ইনসাইড বাংলাদেশরাজনীতি নাকি জননীতি

আওয়ামী লীগের কাছে আমাদের যতো প্রত্যাশা!

এক বন্ধু কাল জিজ্ঞেস করছিল, “আওয়ামীলীগ আবার জিতে আসলে কী করবি?” আমি বললাম, “কী আর করবো৷ সমালোচক মুডে ফেরত চলে যাবো!” বিগত ৬/৭ বছরে আমি আওয়ামী লীগের সব ধরণের ভুল ত্রুটির কট্টর সমালোচনা করেছি, প্রয়োজনে রাজপথেও নেমেছি। মাঠের আন্দোলনের অনেক বামপন্থী বন্ধুরা তাই নির্বাচনের আগে আমার প্রচার প্রচারণা দেখে প্রশ্ন করেছে, ‘আপনাকে দেখতাম আপনি সরকারের সমালোচনা করছেন। মাঠেও আন্দোলন করেছেন। হঠাৎ এই পরিবর্তন কেন?কোন স্বার্থে?’ তাদের কীভাবে বোঝাই, এটা স্বার্থের জন্য পরিবর্তন না৷ বাস্তবতার নিরিখে নেয়া সিদ্ধান্ত৷

আওয়ামী লীগ দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থাকায়, সবাই আওয়ামী লীগে ভিড়েছে। ২০১৪ এর নির্বাচনের আগে ছাত্রদলের যে ছেলেটা ‘ইলেকশনে বিএনপি জেতার পর আমাকে দেখে নিবে’ বলে হুমকি দিয়েছিল, দেখা গেল সেও হলে ছাত্রলীগ করে! যে ছেলেটা শিবিরকে মহান আর ছাত্রলীগকে চোরের দল বলে আমার সাথে ঝগড়া করেছে, সেও একটা এলাকার ছাত্রলীগের কমিটিতে পদপ্রাপ্ত নেতা!

আমি এগুলোকে স্বার্থের জন্য পরিবর্তন বুঝি, যেটা আমি কখনোই ছিলাম না। আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে কথা বলায়, ঢাবি ছাত্রলীগের একজন আমার কলিজা চিবিয়ে খাবার হুমকি দিয়ে পোস্ট দিয়েছিল। আমার জন্য ছাত্রলীগে ঢুকে যাওয়া কোন ব্যাপার ছিল না, সেই পারিবারিক অবস্থান আর লিংক আমার ছিল৷ কিন্তু আমরা দল থেকে কোন কিছু বাগিয়ে নেয়ার চিন্তা করিনি, বরং প্রতিটা ক্ষেত্রে ভুলভ্রান্তি হলে, যেকোন অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি, দলটার প্রতি টান আছে বলেই।

আমি প্রতিটা ক্ষেত্রে সমালোচনা করেছি, কারণ আমার কাছে যেটা ভুল বলে মনে হচ্ছে সেই ভুলটা যেন দলটা না করে৷ ভবিষ্যতেও যেকোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ভুলত্রুটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবো, দরকার হলে পথেও নামবো। এই যে প্রচার প্রচারণা করছি, আমি বা আমার মত অনেকে কিন্তু পোস্ট পাওয়া না, দলের সাথে সরাসরি কোন যোগাযোগ নেই, কোন অর্থকড়ি পাবোনা, জিতলে মিষ্টিও খাওয়াতে আসবেনা কেউ, ডাকবেনা কোন সভা আলোচনায়। তারপরও করছি৷ ক্ষমতায় থাকা কালীন সময়ে সমালোচনা আর নির্বাচনের সময়ে প্রচারণা- কেন এই নীতি?

