অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

প্রতিদিন এই শিখ মন্দিরে দেয়া হয় ইফতার, যে মন্দিরে নামাজও পড়েন মুসলিমরা!

দুবাইয়ের শিখ ধর্মালম্বীদের একটি দারুণ মন্দির আছে। যেখানে তারা নিজস্ব ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করেন। শিখদের এই মন্দিরকে এমনিতে বলা হয় গুরুদুয়ারা। দুবাইয়ের মন্দিরটির নাম গুরুনানক দরবার শিখ মন্দির। সাত বছর আগে দুবাই নিবাসী শিখ সম্প্রদায়দের একটা দাবি ছিল, তাদের নিজস্ব একটা মন্দির থাকুক এখানে। চাহিদার প্রেক্ষিতে তখন দুবাইয়ের প্রাণকেন্দ্রে শিখ ধর্মাবলম্বীদের প্রার্থনা, ধর্মীয় কাজের জন্য এই মন্দিরটি স্থাপিত হয়।

দুবাইয়ের শিখ মন্দির
দুবাইয়ের শিখ মন্দির | Image- Facebook

কিন্তু, মুসলমানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস রমজানে এই শিখ মন্দির যেন সব ধর্মের মানুষের মিলনায়তন হয়ে যায়। বিশেষ করে মুসলিমদের জন্য তাদের উদ্যোগ প্রশংসা পাওয়ার মতো। এই মাসে এই শিখ মন্দিরে সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়। ঘটনাটা বিষদে বলি।

শুরুর বছর থেকেই শিখ মন্দিরটিতে রমজান মাসে একবার ইফতারের আয়োজন করা হতো মুসলিমদের জন্য। রীতিমতো কয়েকজম শেফ মিলে বিশাল কর্মজজ্ঞ শুরু হয়ে যেত ইফতার আয়োজনে। মন্দিরের ভেতরের ঝমকালো পরিবেশও দেখার মতো। তারচেয়ে বড় কথা, এখানে অতিথিদের বেশ সম্মানের সাথে ট্রিট করা হয়। রমজান মাসে মুসলিম মেহমানদের তারা ইফতারের নিমন্ত্রণ করেন। ইফতার শেষে মুসলিমদের জন্যে আলাদা পরিচ্ছন্ন জায়গা করে দেওয়া হয়, যেন তারা সেখানে নামাজও আদায় করতে পারেন।

দুবাই শিখ মন্দির
Image – Facebook

দুবাইয়ের শিখ মন্দির এই কালচার ধরে রেখেছে প্রতিটি বছর ধরেই। কিন্তু এবছর তারা পরিসর বৃদ্ধি করেছে আয়োজনের। আপনি যদি দুবাইয়ে রমজানের বিকেলে শিখদের গুরুদুয়ারাতে যান, খেয়াল করলেই দেখবেন এখানে স্রোতের মতো বলেন বিভিন্ন রকমের মানুষ প্রবেশ করছে। প্রতিদিনই একই দৃশ্য, কারণ এখানে এবছর প্রতিদিনই রমজান উপলক্ষে তারা রোজাদারদের জন্যে ইফতারের আয়োজন করেছেন। সন্ধ্যে নামার মুখে হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয় শিখ মন্দির।

আরো উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, এই শিখ মন্দিরে ইফতার করতে হলে আপনাকে রোজা রাখতেই হবে এমন নয়। আপনাকে মুসলিম হতে হবে এমন বাধ্যবাধকতাও নেই। শিখ মন্দিরটির মূল উদ্দেশ্য ভ্রাতৃত্ববোধের সাথে এই রমজান মাসটি পালন করা। মাগরিবের আজানের ধ্বনির সাথে খেজুর, রুহ আফজাহ শরবত দিয়ে রোজা ভাঙ্গেন মুসলিমরা। তবে, শিখ মন্দিরটিতে অনেকরকম খাবারের পরিবেশনা থাকে। ভারতীয় স্পেশাল ডালের সাথে থাকে নান রুটি। পনির এবং বিরিয়ানিও খেতে পারবেন আপনি। ডেসার্ট হিসেবে মিষ্টি রসমালাই দেয়া হয় সকলকে।

