ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

কয় টাকা টিউশন ফি দাও? এত দাবী কেন তোমাদের?

আমিনুল ইসলাম

আমি একজন’কে ভালোবাসি।

আমি মোটামুটি নিশ্চিত আমার ভালোবাসা’র গল্প শুনতে নিশ্চয় আপনারা আগ্রহী হবেন।

তার আগে বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে’র রোকেয়া হলে’র প্রভোস্টে’র ব্যাপারে বলে নেয়া যাক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে’র এই শিক্ষক গতকাল তার ছাত্র’দের বলেছেন

-কয় টাকা টিউশন ফি দেও? এতো দাবী কেন তোমাদের?

ভদ্রমহিলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে’র শিক্ষক। তিনি কি করে এই কথা বললেন, সে তিনি’ই ভালো বলতে পারবেন। এর চাইতেও অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে-ছাত্রদের সঙ্গে তিনি যে ভাষায় আর যেই ভঙ্গী’তে কথা বলছিলেন!

তার কথা বার্তা’র ধরণ দেখে বুঝা দায়- তিনি কি আদৌ একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে’র শিক্ষক কিনা!

এই ভদ্রমহিলা কি জানেন না-তার নিজের বেতন আসে এই দেশের কৃষক-শ্রমিকদের ঘামের পয়সায়?

তিনি নিজে যখন পড়াশুনা করেছেন, তিনি কয় টাকা টিউশন ফি দিয়েছেন? তার ফি’র টাকা তো এই দেশের কৃষক-শ্রমিক’ই যোগার করেছে।

এখন শিক্ষক হয়ে সব ভুলে গিয়ে ছাত্রদের কৃষক-শ্রমিক বলে গালি দিচ্ছেন!

অবশ্য হবে’ই না বা কেন!

আজ’ই পত্রিকায় পড়লাম কুষ্টিয়া’র ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক’কে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

তো, কেন তাদের বরখাস্ত করা হয়েছে?

কারন তারা প্রতি জনের কাছে ১৮ লাখ টাকা নিয়ে নিয়োগ বাণিজ্য করছিল।

অর্থাৎ ওই বিশ্ববিদ্যালয়টি’তে যারা শিক্ষক হতে চেয়েছে, তাদের প্রত্যেকে’র কাছে ১৮ লাখ টাকা নিয়ে নিয়োগ দেয়ার সঙ্গে এরা জড়িত ছিল!

এই হচ্ছে অবস্থা! এদের তো অডিও ফাঁস হয়েছে। আপনি নিশ্চিত জেনে রাখুন এভাবে আরও অনেকে’ই শিক্ষক হয়েছে। যাদের অডিও হয়ত ফাঁস হয়নি!

এরা’ই পড়াচ্ছে আমাদের ছেলে-পেলেদের!

আচ্ছা, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর শিক্ষকদের বেতন আসলে কতো?

১৮ লাখ টাকা দিয়ে তারা শিক্ষক হতে চাইছে কেন?

কারন আর কিছু’ই না। শিক্ষক হয়ে এরপর তো এরা আর শিক্ষা দেবে না। করবে রাজনীতি কিংবা নিয়োগ বাণিজ্য। আর এভাবে’ই টাকার পাহাড় গড়বে আর আশপাশের মানুষদের মানুষ মনে করবে না।

আশপাশের মানুষ তো দূরে থাক, নিজেদের ছাত্রদের’ই আর মানুষ মনে হচ্ছে না।

এদিকে শুনতে পেলাম সংসদে নাকি বিদেশ থেকে শিক্ষক আনার প্রস্তাব নিয়ে কথাবার্তা চলছে।

আমাদের নীতিনির্ধারক’দের নাকি মনে হয়েছে বিদেশ থেকে শিক্ষক আনলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ভালো হয়ে যাবে!

বিদেশ থেকে শিক্ষক আনা মানে কি? সাদা চামড়া’র মানুষদের নিয়ে আসা তো?

