মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

স্টান্টবাজি আর ফাপড়বাজির একটা লিমিট আছে!

প্রথম শ্রেণীর প্রশাসনিক কর্মকর্তারা মাঝেমধ্যেই শহরের বিভিন্ন পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্রে ঢুঁ মারেন, তাদের সঙ্গে থাকে পুলিশ এবং আরও কিছু আইন শৃঙখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। গদাই লস্করী চালে হেলেদুলে গিয়ে তারা পার্ক থেকে জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়েদের পাকড়াও করেন ‘অসামাজিক কর্মকাণ্ডে’ লিপ্ত থাকার অভিযোগে। স্কুল-কলেজ পালিয়ে প্রেম করতে আসা ছেলেমেয়েগুলোর বাসায় ফোন দেয়া হয়, অভিভাবক ডেকে এনে করা হয় চরম হেনস্থা।

প্রথমত, এই ‘অসামাজিক কর্মকাণ্ড’ ব্যাপারটা কি, সেটা আমার কাছে পরিস্কার নয়। প্রাপ্তবয়স্ক দুজন মানুষ ভালোবেসে, কিংবা ভালো না বেসেও একে অন্যকে চুমু খেতে পারে, হাত ধরে পার্কে বসে থাকতে পারে, প্রেম নিবেদন করতে পারে, সেখানে বাধা দেয়ার অধিকার তো সংবিদান কাউকে দেয়নি। প্রকাশ্যে পতিতাবৃত্তি কিংবা ওপেন সেক্স ব্যতিত অন্য ঘটনাগুলোর কোনটাই ফৌজদারী আইনে অপরাধ নয়, তাহলে এই মরাল পুলিশিং এর নামে তরুণ-তরুণীদের হয়রানী করার মানে টা কি?

আজ নোয়াখালীর সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরীও এই মরাল পুলিশিং অভিযানে নেমেছেন। ফেসবুকে নিজের পেজ থেকে কয়েকটা ছবি আপলোড করে তিনি লিখেছেন-

“অভিভাবকদের বলছি আপনার সন্তানের খোঁজ খবর নিন,স্কুল কলেজ চলাকালীন সময়ে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে পার্কে ঘুরাঘুরি করছে কিনা খবর নিন, কোথায় যাচ্ছে লেখাপড়ায় করছে কিনা খেয়াল রাখুন, স্পষ্টভাবে বলছি স্কুল কলেজ চলাকালীন সময়ে কোনো শিক্ষার্থী পার্কে ঘুরাঘুরি করলে পুলিশ থানায় ধরে নিয়ে শাস্তি প্রদান করবে, আজকে স্কুল কলেজ চলাকালীন সময়ে পার্কে শিক্ষার্থীরা আড্ডা দিচ্ছে দেখে পুলিশ থানায় নিয়ে গেছে, আমি পুলিশকে বলে দিয়েছি ওদের অভিভাবকরা থানায় আসলে তাঁদের দ্বায়িত্বে ওদের সর্তক করে ছেড়ে দিবে। আশা করি এই ধরনের ঘটনা পুনরায় না হউক।”

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পার্কে গিয়ে এই মাস্তানীটা করার অধিকার সাংসদকে কে দিয়েছে? কে প্রেম করবে, কে আড্ডা দেবে, কে স্কুল পালাবে, কে পার্কে ঘোরাঘুরি করবে- সেটা দেখার দায়িত্ব কি সংসদ সদস্যের? বাংলাদেশের আইনে কোথায় লেখা আছে যে কেউ স্কুল পালালে তাকে পুলিশ শাস্তি দিতে পারবে? স্কুল কলেজ চলাকালীন সময়ে কোন শিক্ষার্থী পার্কে ঘোরাফেরা করলে পুলিশ শাস্তি প্রদান করবে- এই ফতোয়া জারী করার অধিকারটাই বা তাকে কে দিয়েছে? মগের মুল্লুকের নাম শুনেছিলাম, সাংসদ কি নিজের এলাকাকে একরামের মুল্লুক বানাতে চাইছেন নাকি?

