অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

দুই মুখ নিয়ে জন্ম নেয়া বিরল এক মানুষের গল্প!

ভদ্রলোকটির নাম এডওয়ার্ড মরডেক৷ ইংল্যান্ডের অভিজাত সমাজে জন্ম হয়েছিল তার। ঊনিশ শতকে জন্ম নেয়া এই মানুষটি অন্য মানুষদের চাইতে একটু ব্যতিক্রম। এজন্যে তাকে হয়ত হতভাগ্যও বলা যেতে পারে। মানুষটা জন্মেছিলেন দুইটি মুখ নিয়ে। সাধারণভাবে আমাদের চেহারা তো সবার একটাই, যদিও অসীম কৌতুহলে আমরা কখনো রুপক অর্থে বলি, চার চোখের কথা, যারা সবদিকে লক্ষ্য রাখে তাদের কি দুই চোখের বাইরে পেছনে আরো চোখ আছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহবাচক প্রশংসা করি আমরা কখনো কখনো। কিন্তু, এমন যদি সত্যিই হয় কখনো, আপনার সাথে এমন কোনো মানুষের পরিচয় হলো, যার সত্যিই চার চোখ, দুই মুখ, সামনে এবং পেছনের দিকে, আপনার অনুভূতি কেমন হবে?

মজার ব্যাপার হলো, এডওয়ার্ড মরডেকের বাড়তি যে মাথা এবং মুখ তার উপর কোনো নিয়ন্ত্রণই ছিল না তার। সেই মুখটা কাঁদত, হাসত নিজের মতো করে। কখনো কখনো উদ্ভট উদ্ভট শব্দ করতো। মনে হতো যেন, একই মানুষের শরীরে দুইটা আলাদা অস্তিত্ব, দুইজন আলাদা মানুষ। হয়ত একারণেই দুই মাথা, দুই চেহারা বা দুই জোড়া চোখ এডওয়ার্ড মরডেকের জন্য আশীর্বাদ নয়, এসেছে অভিশাপ হয়ে। আপনি একবার ভেবেই দেখুন এটা কতটা যন্ত্রণার, আপনার নিজের আসল চেহারায় যখন আনন্দময় অনুভূতির অভিব্যক্তি ফুটে উঠছে, তখন পেছনের চেহারাটি যার এক্সপ্রেশনের উপর আপনার নিয়ন্ত্রণ নেই, সে তখন কাঁদছে। আপনি মানুষের সামনে তখন বিব্রত হচ্ছেন, মানুষও আপনাকে দেখে বিভ্রান্ত হচ্ছে। এটা নিশ্চয়ই সুখকর চাওয়া নয় কোনো মানবসন্তানের জন্যে।

এডওয়ার্ড মরডেক

এডওয়ার্ড মরডেক মাঝে মধ্যে ভয় পেতেন। রাতের বেলা তার পেছনের চেহারাটি বিচিত্র শব্দ করত এবং কিছু একটা বলতে চাইত তাকে। এডওয়ার্ড মরডেক ভাবতে শুরু করেছিল, তার পেছনের বাড়তি অংশ, বাড়তি চেহারাটি আসলে শয়তানের, তার নয়। সে ডাক্তারদের অনেকবার অনুরোধ করেছিল, কোনো অপারেশন করে পেছনের চেহারাটি কিংবা অস্তিত্বটি বিলীন করে দেয়া যায় কিনা। কিন্তু, কেউ অপারেশনের ঝুঁকি নিতে চায়নি। ডাক্তাররা অপারেশন করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং তাকে নাকি আত্মহত্যা করবার পরামর্শ দেয়।

কেন এডওয়ার্ড মরডেক এমন বাহ্যিক অবয়ব পেয়েছিল? এর উত্তর হিসেবে বলা হয়ে থাকে, এডওয়ার্ড মরডেক ডিপ্রোসোপাস নামক একটি রোগে আক্রান্ত ছিলেন। সাধারণত, এই রোগে যারা আক্রান্ত হয় তারা বাড়তি একটা কান কিংবা নাক নিয়ে জন্মায় কিন্তু এডওয়ার্ড একদম একটা গোটা আলাদা চেহারাই পেয়েছিলেন। এই বাড়তি চেহারা এডওয়ার্ড মরডেকের জন্য অভিশাপ হয়ে নেমে এসেছে। সে কারো সাথে মিশতে পারত না, এমনকি তার সাথে দূরত্ব তৈরি হয়ে যায় তার পরিবারেরও। তার জীবন ছিল ভীষণ নিঃসঙ্গ। কেউ তাকে স্বাভাবিক নজরে দেখত না, সেও পারত না স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে। ফলে, মাত্র ২৩ বছর বয়সের দিকেই সে আত্মহত্যা করে নিজের জীবনাবসান ঘটায়। মারা যাওয়ার আগে তার অনুরোধ ছিল, তার পেছনের চেহারাটি যেন নষ্ট করে ফেলা হয় যাতে ওই চেহারা কফিনের ভেতর বিকট শব্দ করতে না পারে এবং ফিসফিস করে কথা না বলতে পারে।

