ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল গর্ব উপাচার্য আখতারুজ্জামান!

গতকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি ৪৫ সেকেন্ডের ভিডিও ভাইরাল হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আখতারুজ্জামান স্যারের বক্তব্য খন্ডিত করে ছাড়া হয়েছে ভিডিওটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য ভর্তি হওয়া নবীনদের উদ্দেশ্যে নবীনবরণের পোগ্রামে তিনি বক্তব্য রাখছিলেন। সেখানেই তিনি বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের উদাহরণ দিতে গিয়ে টেনে আনেন টিএসসির চা, সিঙ্গারা, সমুসা, চপের প্রসঙ্গ। তার বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, দশ টাকায় চা, সিঙ্গারা, চপ, সমুসা যে পাওয়া যাচ্ছে এটা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বিশ্ববাসী এই খবর জানতে পারলে গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম উঠে যাবে এই ঐতিহ্যের। যদিও ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয় মূলত ইউনেস্কো। যাইহোক, স্যার বলেছেন যেহেতু তাই তিনি যা বলবেন সেটাই ঠিক। স্যারের ৪৫ সেকেন্ডের ভিডিওর বক্তব্য হুবহু যদি উল্লেখ করি, সেটা দাঁড়াবে এরকম-

“দশ টাকায়..দশ টাকায় এক কাপ ছা, একটি সিংগারা, একটি ‘সপ’ এবং একটি ছমুচা… দশ টাকায় পাওয়া যায় বাংলাদেশে, পিরথিবীতে। এটি যদি কোন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঝানতে পারে, বিশ্ববাসী, তাহলে এটা গিনিছ বুকে রেকড হবে। (লাজুক হাসি মুখে রেখে) দশ টাকায়.. দশ টাকায় এক কাপ ছা… গরম পানিও তো দশ টাকায় পাওয়া যাবে না রাস্তায়। দশ টাকায় এক কাপ ছা, একটা সিংগারা, একটা ছমুচা, এবং একটা ‘সপ’ (বিজ্ঞের মত চেহারা করে)এগুলো পাওয়া যাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সাত্র’ -শিক্ষক কেন্দ্রে৷ এটি আমাদের গর্ব, এটি আমাদের ঐতিহ্য।”

ভিসি আখতারুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, টিএসসি

আখতারুজ্জামান স্যারের এই বক্তব্য স্বভাবতই ভাইরাল হয়েছে। তার কথার ঢঙয়ে আঞ্চলিক টান থাকে। হয়ত একারণেই তার বক্তব্য নিয়ে বেশি হাসাহাসি হচ্ছে। তবে আঞ্চলিক টান থাকা দোষ না। আমাদের রাষ্ট্রপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর জনাব আবদুল হামিদের আঞ্চলিক ভাষার বক্তব্য শুনে কি মানুষ আনন্দ পায় না? তার বক্তব্য কোট করে না? কিন্তু, আখতারুজ্জামান স্যারের বক্তব্য নিয়ে কেন এত বেশি ট্রল হচ্ছে?

কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসি আসলে নিজেই এক ঐতিহ্য। তিনি কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় প্রশাসনিক জায়গা থেকে হাস্যকর বক্তব্য, সিদ্ধান্ত দিয়ে আলোচিত হয়েছেন৷ ছাত্রলীগ নেত্রী এষাকে তদন্ত ছাড়াই বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত দিয়ে পরে আবার সেই সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নিয়েছেন। সেই সময় উপাচার্য হিসেবে তিনি গোটা ব্যাপারটাকে স্মার্টভাবে মোকাবেলা করতে পারেননি। তারপর প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে হাস্যকর বক্তব্য দিয়ে তিনি আবারো আলোচনায় এসেছেন। ফলে, তার বক্তব্যে যে হাস্যরসের উপাদান থাকবে এটা একটা ঐতিহাসিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে, নবীন বরণের বক্তব্য খন্ডিতভাবে প্রচার হওয়ায় বুঝার উপায় নেই পুরো ভিডিওতে তিনি বার্তা দিতে চেয়েছেন। কিন্তু, বক্তব্যের যতটুকু নিয়ে ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে তাতে এইটুকু বলতে হয়, একজন উপাচার্যের বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে কথা বলার উপকরণ কত কম থাকলে এই দশ টাকার নাশতার কথা ৪৫ সেকেন্ডের মধ্যেই একাধিকবার তাকে রিপিট করতে হয়!

