ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

শিক্ষকরাই যদি এমন অনৈতিক হয়…

ডাকসু নির্বাচনের আগের কথা। প্রার্থীদের বয়স সংক্রান্ত যোগ্যতা কি নির্ধারণ হবে সেটা আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে ঠিক হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী এবং সর্বোচ্চ ৩০ বছর বয়সধারীরা ডাকসুর প্রার্থী হতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এনামুজ্জামানের কথাটিতে এই কথা আরো পরিষ্কার হয়ে যায়।

তিনি বলেছিলেন, “রেজিস্ট্রার এনামুজ্জামান জানান, যেসব শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে চান্স পেয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল ও পিএচডি করছে তারা সবাই ভোটার ও প্রার্থী হতে পারবে। তবে তাদের বয়স সীমা হবে সর্বোচ্চ ৩০ বছর। যাদের বয়স ৩০ এর অধিক তারা ভোটার বা প্রার্থী হতে পারবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা ডাকসুর ভোটার ও প্রার্থী হবে পারবেন না।” এছাড়া সান্ধ্যকালীন কোর্সের শিক্ষার্থীরাও ভোটার বা প্রার্থী হতে পারবেন না বলে তখন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল।

অর্থাৎ, তিনিই প্রার্থী হবার যোগ্যতা অর্জন করবেন যার বয়স ত্রিশের ভেতর এবং যিনি পরীক্ষা দিয়ে চান্স পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ডিপার্ট্মেন্টে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল বা পিএইচডি করছেন।

এই মৌলিক রীতি ভঙ্গ করেই ডাকসুর প্রার্থী হয় ছাত্রলীগের বেশ কজন প্রার্থী। তাদের সহযোগিতা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন সর্বোপরি ডাকসু নির্বাচনে যেসব শিক্ষক জড়িত ছিলেন তাদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকার সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেয়া যায় না। কারণ, যারা অবৈধভাবে ভর্তি হয়ে নির্বাচনের প্রার্থিতার আবেদন করেছেন, তাদের আবেদন সফলভাবে গৃহীত হয়ে গেল কোনো যাচাই বাছাই ছাড়াই – এতে কি প্রমাণিত হয়? ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন বলেই কি বাড়তি সুবিধাটুকু তাদেরকে সচেতনভাবে দেয়া হয়েছিলো?

কি হয়েছিলো তখন, সেই ঘটনা উঠে এসেছে দৈনিক প্রথমআলোর প্রতিবেদনে। জানা যায়, ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের কতিপয় প্রার্থীর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ হয়ে যাওয়ায় নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের অনিশ্চয়তায় পড়বার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই তারা ভর্তি হন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের একটি বিভাগের সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স প্রোগ্রামে। যদিও তখন এই প্রোগ্রামে ছাত্র নেবার কোনো সার্কুলার ছিলো না। কোনো ভর্তি পরীক্ষাও ছিল না।

নিয়ম আছে প্রোগ্রামটিতে ভর্তি হতে হলে, ভর্তি পরীক্ষা ও মৌখিক পরীক্ষায় উর্ত্তীন হতে হবে। অন্যথায় সেই প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়া যাবে না। কিন্তু, ডাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা পূরণের জন্যে যেসব ছাত্র এই প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত হন, তাদের কাউকেই ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়নি! তারা ভর্তি হয়েছিলেন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর, ফেব্রুয়ারিতে। একাধিক ছাত্র এই ভর্তি না হয়েও ছাত্রত্ব নেয়ার বিষয়টি স্বীকারও করেন প্রথমআলোর কাছে।

গত ১১ ফেব্রুয়ারি ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ছাত্রলীগের ৩৪ জন সাবেক ও বর্তমান নেতা ছাত্রত্ব টিকিয়ে রাখতে ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের মাস্টার্স অব ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামে ভর্তি হন। এই ৩৪ জনের মধ্যে ৮ জন নির্বাচনে অংশ নেয়ার টিকেট পান, বাকিরা রাজনৈতিক সমীকরণে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। যে ৮ জন অবৈধ ছাত্রত্বধারী প্রার্থী অংশ নিয়েছেন ডাকসু নির্বাচনে, তাদের মধ্যে ৭ জন বিজয়ী হয়েছেন। অর্থাৎ, দুই যুগের অধিক সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর অচল ডাকসু সচল হবার যে নির্বাচন, সেই নির্বাচনে জিতেছেন এমন ৭ জন যাদের নির্বাচনে অংশ নেয়ার যোগ্যতা নিয়েই সংশয় ছিল।

সেই সংশয় দূর করতে সাহায্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ও ভিসি। তাদের চিরকুটের রেফারেন্সে ৩৪ জনকে ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া নিয়মের তোয়াক্কা না করেই অবৈধভাবে ভর্তি করা হয়। এই মাস্টার অব ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের একজন অফিস সহকারী চিরকুটের ব্যাপারটি স্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, তফসিল ঘোষণার পর ছাত্রলীগ নেতারা উপাচার্য বা ডিনের সই করা চিরকুট তাঁদের কাছে নিয়ে আসেন। এর ভিত্তিতেই তাদের ভর্তি ফরম ও টাকা জমা দেওয়ার রসিদ সরবরাহ করা হয়।

ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম

চিরকুটে ভর্তি হওয়া ছাত্ররা অবশ্য ক্লাস পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। হাজিরা খাতায়ও তাদের নাম নেই। তবু তারা ছাত্র। ছাত্র হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।

কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য পদে নির্বাচিত হওয়া প্রার্থী মো. রাকিবুল হাসান যার শিক্ষাবর্ষ ২০০৯-১০ তিনি স্বীকার করেছেন ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই তিনি ভর্তি হন ডিন বরাবর আবেদন করে। উল্লেখ্য, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত।

আরেক ডাকসু সদস্য নজরুল ইসলাম, তিনিও ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ডাকসুতে নির্বাচন করার জন্যেও তিনিও ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া ভর্তি হন এই প্রোগ্রামে। তিনি আবার আবেদন করেছিলেন ভিসির কাছে। সেই আবেদন পরবর্তী সময়ে প্রোগ্রামের পরিচালক ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিনের কাছে পাঠানো হয়। ডাকসুর সদস্য মুহা. মাহমুদুল হাসানও পরীক্ষা ছাড়াই ভর্তি হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

ডাকসুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক মো. আরিফ ইবনে আলী এবং স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরী অবশ্য বলেন মাস্টার অব ট্যাক্স ম্যানেজমেন্টে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েই তারা ভর্তি হন! আর, সরাসরি কোনো উত্তর দেননি ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক শাকিল আহমেদ তানভীর। কিন্তু ডাকসুর সদস্য নিপু ইসলাম অবশ্য বলেন, তিনি সহ তারা চারজন একসাথে ভর্তি হয়েছেন। কাউকে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয়নি।

এই যখন অবস্থা তখন ভিসি কি বলেন, তা শুনে হাসি না এসে উপায় নেই। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ভর্তির বিষয়ে তাঁর জানা আছে। ওই প্রোগ্রাম সান্ধ্যকালীন হওয়ায় ভর্তির প্রক্রিয়াটি তাঁর জানা নেই।

আলবার্ট আইনস্টাইন, আখতারুজ্জামান

ভিসি হলেই দুনিয়ার সব জানবেন এমন না। বর্তমান ভিসি অনেক কিছুই এমন জানেন না। জিজ্ঞেস করলে তিনি কিছু মুখস্থ জবাব দেন। জানা নেই, প্রক্রিয়া চলছে, আমরা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছি, তদন্ত করে বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে ইত্যাদি ইত্যাদি পরিচিত মন্তব্যই ঘুরে ফিরে করে থাকেন তিনি। কিন্তু তার দেয়া চিরকুটের রেফারেন্সে যে ছাত্ররা ভর্তি হলো, এটার জবাব তো তিনি দিতেই পারেন। নাকি এটাও তিনি জানেন না? জবাব দেননি। বরং, তিনি বল ডিনের কোর্টে ঠেলে দিয়ে ডিনের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।

ডিন কি বলেছেন তাহলে? বিজনেস ফ্যাকাল্টির ডিন যে জবাব দিয়েছেন তাতে ভীষণ অবাক হয়েছি। শিবলী রুবাইয়াত স্যার ডিন হিসেবে অসাধারণ, বিশেষ করে বিজনেস ফ্যাকাল্টিকে অন্যরকম উচ্চতায় নিয়ে গেছেন অবকাঠামোগত উন্নতি করে। কিন্তু, অনেকদিন এক গদিতে থাকার কারণেই কিনা কে জানে, তিনি কি কিছুটা অসহিষ্ণু হয়ে গেছেন? তিনি সাংবাদিককে জবাব দেন, “আপনি অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে খোঁজখবর করছেন। আপনি ডাকসুর যেসব নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন, তারাও আমার কাছে এসেছিল। আপনি তাদের কাছে উল্টাপাল্টা কথা জিজ্ঞেস করেছেন। আপনি আমাদের ম্যালাইন করার জন্য কিছু একটা লিখতে চাচ্ছেন। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আপনার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলব না।”

এখানে অসৎ উদ্দেশ্য ঠিক কোথায়? ডাকসু নেতারা যারা ডিন এবং ভিসির সুপারিশে অবৈধ ভাবে ভর্তি হয়েছে, তাদের অনেকেই তো সহজেই স্বীকার করেছে। আর আপনি, আপনারা এভাবে ভর্তির সুযোগ দিয়ে এখন অসৎ আর সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলছেন! নিয়মের বাইরে গিয়ে এভাবে ভর্তি করানো অসততা না? শিক্ষক হিসেবে কি ভালো উদ্দেশ্য সাধন করেছেন এভাবে তাদের ভর্তির সুযোগ দিয়ে, চিরকুট দিয়ে?

আপনার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির উপর চিরকুট দিয়ে ভর্তি করানোর যে অভিযোগ উঠেছে, তা শিক্ষক হিসেবে অনৈতিক আচরণের বহিঃপ্রকাশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে এসে এসব ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়কে কলঙ্কিত করে। শিক্ষার্থীদের আশা আকাঙ্ক্ষার জায়গাটিতে হতাশা তৈরি করে। কোন স্বার্থ উদ্ধার করছেন আপনারা এসব করে আপনারা ভালো জানেন, কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ঐতিহ্য, সম্মান প্রতিনিয়ত কমছে আপনাদের সম্মিলিত এসব কর্মকাণ্ডে। ‘লজ্জা’ নামক শব্দটার সাথে হয়ত আপনাদের এখন আর পরিচয় নেই, কিন্তু শিক্ষার্থীদের বড়ই লজ্জা হয় এসব দেখেশুনে, অনেক লজ্জা…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button