অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

এগারো বছরের এবা ও খুনে এক উন্মাদের ‘প্রতিশোধ’!

১১ বছর বয়সী এবা অকারলাউন্ড কানে শুনতে পেতো না। রাস্তা পারাপারের সময় মা ওর হাত ধরে রাখতেন, মেয়েটা শ্রবণ প্রতিবন্ধী, কথাবার্তাও খুব একটা বলে না, কি থেকে কি হয়ে যায় কোন ঠিক ঠিকানা নেই। মায়ের এত সতর্কতাও বাঁচাতে পারলো না এবাকে, ঘাতক এক ট্রাক কেড়ে নিয়েছিল তার প্রাণপ্রদীপ। ২০১৭ সালের এপ্রিলে উজবেকিস্তানের এক জঙ্গী একটা বিয়ারভর্তি ট্রাক ছিনতাই করে সেটা উঠিয়ে দিয়েছিল ফুটপাথের ওপরে, নিহত হয়েছিল আটজন নিরপরাধ মানুষ, তাদের একজন ছিল এবা অকারলাউন্ড।

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে আজ দুপুরে দুটি মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করতে আসা মুসল্লীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে বেন্টন টেরেন্ট নামের এক জঙ্গী। জঙ্গী শব্দটা শুনলেই যারা মুসলমান ভাবেন, তারা একটু অবাক হতে পারেন। তবে বেন্টনকে মানসিক ভারসাম্যহীন বা উন্মাদ বলতে পারছি না একটাই কারণে, ঠান্ডা মাথায় দিনের পর দিন ধরে প্রস্তুতি নিয়ে পিশাচের মতো করে মানুষগুলোকে খুন করেছে সে, একটু দয়া-মায়াও কাজ করেনি তার মধ্যে, যেন মানুষ নয়, একদল পিঁপড়াকে পায়ে পিষে মারছে সে!

ঠিক যেন ভিডিও গেমসের কোন দৃশ্য! জিটিএ ভাইস সিটি কিংবা মরটাল কমব্যাট, অথবা হালের পাবজি! বেন্টনের মাথায় ক্যামেরা বসানো, অটোমেটিক সেই বন্দুক তাক করে সে ছুটে যাচ্ছে সামনের দিকে। ভিডিওতে দেখে প্রথমে বোঝা যায়নি, পরে দৃশ্যমান হলো, এটা আসলে একটা মসজিদ। দরজায় দাঁড়িয়েছিল পাঞ্জাবী আর টুপি পরিহিত একজন, একটানা ঠাস ঠাস শব্দ শোনা গেল বার তিনেক, বন্দুকের নল থেকে ছিটকে বেরুতে দেখা গেল আগুনের স্ফুলিঙ্গ!

দরজার সামনেই লুটিয়ে পড়লেন একজন, গুলিবিদ্ধ আরেকজন কাতরাতে কাতরাতে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন, পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে ঠান্ডা মাথায় একাধিকবার গুলি করা হলো তাকেও, নিস্তেজ হয়ে গেল গুলিবিদ্ধ শরীরটা! একের পর এক ঝরে যাচ্ছে প্রাণ, মানুষগুলো লুটিয়ে পড়ছে মাটিতে। তাতেও ক্ষান্ত দিচ্ছে না খুনী, নিথর শরীরের ওপরেও একটানা গুলি চালিয়ে যাচ্ছে সে, কেউ প্রাণে বেঁচে যাক, এটা যেন কোনভাবেই চায় না সে! সবার মৃত্যু নিশ্চিত করাটাই যেন তার লক্ষ্য!

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল তখন ঘটনাস্থল থেকে সামান্য দূরে, আর মিনিট পাঁচেক আগে মসজিদে ঢুকলে ভিডিওর আক্রান্ত মানুষগুলোর মধ্যে হয়তো তামিম-মাহমুদউল্লাহরাও থাকতে পারতেন!

একজন দুজন নয়, ৪৯ জন নিহত হয়েছে এই হামলায়, এদের প্রায় সবাই মুসলিম। আর বেন্টনের মূল ক্ষোভটাও মুসলমানদের ওপরেই। পরিকল্পনা করেই সে এই হামলা চালিয়েছে মসজিদে, মানুষগুলোকে খুন করার মিশন নিয়েই বেন্টন এসেছিল আজ। পুলিশের কাছে ধরা পড়ার পরে সে স্বীকার করেছে, মুসলমানদের প্রতি তীব্র ঘৃণা থেকেই এই হামলা চালিয়েছে সে। আর মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে ২০১৭ সালে এবা’র মৃত্যুটাকে। সেই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধই নাকি নিয়েছে বেন্টন!

যে শটগানটা দিয়ে বেন্টন পাখির মতো গুলি করে মানুষ মেরেছে, সেটার ওপরের অংশে ইংরেজীতে লেখা ছিল একটা বাক্য, যেটার বাংলা করলে দাঁড়ায়- ‘এবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে…’ পুলিশের কাছে ধরা পড়ার পরেও এই একই কারণটাই বলেছে বেন্টন, মুসলিম হত্যা করলেই নাকি এবার আত্মা শান্তি পাবে! মানসিকতা কতটা বিকৃত হলে এক-দুইজন মানুষের কৃতকর্মের দায় পুরো একটা জাতির ওপরে দিয়ে তাদেরকে এভাবে পিশাচের মতো খুন করা যায়, সেটা ভাবতেই অবাক লাগে!

শুধু তা-ই নয়, খুনের আগে ৭৩ পৃষ্ঠার একটা ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেছিল বেন্টন, সেটার প্রতিটা পাতাজুড়ে লেখা ছিল মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা। এই জাতিটাকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করা দিতে হবে, এমনটাই ছিল বেন্টনের অভিমত। নিজের টুইটার একাউন্টে এবা’র একটা ছবি ঝুলিয়ে রেখেছিল সে, নিচে লিখে দিয়েছিল, ‘এদেরকে(মুসলমানদের) নিশ্চিহ্ন করা ছাড়া আমাদের থামা উচিত নয়!’

এবা মরে গেছে, বেঁচে থাকলে আজকের এই দৃশ্যটা দেখে হয়তো আরেকবার মরে যাওয়ার ইচ্ছে হতো ফুলের মতো নিষ্পাপ মেয়েটার। তার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়ার অন্ধ নেশায় মত্ত হয়ে এক অমানুষ আরও ৪৯টা তাজা প্রাণ ঝরিয়ে দিয়েছে, নিরপরাধ মানুষগুলো মৃত্যুকে বরণ করে নিতে বাধ্য হয়েছে বড্ড অসময়ে, ঠিক তারই মতো করে- স্বর্গে বসে এই দৃশ্যটা দেখে এবা নিশ্চয়ই ভালো নেই, ভালো থাকার কথাও তো নয়!

তথ্যসূত্র- নিউজ ডট কম ডট এইউ, হেরাল্ডসান অস্ট্রেলিয়া, ডেইলিমেইল ইউকে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button