ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ডাকসু নির্বাচন: বিজয় আসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে?

অনেকের মতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ বাংলাদেশের সেকেন্ড পার্লামেন্ট। একটা সময় যখন নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন হতো, ডাকসু নেতৃত্বের প্রতি মানুষের এতটাই আস্থা ছিল যে অনেকে সাংসারিক সমস্যার সমাধান খুঁজতেও নাকি ডাকসু নেতাদের দ্বারে আসতেন। ডাকসু থেকে জাতীয় রাজনীতিতে উঠে আসা প্রখ্যাত নেতা তোফায়েল আহমেদই এই গল্প করেছিলেন একবার।

সেই ডাকসু অচল দীর্ঘ দুই যুগেরও অধিক সময় ধরে। অচলায়ন ভেঙ্গে অবশেষে আবার ডাকসু নির্বাচন হতে যাচ্ছে। আমরা যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সময়ের শিক্ষার্থী তারা যেন একটা ঘোরের মধ্যেই আছি। কি অদ্ভুত এক সুন্দর ইতিহাসের স্বাক্ষী হবার দ্বারপ্রান্তে আমরা। কিন্তু, এই নতুন ইতিহাস কতটা সুন্দর হবে, প্রশাসন কি সত্যিই পারবে বাংলাদেশের নির্বাচন কেন্দ্রিক কলঙ্কের যে দাগ লেপে আছে বিভিন্ন ছোট বড় নির্বাচনে সেই দাগ থেকে ডাকসুকে মুক্ত রাখতে? চারদিকে এমনই প্রশ্ন এখন বাতাসে ওড়াউড়ি করছে।

আশ্চর্য হলেও সত্যি ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের সাথে ডাকসুর তুলনা দিয়ে অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করছেন, ডাকসু নির্বাচনও হয়ত একটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হবে। কেন এই শঙ্কা বিরাজ করবে ছাত্র কিংবা জনগণের মধ্যে? ডাকসু নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত সকলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মানুষ। ভোটগ্রহণের যাবতীয় দায় দায়িত্বে থাকবেন প্রতিথযশা শিক্ষকরা। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানুষ, ইতিহাস সম্পর্কে তারাও জানেন। তারচেয়ে বড় কথা তারা শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় যুক্ত। একটা কলঙ্কযুক্ত নির্বাচন উপহার দিয়ে তারা কি নিজেদের কলঙ্কিত করতে চাইবেন? ওরকম করতে হলে কতটা নিচে নামতে হবে এই সম্পর্কে নিশ্চয়ই তাদেরও ধারণা আছে। দিনশেষে এই শিক্ষকরা আবার নির্বাচন শেষে ক্লাসে ফিরবেন, ঘরে ফিরবেন। কলঙ্কের দায় নিয়ে কি করে তারা দাঁড়াবেন আয়নার সামনে?

ডাকসু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

তারপরেও অনেকে বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের লেজুড়বৃত্তিক যে ব্যবস্থা, শিক্ষক নিয়োগে দলীয় আনুগত্য দেখা ইত্যাদি কারনে তাদের ধারনা নির্বাচনে তারা ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনকে সুবিধা দিবেন। এক্ষেত্রে লক্ষ্যনীয়, বেশিরভাগ ছাত্রসংগঠন দাবি রেখেছিল ভোট কেন্দ্র হলের বাইরে হোক। এই দাবি মানেনি প্রশাসন। ভোটের সময়সীমা বাড়ানোর কথা বলেছে অনেকে। এই দাবিটিও মানা হয়নি প্রশাসনের তরফ থেকে৷ আচরণবিধি লঙ্গনের অভিযোগও প্রশাসন আমলে নিচ্ছে না বলে দাবি বিরোধী ছাত্রসংগঠন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের। অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরকে প্রার্থীতা প্রত্যাহারের চাপ দেয়ার খবর মিডিয়ায় এসেছে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রচারণার পোষ্টার ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগও বিস্তর। এদিকে ভোট অস্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে গ্রহণের সিদ্ধান্ত সন্দেহ আরো গাঢ় করছে অনেকের। প্রার্থীরা নিজস্ব পোলিং এজেন্ট রাখতে পারবেন না, সাংবাদিকরা যেতে পারবেন না গেস্টরুম পেরিয়ে বুথ পর্যন্ত। এই নিয়ে আলোচনা সমালোচনা প্রশ্ন উঠছে।