তা, সাদা চামড়া’র কিছু শিক্ষক’কে দেশে নিয়োগ দিয়ে দিলেই সব বদলে যাবে?

বাহ, কি চমৎকার যুক্তি!

আমি নিজে ইউরোপে’র বিশ্ববিদ্যালয় গুলো’তে প্রায় ছয় বছরের উপরে পড়াচ্ছি। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জার্মানি, আফ্রিকা, এশিয়ার কতো ছাত্র-ছাত্রী আমি নিজে পড়ালাম। আমার মতো তো এমন অনেক শিক্ষক আছে ইউরোপ-আমেরিকার অনেক নাম করা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশ্নফাঁস

আপনারা তো এদের সাহায্যও নিতে পারেন। সেটা না করে কেন সাদা চামড়া’র শিক্ষক আপনাদের নিয়োগ দিতে হচ্ছে?

কারন আপনারা ভাবছেন বাংলাদেশিদের নিয়োগ দিলে যেই লাউ সেই কদু’ই থেকে যাবে। অর্থাৎ এরা এক সময় না এক সময় দুর্নীতি করে বেড়াবে’ই!

ভালো কথা মেনে নিলাম। তো, আপনারা কি ভাবছেন আপনাদের সিস্টেম পরিবর্তন না করে আপনারা সাদা চামড়া’র শিক্ষক নিয়োগ দিবেন আর ওরা সব ভালো ভাবে কাজ করবে?

না, ওই সাদা চামড়া’র মানুষ’রা যখন দেখবে ওখানে কাজ না করে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ানো যায়, কেউ কিছু বলে না; তখন ওরাও তাই করবে!

ইংরেজ’রা আমাদের দেশে গিয়ে কি মানুষ হত্যা করেনি? এমন কোন খারাপ কাজ নেই, যেটা এরা করেনি।

আমেরিকান’রা কি আফগানিস্তানে গিয়ে ওদের নারীদের ধর্ষণ করেনি?

সাদা চামড়া’র মানুষ’রা কি সিরিয়া-ইয়েমেনে মানুষ হত্যা করছে না?

এই কাজ কি ওরা নিজ দেশে করতে পারবে?

কখনো’ই পারবে না। কারন ওদের দেশে আইন আছে, আদালত আছে, নিয়ম আছে এবং নিয়মের কঠোর প্রয়োগ আছে। যার কারনে কারো পক্ষে’ই এইসব করা সম্ভব না।

এই আমরা বাদামী চামড়া’র মানুষ’রা কি বিদেশে এসে নিয়ম মেনে চলছি না?

ইচ্ছে না হলেও চলতে হচ্ছে। নইলে যে রক্ষা নেই।

গতকাল থেকে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি’র একটা ভিডিও ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

লোকজন এই ভিসি’র ক্রমাগত সমালোচনা করে বেড়াচ্ছে ওই ভিডিও দেখে।

তো, এই ভিসি’র দোষ’টা কি?

দোষ হচ্ছে তিনি কোন এক অনুষ্ঠানে গিয়ে হালকা নাচানাচি করেছেন।

এই দেশে কি নাচানাচি করা মানা? কেউ একজন কোন অনুষ্ঠানে গিয়ে নাচলে সেটা নিয়েও আপনাদের সমালোচনা করতে হবে?

এই ভিসি’কে নিয়ে তো আরও হাজার’টা সমালোচনা করা যায়। এই আমি নিজেই তো উনাকে নিয়ে পত্রিকায় লিখেছি।

ভদ্রলোক মাসের বেশিরভাগ সময় ঢাকায় পড়ে থাকেন, কাজে যান না, অথচ টক’শো করে বেড়ান ইত্যাদি।

এইসব নিয়ে সমালোচনা করেন। তিনি কোন অনুষ্ঠানে গিয়ে নাচছেন, এটা নিয়ে সমালোচনা করতে হচ্ছে কেন? এটা তো তার ব্যক্তিগত ব্যাপার।

আমি সেবার যখন নেদারল্যান্ডসে পিএচডি করতে গেলাম, আমার ৬০ বছর বয়স্ক প্রোফেসর তো আমাকে প্রথম দিন’ই বারে নিয়ে গিয়েছিল। ওকানে সে খানিক নেচেওছিল!

