুঝতে পারি না। কোন লোভে মানুষ ব্যাকুল হয়ে খারাপের প্রতিযোগিতায় নেমে গেল? কেন এত নিম্নগামীতা এই সমাজের, বুঝে উঠি না।

গতকাল এমনই একটি খবর পড়বার পরেও বিশ্বাস করতে পারিনি। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছি। একজন জন্মদাতা পিতা নিজ মেয়েকে বিক্রি করতে নিয়ে গেছে যৌনপল্লীতে। নিজের মেয়েকে বিক্রি করে সে মাত্র ৩০ হাজার টাকা পাবে। মাত্র এই কয়টা টাকার জন্য একজন পিতা নিজ মেয়েকে বিক্রি করে দিবে? কেমন পিতা সে? মানুষ নৈতিকভাবে কতটা নিচে নামলে পরে এই কাজ করার চিন্তা করতে পারে! আর এই লোক কতটা বর্বর হলে শুধু চিন্তা না সত্যি সত্যি মেয়েকে বিক্রি করে দিতে নিয়ে যেতে পারে যৌনপল্লীতে?

 এরশাদ আলী, দৌলতদিয়া যৌনপল্লী

মেয়েটি যাকে পিতা বলে জানে, যাকে বাবা বলে ডাকে কোমল কণ্ঠে সেই বাবার চরিত্রের আদলে ছদ্মবেশী চরিত্রহীন লোকটির নাম এরশাদ আলী। এরশাদ আলী নিজেও যৌনপল্লীতে যাতায়াত করত। সেখানে যাতায়াতের কারণে তার সাথে সম্পর্ক হয় শিল্পী নামক যৌনকর্মীর। সেই যৌনকর্মীর কাছ থেকেই সে জানে নারী কেনাবেঁচার কাহিনী৷ এরশাদ যৌনকর্মী শিল্পীকে বলে, সে একটি মেয়ে এনে দিতে পারবে। বিনিময়ে তাকে ৮০ হাজার টাকা দিতে হবে। যদিও এরশাদকে বলা হয়, মেয়ে এনে দিতে পারলে সে ৩০ হাজার টাকা পাবে।

মাত্র ৩০ হাজার টাকার লোভে এরশাদ বিবেকবর্জিত পশু হয়ে যায়। যৌনপল্লীতে সে নিজের মেয়েকেই টাকার বিনিময়ে বিক্রির চিন্তা করে। কারণ, মেয়ে অসহায়। এরশাদ আলীর সাথে আগের স্ত্রীর ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ায় আগের পক্ষের এই কন্যা কখনো দাদীর কাছে কখনো ফুফুর কাছে থাকে, কখনো থাকে তার নিজের মায়ের কাছে। এই মেয়ের ভবিষ্যৎ সুন্দর করার সামর্থ্য নেই এরশাদ আলীর। তাই সে ভেবেছে মেয়েকে বিক্রিই করে দিবে।

কিন্তু মেয়ের কাছে সে বলে অন্য কথা। মেয়েকে ঢাকায় পাঠাবে, সেখানে ভাল থাকবে এই স্বপ্ন দেখায়। বলে, “তোমার খাওয়ার খরচ দিয়ে আমি তোমাকে ঢাকায় ভালো একটি জায়গায় রেখে দিব, সেখানে তুমি ভালো থাকবে।” মেয়ে সরল মনে বিশ্বাস করে জন্মদাতা পিতাকে। মেয়ে হয়ত এই জন্মেও কল্পনা করেনি, এই পিতা শুধু বায়োলজিক্যাল পিতা, সে এখন আর পিতা নেই, কলুষতায় মজে গেছে এই পিতার মস্তিষ্ক।

এরশাদ আলী, দৌলতদিয়া যৌনপল্লী

এরশাদ আলী মেয়েকে নিয়ে যায় দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে। পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে হাতেনাতে আটক করে এরশাদ আলীকে। পাওয়া যায় যৌনকর্মী শিল্পীকেও। গোয়ালন্দ ঘাট থানা পুলিশের ওসি মোঃ এজাজ শফী বলেন, “কিশোরী বিক্রি হচ্ছে এমন খবর পেয়ে থানা পুলিশের একটি দল শনিবার দিনগত রাতে ছদ্মবেশে যৌনপল্লীতে গিয়ে ওই কিশোরীকে উদ্ধার করে। এসময় হাতেনাতে দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়। উদ্ধার হওয়া কিশোরীর নির্ভরযোগ্য কোনো অভিভাবক না থাকায় আদালতের মাধ্যেমে ১৮ বছর না হওয়া পর্যন্ত সরকারি সেভ হোমে রাখার আবেদন করা হবে।”

মেয়েটি হয়ত ঘৃণায় আত্মহত্যাও করে ফেলতে পারত। যাকে বাবা বলে জেনে এসেছে, সে তাকে বিক্রির জন্য নিয়েছে যৌনপল্লীতে। এতবড় অপমান, এতবড় গ্লানি নিয়ে বেঁচে থাকা বড় কঠিন। অথচ, এই পাষণ্ড পিতাকে ক্ষমা করে দিতে চায় মেয়ে। এখনো সরল মনে বিশ্বাস করতে চায়, তারা বাবা ভুল করেছে। মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে পুলিশকে বলে, “আব্বু ভুল করে ফেলেছে। আব্বুকে ভালো হওয়ার জন্য একবার সুযোগ দেন স্যার।”

এই সরলতার সাথে কি করে একজন পিতা বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারলো? যে মেয়ে এখনো জন্মদাতাকে ভাল হওয়ার সুযোগ দেয়ার আর্জি জানায়, সেই মেয়েকেই কিনা বর্বর পিতা বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল? সমাজ কোথায় যাচ্ছে আসলে?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button