এই অবস্থায়, প্রশাসনের দায়িত্ব হবে এই সমালোচনাকে দায়িত্ব সৎভাবে পালনের মধ্যে দিয়ে ভুল প্রমাণ করা। প্রশাসনের কাজ হবে অভিযোগগুলো যাতে ফ্যাক্টস না হয়ে উঠে সেটা নিশ্চিত করা। আগামীকাল নির্বাচনের পর নিশ্চয়ই আরো বেশ কদিন ধরে নির্বাচন নিয়ে পোষ্টমর্টেম হবে। তখন প্রশাসনের ভূমিকা আসলে সার্বিকভাবে কেমন ছিলো সেটা আলোচ্য হয়ে উঠবে। নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে এই প্রশাসনের গায়ে যে কলঙ্ক জুটবে সেটা শুধু প্রশাসন নয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও কলঙ্ক, শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের সাথেও প্রতারণা সর্বোপরি জাতির সাথেও বেইমানি হিসেবে গণ্য হবে।

ডাকসু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কারন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এমন এক প্রতিষ্ঠান যে প্রতিষ্ঠান থেকে এই জাতির আশা আকাঙ্ক্ষা সবসময়ই অনেক বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে পথ দেখাবে সেটাই ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। ডাকসুর পরে নিশ্চয়ই অন্যান্য ছাত্র সংসদেরও নির্বাচন হবে। কিন্তু ডাকসু কলঙ্কিত হলে, বাকিগুলোও মর্যাদা হারাবে। একসময় ডাকসু নিয়ে যে মিথ ছিল, ডাকসু থেকে যে প্রত্যাশা ছিল সেটাও হালকা হয়ে যাবে। ২৮ বছর ধরে ছাত্রদের আশা ছিল অন্তত ডাকসু হলে কিছু পরিবর্তন আসবে, কিন্তু ডাকসু নির্বাচনই যদি হাস্যকর হয়, ছাত্রদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ডাকসু না হয়, তাহলে ছাত্রদের শেষ আশাটুকুও ধূলিস্যাৎ হয়ে যাবে।

আগে শুনতাম, জাতীয় রাজনীতিতে যুক্ত নেতারা নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শরণাপন্ন হতেন, পরামর্শ চাইতেন, দিক নির্দেশনা খুঁজতেন। আজকে নির্বাচন নিয়ে মানুষের মনে যে হতাশা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, শিক্ষকবৃন্দ এখানে ভূমিকা রাখতে পারেন। একটা মডেল নির্বাচন উপহার দিয়ে তারা জাতিকে দেখাতে গণতান্ত্রিক নির্বাচন সম্ভব, নির্বাচন চাইলেই সুষ্ঠু করা যায়।

ডাকসু নির্বাচনে সবচেয়ে ভাল লেগেছে প্রার্থী তালিকা। প্রত্যেকটি জোটেই দুর্দান্ত কিছু প্রার্থী আছেন। তারা সহবস্থানের মাধ্যমে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। টকশোতে যুক্তি দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। ইশতেহারে যেসব বিষয় তারা সংযুক্ত করেছেন, তার দশভাগও কেউ পূরণ করলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই স্বপ্নের গৌরবময় দিনগুলো আবার ফিরে আসবে। নির্বাচনে জিতলে কে কি করবেন, সেটা তো সময়ই বলে দিবে। কিন্তু, কোন জোট জিতেছে তার চেয়ে বড় কথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জিতলো কিনা!

ডাকসু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় আসবে যদি ৪৩ হাজার ছাত্রের ভোটের মর্যাদা প্রশাসন রাখতে পারেন। একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে প্রাথমিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়। তারপর আলোচনা, মতামতের ভিত্তিতে নিশ্চয়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে এগিয়ে যাবে তা নির্ধারণ হবে, কাজ হবে। কিন্তু, নির্বাচন যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়, ছাত্রদের ভোট নিয়ে তামাশা হয় তাহলে সেই স্বপ্নের অঙ্গীকার আমরা শুনে আসছি, সেটাকে একটা রসিকতা ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না। এই রসিকতা প্রশাসন করবেন না বলে আশা রাখতেই চাই। ভোট ম্যানিপুলেশন, ভোট সেন্সরশীপের ঘটনা এখানে না ঘটুক সেটাই চাই। জানি না, কে জিতবে এই নির্বাচনে, কিন্তু আমি চাই বিজয় আসুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। সুবোধ ঘরে ফিরুক আবার।

 

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button