আমি ধরে নিলাম, পার্কে যে ছেলেমেয়েগুলোকে পুলিশ হেনস্থা করেছে, আটক করে জিপে তুলে আসামীর মতো থানায় নিয়ে গিয়েছে, তারা সবাই স্কুল-কলেজ পালিয়ে প্রেম করতে এসেছিল। প্রেম করা কি অপরাধ? কোটি কোটি টাকা লুটপাট করে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে লোকজন, জনগণের শত শত কোটি টাকা মেরে দিয়ে সংসদে গিয়ে ফেরেশতা সাজার ভান করছে কতজন, তাদের গায়ে ফুলের টোকা দেয়ার সাহস হচ্ছে না পুলিশের, যতো বাহাদুরি কেবল স্কুল পালিয়ে প্রেম করতে আসা ছেলেমেয়েদের ওপরে?

সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরী অভিভাবকদের আহবান জানিয়েছেন, সন্তানদের খোঁজখবর রাখার জন্যে, তাদের ভাল-মন্দের দেখভাল করার জন্যে। মাননীয় সাংসদ, আপনি আপনার সন্তানের খেয়াল রেখেছিলেন কি? আপনার গুণধর পুত্রটি যে দিনে দুপুরে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাতে গিয়ে গাড়িচাপা দিয়ে নিরীহ মানুষ মেরে ফেলেছিল, সেটা কিন্ত আমরা ভুলিনি।

এমপি একরামুল করিম চৌধুরীর পুত্র সাবাব চৌধুরী

সন্তানকে বাঁচানোর জন্যে নিজের ক্ষমতার সবটুকু প্রভাব খাটিয়ে কত নয়ছয় করেছেন আপনি, সেটা আমরা জানি। প্রত্যক্ষদর্শী থাকার পরেও শুধুমাত্র আপনার ছেলে বলে ঘাতক গাড়িটির চালকের আসনে থাকা সাবাব চৌধুরীকে গ্রেফতার করা যায়নি, টাকা দিয়ে নিহতের পরিবারকে কিনে নেয়ার রমরমা খবরগুলোও কিন্ত আমরা পত্রিকায় পড়েছিলাম তখন।

মাননীয় সাংসদ, সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের হলফনামা মারফত জানতে পারলাম, গত দশ বছরে আপনার সম্পদের পরিমাণ নাকি ১২৪ গুণ বেড়েছে! এমপি হবার পরে কোন আলাদীনের চেরাগটা আপনি হাতে পেয়েছেন, রূপকথার কোন দৈত্য এসে আপনার মনোবাঞ্ছা পূরণ করে দিয়েছে, কোন দৈবশক্তিবলে আপনি রাতারাতি এত সম্পদের মালিক হয়ে গেলেন, সেটা কি আমরা কখনও জানতে চেয়েছি? হলফনামা অনুযায়ী, পৌনে তিন কোটি টাকার বৈদেশিক মূদ্রার মালিক আপনি- আপনার এই বিপুল আয়ের উৎস কি, সেটা জানার জন্যে তো আমরা নাক গলাইনি কখনও। তাহলে পার্কে কে ঘোরাফেরা করছে, কে স্কুল-কলেজ পালাচ্ছে, সেসব নিয়ে আপনি কেন মাথা ঘামাচ্ছেন?

এগুলো দেখার জন্যে স্কুল-কলেজের শিক্ষকেরা আছেন, তাদের কাজটা তাদেরকে করতে দিন না। আপনি সংসদে নিজের এলাকার প্রতিনিধিত্ব করছেন, সেটাই করুন। ছেলেকে আইনের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন, আমরা কিছু বলিনি। দশ বছরে সম্পদের পরিমাণ ১২৪ গুণ বাড়িয়েছেন, আমরা মাথা ঘামাইনি। এখন তো দেখছি আপনি আমাদের ব্যক্তি স্বাধীনতা দখল করার মিশনে নেমেছেন!

আপনার এলাকায় হাজারটা সমস্যা আছে মাননীয় সাংসদ। কোথায় রাস্তাঘাট ভাঙা, কোথায় ব্রীজ-কালভার্ট দরকার, এলাকার মানুষের কার কি সমস্যা সেটার খোঁজ নিন। আঠারো-বিশ বছরের ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজ ফাঁকি দিয়ে কি করছে, সেটা দেখার দায়িত্ব আপনাকে কেউ দেয়নি, এসব আপনার না দেখলেও চলবে। সাংসদ নিয়ে নিজেকে অন্তত এতটা নিচে নামাবেন না।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button