আলবার্ট আইনস্টাইন, আখতারুজ্জামান

এক টাকার চায়ের মধ্যে অবশ্যই ঐতিহ্যের ঘ্রাণ আছে। টিএসসিতে গিয়ে বিশ টাকায় খাবার খাওয়ার মধ্যে অবশ্যই শান্তি কাজ করে৷ ঐতিহ্যের কথা বলতে গেলে বলতে হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটির প্রত্যেকটা কনাতেই ঐতিহ্যের দাগ লেগে আছে। আমি ফার্স্ট ইয়ারে যখন ক্যাম্পাসে হাঁটতাম, তখন আমার কাছে আশ্চর্য লাগত, অদ্ভুত একটা অনুভুতি হতো এই ভেবে যে আমি যেখান দিয়ে হাঁটছি, এখানেই এই জায়গাগুলো দিয়ে একদিন বঙ্গবন্ধু হাঁটতেন, হুমায়ূন আহমেদ হাঁটতেন, মুনীর চৌধুরী, আহমেদ ছফা হাঁটতেন, রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এখানেই কোথাও বসে কবিতা লিখতেন। ভাবতে খুব সুন্দর লাগত। এই বিশ্ববিদ্যালয় কত বিখ্যাত মানুষের জন্ম দিয়েছে, কত বিখ্যাত আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে। কত দারুণ ইতিহাসের লিগ্যাসি বেয়ে আমরা আজ সময়ের এই ফ্রেমে উপনীত হয়েছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য নিয়ে কথা বললে অনেক কিছু বলা যাবে। যা বলা যাবে তা সবই অনেক আগের কিংবদন্তিদের রেখে যাওয়া ইতিহাস। কিন্তু, আমরা কি ঐতিহ্য রেখে যাচ্ছি? আমাদের ভিসি শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কি রেখে যাচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এখন ডিপ্রেশনে ভোগে। দশদিনের ব্যবধানে চারজন মারা গেছে গতবছর। ফার্স্ট ইয়ারের ছেলেমেয়েরা অনেক কনফিউজড থাকে। যারা হলে থাকে, তারা সিট পায় না। একটা বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। আমরা গবেষণা কেন হয় না সেই দুঃখ করি। মৌলিক সুবিধা প্রাপ্তি নিয়েই হিমশিম খেতে হয়, গবেষণার আশা সেখানে কিভাবে করা সম্ভব! নবীন বরণের আয়োজনে চা, সিঙ্গারার গল্প শুনিয়ে এই নবীণদের মোহগ্রস্থ করছেন স্যার? কদিন পর এরা যখন ডিপ্রেশনে ভুগবে, কোথাও কেউ থাকবে না তাদের পাশে।

প্রথম বর্ষের নবীন বরণে তাই একজন উপাচার্য চা, সিঙ্গারার গল্প বলবেন নাকি তাদের সাহস দিবেন, ভবিষ্যতের হতাশা দূর করতে সহায়ক এমন কিছু বলবেন, তাদেরকে দিকনির্দেশনা দিবেন? চা, সিঙ্গারা বেশিদিন টানে না। প্রথম কয়দিন ছেলেপেলেরা খুব হাকিমের খাবার, ডাকসুর খিচুড়ি, টিএসসির চা এসবের মধ্যে রোমাঞ্চ খুঁজে পায়। পরে গিয়ে অভ্যস্ততা তৈরি হয়। সাথে আশা এবং প্রাপ্তির অমিল ধরা পড়ে অনেক। উপাচার্য চা, সিঙ্গারার গল্প শুনিয়ে গিনেজ রেকর্ডে নাম লেখাতে না চেয়ে যদি চাইতেন আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা বদলে দেবেন, এই নবীনদের যাবতীয় সমস্যা দূর করতে সাহায্য করবেন, তাদের জন্য খাবারের মান ঠিক রাখবেন, লাইব্রেরির পরিসর বৃদ্ধি করবেন, তাদের মাথা গুজার ঠাঁই নিশ্চিত করবেন – সেটা আরো সুন্দর লাগত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ওয়ার্ল্ড র‍্যাংকিংয়ে নেই বলে অনেকের খুব হতাশা। আমার তেমন কষ্ট নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে র‍্যাংকিং দিয়ে বিচার করা যাবে না। কখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের এক নাম্বার র‍্যাংকিংয়ে চলে আসলেও তাতে কখনোই ফুটে উঠবে না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমের বাইরের শিক্ষাগুলোর গুরুত্ব, মাহাত্ম্য কতটা বেশি। এগুলো কোনো র‍্যাংকিং দিয়ে মাপা যায় না। কিন্তু, তাই বলে এমন তো না, একজন উপাচার্য চা, সিঙ্গারার ঐতিহ্যকে গিনেজ রেকর্ড বুকে উঠানোর কথা বলবেন! এই গুরুত্বহীন আলাপ, তার ব্যক্তিত্বকে আরো গুরুত্বহীন করে তুলেছে আসলে। তিনি যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিনিধিত্ব করছেন সর্বোচ্চ পর্যায়ে, তাই বক্তব্য দেয়ার সময় তার আরো সতর্ক থাকা উচিত। উপাচার্যদের তো আবেগী হয়ে ফার্স্ট ইয়ারের ছেলেমেয়েদের মতো কথা বললে চলে না..

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button