১৮৯৬ সালে ‘অ্যানোমালিস এন্ড কিউরিওসিটিস মেডিসিনি” নামক একটি নিবন্ধে তার সম্পর্কে লেখার পর এডওয়ার্ড মরডেক আলোচিত হন। তাকে নিয়ে রচিত হতে থাকে বিভিন্ন গল্প, নিবন্ধ, নাটক ইত্যাদি। নিবন্ধে এডওয়ার্ড মরডেক সম্পর্কে বলা হয়, তার গল্পটিই মানুষের বিকলাঙ্গতার সবচেয়ে করুণ গল্প। অভিজাত পরিবারের সন্তান হয়েও যে কখনো নিজের পারিবারিক নাম ব্যবহার করেনি এবং আত্মহত্যা করে অল্পবয়সেই।

 

এডওয়ার্ড মরডেক আসলে দেখতে কেমন ছিলেন তা ফুটিয়ে তুলতে শিল্পীরা তার আদলে মোমের পুতুল তৈরি করেন। তবে, অনেকের কাছেই এখনো অবিশ্বাস্য, এডওয়ার্ড মরডেকের গল্প। আসলেই কি সম্ভব এমন কিছু? আসলেই কি কোনো মানুষ দুইমুখী চেহারা নিয়ে জন্মেছিল না এডওয়ার্ড মরডেক স্রেফ একটি চরিত্র? লেখক চার্লস হিল্ডার্থ রয়েল সায়েন্টিফিক দলিল থেকে এডওয়ার্ড মরডেকের অবস্থার কথা খুঁজে বের করেছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, এডওয়ার্ড ছিলেন একজন চমৎকার সঙ্গীতজ্ঞ। তার ছিল বেশ ভাল জ্ঞানের ব্যপ্তি। কিন্তু, নিজের এই মেধার বিপরীতে তার ছিলো অদ্ভুত এক অসুখ, অনাকাঙ্ক্ষিত এক চেহারা যা তাকে যন্ত্রণা দিত সবসময়। তাই সে বিষপান করেই মৃত্যুবরণ করে এবং মারা যাওয়ার আগে লিখে যায় তার মৃত্যুর পর যেন তার বিকট চেহারাটি নষ্ট করে ফেলা হয়, যা কখনো যেন আর শব্দ না করতে পারে।

মরডেকের এই চেহারার আদলটি আইডিয়া হিসেবে আসে বিভিন্ন সিনেমায়ও। যেমন- হ্যারি পটার সিরিজের ফিলসফারস স্টোন সিনেমায় এক শিক্ষকের পেছনে ছিল ভল্ডেমর্টের চেহারা!

তাকে নিয়ে রচিত আছে টম ওয়েটসের গান “পুওর এডওয়ার্ড” নামে। যাইহোক, তবুও বাস্তবে কখনো এডওয়ার্ড মরডেক ছিলেন কিনা এই নিয়ে এখনো বিশ্বাস অবিশ্বাসের তর্ক বিতর্ক চলে। কারণ, এডওয়ার্ড মরডেকের জন্ম মৃত্যুর ক্ষণ সম্পর্কে নিখুঁত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তার সুইসাইড নিয়েও আছে একাধিক মতভেদ, তবে এডওয়ার্ড মরডেকের গল্পটি মুখে মুখে বেশি ছড়িয়ে পড়েছিল। মরডেকের গল্প আসলে এক রহস্য, যে নিজেই নিজের বাড়তি অস্তিত্ব নিয়ে অস্থিরতায় ভুগত, তার অস্তিত্ব ছিল কিনা তা ভেবেই এখনো অনেকে অস্থিরতায় ভুগে!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button