প্রথমত, আমি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। আমার পক্ষে আর যাই হোক, বিএনপি জামাতকে সমর্থন দেয়া সম্ভব না৷ আওয়ামীলীগের লোকজন আমাকে পিটিয়ে মেরে ফেললেও না।

দ্বিতীয়ত, আমি নির্মোহ দৃষ্টিতে বিচার করার চেষ্টা করি৷ আওয়ামীলীগের অনেক ভুলভ্রান্তি অন্যায় আছে। সেগুলোর সমালোচনাও করেছি, করবো। তবে তারা পরিবর্তনের জন্য যে কাজ করেছে, সেটা আমি খালি চোখেই দেখতে পারি। এসব কাজ থেকে সুবিধাভোগীরা যতই অস্বীকার করুক, অর্থনীতি, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ সহ সব খাতেই আওয়ামীলীগ অসাধারণ কাজ করছে। এগুলো থেমে যাক, এটা কোন সুস্থ মানুষের কাম্য হতে পারেনা৷

তৃতীয়ত, যতদিন শেখ মুজিবের কন্যা আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে আছেন ততদিন এই দলটির কোন বিকল্প নেই। এই দেশের গণতন্ত্রের জন্য একটা বড় সমস্যা হচ্ছে এখানে ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে পুঞ্জিভূত। প্রধানমন্ত্রী সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। এই অবস্থা পরিবর্তনের রোমান্টিক পরিকল্পনায় আপাতত না যাই। তো ঐ অবস্থানে, এত বিরাট পরিমাণ ক্ষমতাকে হ্যান্ডেল করার মত যোগ্য নেতা শেখ হাসিনা ছাড়া এই মুহুর্তে কেউ নেই৷

বাংলাদেশের বাস্তবতায় আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় না রাখা মানে বিএনপি জামাত জোটকে ক্ষমতায় আনা। সহজ হিসাব৷ আমাদের রোমান্টিক বন্ধুরা যতই নিজেদের পরিবর্তনের কাণ্ডারি ভাবুক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে হাতপাখার সমান ভোট ব্যাংকও তাদের নেই। রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। আমি তাদের সাফল্য কামনা করি৷

যেহেতু আমি বিএনপি জামাত জোটকে ক্ষমতায় দেখতে চাইনা, তাই আমি নির্বাচনের সময়টাতে আওয়ামীলীগের পক্ষে কথা বলি। যেহেতু আমি আওয়ামীলীগের ভুল গুলোর প্রতিকার চাই তাই সাধারণ সময়ে তাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি। তাদের চাপে রাখার জন্য এটা আমার ব্যক্তিগত জায়গা থেকে ক্ষুদ্র চেষ্টা। এতে আমার ব্যক্তিগত কোন লাভ নেই৷ বরঞ্চ লোকসান কিছু আছে৷

আওয়ামীলীগ এবার জিতে আসলে পূর্বের কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা ছাড়াও তাদের কাছে আমার প্রত্যাশা-

১. প্রশ্নফাস রোধের জন্য গৃহীত পদক্ষেপ জোরদার করা
২. হেফাজত সহ অন্যান্য মৌলবাদী দল গুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা
৩. জামাতকে নিষিদ্ধ করা
৪. শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি
৫. এডমিনিস্ট্রেশনকে আরো শক্তিশালী করা
৬. বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য লাইসেন্স, সংযোগ নেয়া থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় কাজ গুলো দ্রুততম সময়ে সম্পাদনের ব্যবস্থা করা।

৩০ তারিখ সকলে ভোট দিতে যাবো আমরা৷ আমার ভোট এমনিই দেয়া হয়ে যাবে, এই ভেবে বসে থাকলে হবেনা। আগে যান, গিয়ে দেখুন যে দিতে পারছেন কিনা, না পারলে তখন বলবেন৷ বাধা দিলে তখন প্রতিবাদ করবেন৷ মানুষ জানবে কোন আসনে কারা বাধা দিয়েছে। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে যান৷ নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন৷ আপনার ভোট আপনি দেবেন, চিন্তাভাবনা করে দেবেন৷ আপনার চিন্তার উপরে ভরসা রেখেই এই সিস্টেমের উৎপত্তি। সেই চিন্তাকে ভুল খাতে, দেশবিরোধী খাতে প্রবাহিত হতে দেবেন না৷

বাংলাদেশের প্রতিটি ভোট, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে হোক।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button