ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ধুর! এসব কীসের র‍্যাংকিং-ফ্যাংকিং! সব ষড়যন্ত্র!

লন্ডনভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ক সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন প্রতি বছরের মতো এবারও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ব্যবিদ্যালয়গুলোর একটি র‍্যাংকিং প্রকাশ করেছে, এই র‍্যাংকিঙে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্থান অর্জন করেছে বৃটেনের ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ডাকা হয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে, সেই অক্সফোর্ডের ঠাঁই নেই তালিকার প্রথম এক হাজারের মধ্যেও! শিক্ষা ও গবেষণাক্ষেত্রে বহির্বিশ্বের সঙ্গে আমাদের দূরত্বটা কত প্রকট, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে টাইমস হায়ার এডুকেশনের এই র‍্যাঙ্কিঙ।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মোট ৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান করে নিয়েছে এই তালিকার প্রথম এক হাজারের মধ্যে। চলতে ফিরতে ভারতকে নিয়ে আমরা কত রকমের বাজে মন্তব্য করি, ধর্ষণের দেশ, গোমূত্রের দেশ, খোলা টয়লেটের দেশ বলা নিজেদের সেরা দাবী করি, সেই ভারতের ছত্রিশটা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়টাকে পেছনে ফেকে দিয়েছে শিক্ষা আর গবেষণার ক্ষেত্রে। ওরা তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে, আর আমরা পুরনো জরাজীর্ণতাকে আঁকড়ে ধরে অন্ধ অহমিকায় বেঁচে আছি!

ভারতের কথা বাদই দিলাম, বিশাল দেশ, জনসংখ্যাও সোয়াশো কোটির ওপরে তাদের। যে দেশটাকে নিয়ে আমরা উঠতে বসতে মজা করি, ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে যে দেশকে বিবেচনা করি, সেই পাকিস্তানের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় জায়গা করে নিয়েছে এই তালিকার সেরা এক হাজারের মধ্যে। ইসলামাবাদের কায়দে আজম বিশ্ববিদ্যালয় তো সেরা পাঁচশোর মধ্যেই ঢুকে গেছে! রাজনৈতিক অস্থিতিশীলিতা, সেনাশাসন, জঙ্গিবাদ, অর্থনৈতিক সমস্যা- সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে ঠিকই উন্নতি করছে পাকিস্তান, আর আমরা বসে বসে আঙুল চুষছি!

অবশ্য, একটা দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিসি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা বা একাডেমিক বিষয়াদি রেখে ক্যান্টিনের চা-চপ আর সিঙাড়ার ঐতিহ্য নিয়ে গর্ববোধ করেন, তাহলে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দৌড় কতদূর, সেটা সহজেই বোঝা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষকই যেখানে বিদেশী শিক্ষকের গবেষণাপত্র নকল করে নিজের নামে চালিয়ে দেন, তখন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিঙে জায়গা না পাওয়া নিয়ে আফসোস করাটাই বাতুলতা!

শিক্ষা আর গবেষণায় যে জাতি যতো বেশি বিনিয়োগ করেছে, সেই জাতির উন্নতি হয়েছে তত বেশি। ইউরোপ-আমেরিকার দিকে যাওয়ার দরকার পড়বে না, জাপান, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়ার দিকে তাকালেই ব্যাপারটা বোঝা যাবে। আমাদের দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটের চেয়ে বিটিভির বাজেট থাকে কয়েকশো গুণ বেশি- র‍্যাঙ্কিঙে উন্নতি কি তাহলে আকাশ থেকে হবে? ঘানা আর উগাণ্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ও এক হাজারের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে, অথচ আমরাই পারিনি!

ফুলার রোড ( বর্তমান ভিসি চত্বর ) , নীলক্ষেত এলাকা।
সাদাকালো ছবিটি ১৯৬৫ সালে তোলা..

২০১৬ সালে এই র‍্যাঙ্কিঙে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিলো ৬শ থেকে আটশর মধ্যে। তবে দুই বছরের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান হঠাৎই নেমে যায়, তার কারণ শিক্ষার যথাযথ পরিবেশ না থাকা, গবেষণার সংখ্যা ও সুনাম কমে যাওয়া, সাইটেশন বা গবেষণার উদ্ধৃতি কমে আসা, এই খাত থেকে আয় কমা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কমে যাওয়া। র‍্যাংকিংয়ে বিদেশী ছাত্রের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছে শূন্য। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালটির ৪ হাজার ১০৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে কোন বিদেশী শিক্ষার্থী নেই কিংবা থাকলেও সেই সংখ্যা সন্তোষজনক নয়।

গত এক দশকে গবেষণাক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বলার মতো কোন অর্জন নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র‍্যাজুয়েট হয়ে শিক্ষার্থীরা বাইরের দেশগুলোতে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছে, কারণ অনার্সের পরে মানসম্মত মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের সুযোগটা নেই দেশের কোথাও। র‍্যাঙ্কিঙে শীর্ষস্থানে থাকা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর লুইস রিচার্ডসন বলছিলেন, “অক্সফোর্ডের সফলতার পেছনে একটা বড় কারণ হচ্ছে বিশ্বের আরো অনেক খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আমাদের গবেষণা সহযোগিতা।” আর আমাদের ভিসিরা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোকে তেল দিয়েই কূল পান না, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ বাড়াবেন কিভাবে?

এরপরেও আমরা মিথ্যে অহমিকায় আক্রান্ত হবো, সংবাদ সম্মেলন করে দাবী করবো, এসব র‍্যাঙ্কিং মিথ্যে, বানোয়াট! বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা আর গবেষণা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে আমাদের শিক্ষকেরা সঅময় ব্যয় করবেন ছাত্রনেতাদের কিভাবে পরীক্ষা ছাড়া মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি করা যায়, কিভাবে উল্টোপাল্টা যুক্তি দেখিয়ে সেসবকে হালাল প্রমাণ করা যায়। দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেরুদণ্ড সোজা করে রাখা শিক্ষক নিয়োগ না করে তেলবাজ লোকজন দিয়ে ভরে রাখলে এরচেয়ে ভালো কিছু আশা করাটাই বোকামী!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button