সিনেমা হলের গলি

টিকেটের জন্যে লাইনে দাঁড়ানো মানুষগুলোকে নিয়ে ঠাট্টা করার আগে…

হলিউডি সিনেমা কম দেখার একটা বড় কারণ হচ্ছে, ইংরেজী ভাষাটার ওপরে আমার ভালো রকমের দখল নেই। সিনেমা দেখতে বসলে বারবার পজ করে সাবটাইটেল দেখা লাগে, ইমোশনটা কেটে যায় তাতে। এটা পুরোপুরিই আমার ব্যর্থতা, এবং একারণে অনেক দারুণ দারুণ সিনেম্যাটিক টেস্ট থেকে আমি বঞ্চিত হয়েছি, হচ্ছি। গেম অফ থ্রোনস আমি দেখা শুরু করেছি অল্প ক’দিন আগে, এবং এক ঘন্টার একটা এপিসোড দেখার পরেই কাহিনীর আগামাথা কিছু না বোঝা স্বত্বেও আমি মুগ্ধ হয়েছি নির্মাণের মুন্সীয়ানা এবং ব্যাপ্তি দেখে। ফার্স্ট সিজনের ছয় নম্বর এপিসোডে আটকে আছি এখনও, নানা ঝুট-ঝামেলায় সামনে যাওয়া হচ্ছে না গত কিছুদিন।

মার্ভেল বা ডিসি, কোন ফ্যানবেজের মধ্যেই আমি পড়ি না, এবং সুপারহিরো টাইপের সিনেমা যে আমি খুব উপভোগ করি, তেমনটাও নয় (কিছুদিন আগে দেখা অ্যাকুয়াম্যান অবশ্য ভালো লেগেছিল)। সেটা আমার পছন্দ, আমার কাছে দক্ষিণ ভারতের মাগাধিরা বা বাহুবলিও ভালো লাগেনি, তাই বলে তো সেগুলো বাজে সিনেমা হয়ে যাবে না। মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সের যে কয়টা সিনেমা আছে, সেগুলোর মধ্যে অ্যাভেঞ্জার্সের প্রথমটা, আর আয়রণ ম্যানট্যান মিলিয়ে বোধহয় চার-পাঁচটা দেখা হয়েছে, তাও সিরিয়ালবাই নয়।

এখন আমার কাছে এই জনরার সিনেমা ভালো লাগে না, তার মানে এই নয় যে কারো কাছে এগুলো ভালো লাগতে পারবে না। দুনিয়াজুড়ে মার্ভেলের ক্র‍্যাক টাইপের ফ্যান প্রচুর আছে, শেষ কিস্তির সিনেমাটা, বা প্রিয় চরিত্রগুলোকে শেষবারের মতো একসঙ্গে দেখার তাগিদে যারা প্রথম দিনের টিকেটের জন্যে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। একটা টিকেটের জন্যে এরকম হাহাকার আর কোন ফ্র‍্যাঞ্চাইজির কোন সিনেমাটা তৈরি করতে পেরেছে?

টিকেটের জন্যে সিনেপ্লেক্স বা ব্লকবাস্টারের সামনে যারা ভোররাত থেকে ভীড় জমাচ্ছেন, অনেকের কাছেই তাদেরকে ‘আকাইম্মা’, ‘লাইফলেস’ বা ‘হাভাতে’ মনে হতেই পারে। গেম অফ থ্রোনসের একটা এপিসোড রিলিজ হওয়ার সাথে সাথেই দেখবে বলে যারা সারারাত জেগে থাকে, বা নতুন সিজন শুরুর আগে যারা ‘উইন্টার ইজ কামিং’ বলে চিৎকার শুরু করে, তাদেরকেও কারো কারো কাছে ‘আবাল’ মনে হতে পারে। এগুলো একেবারেই ব্যক্তিগত মতামত। তবে এই ব্যক্তিগত মতগুলো প্রকাশের ক্ষেত্রে আরেকটু কৌশলি, আর ভদ্র হওয়াটা খুব দরকার।

যে ছেলেটা বা মেয়েটা ভাবছে, প্রথমদিনে ‘এন্ড গেম’ দেখতে না পারলে স্পয়লার খেতে খেতে জীবন বৃথা হয়ে যাবে, তার চিন্তাভাবনা আমার কাছে শিশুতোষ লাগতেই পারে, কারণ তার আর আমার জগতটা একেবারেই আলাদা। তার ভূবনের খোঁজ আমি রাখি না, কাজেই এগুলো নিয়ে বিরূপ মন্তব্য না করাটাই আমার জন্যে শ্রেয়। সবকিছু নিয়ে মজা করাই যায়, কিন্ত সেটা যেন কারো মনোকষ্টের কারণ না হয়, সেই খোঁজ রাখাটাও জরুরী।

একটা সিনেমার টিকেটের জন্যে ভোর পাঁচটায় লাইনে দাঁড়ানোটা চাট্টেখানি কথা নয়। প্রেমিকার মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে বা শো-অফের জন্যে সিনেমা দেখতে আসা অনেকেও আছে এই মিছিলে, দায়িত্ব নিয়ে বলছি, তাদেরকেও ছোট করার অধিকার আমার নেই। কারণ কোনদিন এন্ড গেম দেখলেও আমি হয়তো মোবাইল বা ল্যাপটপের স্ক্রিনে ফ্রি-তে দেখবো, এই ছেলে বা মেয়েগুলোর মতো ভোররাতে লাইনে দাঁড়িয়ে অমানুষিক একটা যুদ্ধ করতে যাবো না। এই জায়গাটায় শো-অফ পার্টিও আমার চেয়ে এগিয়ে, তাদের বদৌলতে অন্তত মার্ভেলের লাভ হচ্ছে।

যারা প্রথম দুইদিনের টিকেট পেয়েছেন, তাদের জন্যে শুভকামনা। যারা পাননি, তাদের জন্যে সমবেদনা। যারা সিনেমা আগে আগে দেখে ফেলবেন, নিশ্চয়ই স্পয়লার দেয়ার ব্যাপারে একটু সতর্ক থাকবেন। সবাই আপনাদের মতো ভাগ্যবান নন, কিন্ত তাদেরও সিনেমাটা দেখার ইচ্ছে আছে, একটু দেরীতে হলেও। অন্যের সিনেমা দেখার মজাটা নষ্ট করবেন না দয়া করে, এটা খুব জঘন্য একটা কাজ। আপনার কাছে হয়তো মজা লাগতে পারে, তবে বেশি স্মার্ট সাজতে গিয়ে একশোজনের চোখে নিজেকে একটা গণ্ডমূর্খ রামছাগল প্রমাণ করার কি দরকার বলুন?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button