image source – Khaleej Times

রমজানের যে মাহাত্ম্য, সবাইকে নিয়ে একত্রে ইফতার করা, অভুক্তের মর্মবেদনাকে উপলব্ধি করা, অভুক্তদের খাবার উপহার দেয়া – এসব মূল্যবোধকে মূলত ধারণ করেছে শিখ মন্দির। ধর্ম, বর্ণে মানুষের ভিন্নতা যেমন আছে, তেমনি মানুষের মধ্যে মৌলিক কিছু কমন ফিচারও আছে। দুবাইয়ের শিখ সম্প্রদায়ের মন্দির মানুষে মানুষে সম্প্রীতির বার্তাটাকেই ধারণ করেছে। এখানে কে কোন ধর্মের তা মুখ্য নয়, মুখ্য হলো সবার প্রতি সবার শ্রদ্ধাবোধ, ভালবাসা এবং সবার মধ্যে যে ভাল গুণ আছে তা নিজেদের মধ্যে শেয়ার করা।

আপনি এখানে দেখবেন ইফতারের আগে একজন ইমাম আল্লাহ’র বাণী আলোচনা করছে, রমজানের শিক্ষাগুলো নিয়ে কথা বলছেন। এই বক্তব্য যে শুধু মুসলিমরাই শুনছে তা নয়, খেয়াল করলে দেখা যায়, শিখ কিংবা অন্য ধর্মের মানুষরাও এই কথাগুলো মন দিয়ে শুনছে। ইফতারে সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলা ঘটে এখানে। সবার মধ্যে কি অদ্ভুত ভাতৃত্ববোধের বিকাশ দেখা যায়।

শুধু তাই নয়, ইফতারের পর মাগরিবের নামাজটা মুসলিমরা এখানেই পড়ে ফেলেন। শিখ মন্দিরের বিশাল একটি রুম পরিষ্কার করা থাকে, সব ব্যবস্থা দেয়া থাকে। মুসলিমরা সেখানে সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজেকে নিবেদন করেন, সেজদা করেন। অন্তর পরিষ্কার থাকলে, মনে ধর্মান্ধতা না থাকলে সকলের সাথে মিলেমিশেও নিজের ধর্ম পালন করা যায়। এজন্যে কাউকে অশ্রদ্ধা করতে হয় না, কাউকে আক্রমণ করতে হয় না। কাউকে ঘৃণার বুলি দিয়ে মাথার খুলি উড়িয়ে দেয়ার মনোভাব দেখাতে হয় না। দুবাইয়ের শিখ মন্দিরে রমজান মাস যেন সেই শিক্ষাটাই স্মরণ করিয়ে দেয় সবাইকে।

দুবাই শিখ মন্দির, ইফতার, ধর্মীয় সম্প্রীতি

উগ্রবাদী, চরমপন্থী, ধর্মান্ধদের বেহুশ কুকর্মের আশংকার এই সময়ে পৃথিবীতে শান্তি আনতে পারে সব ধর্মের মানুষের সহবস্থান, বন্ধুত্ব। এমনটাই মনে করেন দুবাইয়ের শিখ মন্দিরের চেয়ারম্যান সুরেন্দর সিং কান্দাহারি। তিনি মনে করেন, সবার সাথে সবার যোগাযোগ, ভাতৃত্ব, কথা বলা, সহমর্মিতা এসব পারে মানুষকে এক জায়গায় নিয়ে আসতে, উগ্রবাদীতা থেকে দূরে রাখতে।

দিল্লীতে অবস্থিত আরব আমিরাত এম্বাসিতে একসময় কাজ করতেন আল সায়েগ। তার একটি উক্তি খুব তাৎপর্যময় মনে হয়েছে। তার কথা দিয়ে লেখাটি শেষ করছি-

“We all worship God but it our different ways, and God has created us differently so we learn from one another, not fight one another”

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button