বলছিলাম আমি একজনকে ভালোবাসি সেই কথা।

গভীর ভালোবাসা। মনে হয় নিজের প্রাণে’র চাইতেও বেশি ভালোবাসি।

আমি যাকে ভালোবাসি সে আমার ছাত্র। ধরুন আমার চাইতে তার বয়েসের ব্যবধান ১৫ বছর কম! ধরুন সে আমাকে ভালোবাসে না কিংবা আমাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। আমি অবশ্য তাকে ছাত্র’ই মনে করি না। এখন সে আমাকে শিক্ষক মনে করে কি করে না, সেটা তার ব্যাপার! আমি তো এরপরও তাকে’ই ভালোবাসি। এটা তো একান্ত’ই আমার ভালোবাসার জায়গা।

নাকি এমন কোন নিয়ম আছে- ছাত্রকে ভালোবাসা যাবে না? কিংবা ভালোবাসা না পেলে ভালোবাসা যাবে না?

এই নিয়ে কি অন্য কারো কথা বলার দরকার আছে?

এখন সে কি আদৌ আমার কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন আলাদা সুবিধা পাবে?

এই জীবনে’ও সেটা সম্ভব না। আমি নিজে’ই সেটা করবো না। কিন্তু ধরুন আমি করতে চাইলাম। এতেও কোন ফায়দা নেই। সিস্টেম’টাই এমন- আপনি চাইলেও কিছু করতে পারবেন না।

তার যদি ফেল করার থাকে, সে ফেল করবে- এক বার করবে, দুই বার করবে, আজীবন করতে’ই থাকবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- আমার ভালোবাসা-বাসি নিয়ে তো আলোচনা করার দরকার নেই।

আলোচনা করতে হবে সিস্টেম নিয়ে। ঠিক ভাবে কাজ করছি কিনা কিংবা দায়িত্ব পালন করছি কিনা।

আমাদের সমস্যা হচ্ছে- আমাদের নজর সব ব্যাপারে’ই ভিন্ন কিছুতে থাকে!

দেশের পড়াশুনা’র মান প্রায় শূন্যের লেভেলে নেমে গিয়েছে। শিক্ষক’রা ছাত্রদের মানুষ’ই মনে করছে না। কারন এরা শিক্ষক হচ্ছে- হয় ১৮ লাখ টাকা দিয়ে, নয়ত একে-ওকে ধরে অথবা রাজনীতি করে। এরা শিক্ষা তো দিচ্ছে’ই না; উল্টো নিয়োগ বাণিজ্য করে বেড়াচ্ছে কিংবা টেলিভিশনে গিয়ে নিজেদের চেহারা দেখিয়ে বেড়াচ্ছে!

আর একদল মানুষ কিনা ব্যক্তি মানুষ, কে কোথায় নেচে বেড়াচ্ছে সেই নিয়ে সমালোচনা করে বেড়াচ্ছে। যেখানে সমালোচনা করার আরও হাজার’টা বিষয় আছে।

আর নীতি নির্ধারক’রা তো ভাবছেন সিস্টেম পরিবর্তন না করে’ই বিদেশ থেকে সাদা চামড়ার শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শিক্ষা’র মান বাড়িয়ে দিবেন!

আপনাদের কিছু’ই করতে হবে না। নিজেদের মানসিকতা টুকু আগে পরিবর্তন করুন। উন্নত মানসিকতা ধারণ করুন। যখন মানসিকতা টুকু পরিবর্তন করতে পারবেন, এরপর স্রেফ সিস্টেম টুকু বদলে ফেলুন। বাদ বাকী সব এমনিতে’ই ঠিক হয়ে যাবে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button