সিনেমা হলের গলি

আয়ুশমান খুরানা ও তার ‘ড্রিম রান’

গত তিন বছরে ছয়টা সিনেমা করেছেন আয়ুশমান, সবগুলো বক্স অফিসে সুপারহিট। এবছর মুক্তি পাওয়া আর্টিকেল ফিফটিন ক্লিন হিট হয়েছে, গত শুক্রবারে মুক্তি পেয়েছে ড্রিম গার্ল- সেটা তো মোটামুটি ঝড় তুলেছে বক্স অফিসে। প্রথম ছয়দিনে শুধু ভারত থেকে ড্রিম গার্লের আয় ৬৬ কোটি রূপি! মুক্তির মাত্র তিনদিনের মাথায় বাজেট পেরিয়ে লাভের মুখ দেখে ফেলেছে সিনেমাটা। শুভমঙ্গল সাবধান, বরেলি কি বরফি, আন্ধাধুন, বাঁধাই হো-র পরে আর্টিকেল ফিফটিন এবং ড্রিম গার্ল- আয়ুশমান খুরানার ড্রিম রান চলছে সজোরে। তাকে থামানোর কোন উপায় নেই, অবশ্য কন্টেন্ট যার সিনেমার মূল অস্ত্র, তাকে কি আর থামানো সম্ভব?

গত বছর বাধাই হো’ নামের সিনেমাটার বেলাতেও একই ঘটনা ঘটেছিল। মুক্তির পরে প্রথম চারদিনেই ‘বাধাই হো’ ভারতের বাজার থেকে আয় করে নিয়েছিল ৪৪ কোটি রূপি! বাজেট মাত্র ২৫ কোটি হওয়ায় চারদিনেই হিট ডিক্লেয়ার করা হয়েছিল সেটাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, চারদিনের মাথায় বাধাই হো-কে যখন হিট ঘোষণা করা হলো, তখনও আয়ুশমানের আগের সিনেমা আন্ধাধুন অনেকগুলো হলে চলছে! দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পরপর দুটো হিট, দর্শকের ভালোবাসা, সেইসঙ্গে সমালোচকদের প্রশংসা, আয়ুশমান খুরানার একাদশে বৃহস্পতি ২০১৮ সালে ছিল তুঙ্গে!

তবে হ্যাঁ, এটাকে মুফতে পাওয়া বলা যাবে না কোনভাবেই। হুট করে ক্লিক করে গেছে, কিংবা ঝড়ে বক মরেছে, এই টাইপের কোন কিছুই ঘটেনি আয়ুশমানের এই সিনেমাগুলোর বেলায়। আয়ুশমানও হঠাৎ করেই ভালো অভিনয় করে ফেলেননি আজ। শুরু থেকেই স্ক্রীপ্ট চয়েজ আর সিনেমা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দারুণ মুন্সীয়ানার পরিচয় দিয়ে আসছেন তিনি। আর জোড়া সাফল্যটাও তার জন্যে নতুন কিছু নয়, গত দুই বছর ধরেই এই কাজটা করে চলেছেন তিনি।

অভিনেতা হবার কথা ছিল না কখনও। অমৃতসরের সাদাসিধে এক কিশোর পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পরেই প্রথম অভিনয়ের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। পাঁচ বছর থিয়েটার করেছেন সিরিয়াসলি, ভাগ্যে শিকে ছেঁড়েনি তখন। ইংরেজী সাহিত্য আর কমিউনিকেশন স্টাডিজের ওপরে অনার্স-মাস্টার্স করা ছিল, সেই ডিগ্রিগুলো বেচেই জীবন চলে যাবে, ধরে নিয়েছিলেন এমনটা।

গানের গলা ভালো ছিল, জনপ্রিয় গানগুলো নিজের মতো করে গেয়ে শোনাতেন বন্ধুদের আড্ডায়। আয়ুশমান নিজেই বলেছেন, তিনি শিল্পী হতে চেয়েছিলেন সবসময়। অথচ ভাগ্যের খেল দেখুন, অভিনেতা আয়ুশমানের আড়ালে গায়ক আয়ুশমান মোটামুটি ঢাকাই পড়ে গিয়েছেন! গায়ক আয়ুশমান ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন, উপস্থাপক আয়ুশমানকেও লোকে পছন্দ করেছে, কিন্ত অভিনেতা আয়ুশমান? এই ভার্সনটাই সবার প্রিয়।

আয়ুশমানের ক্যারিয়ারের একদম শুরু থেকে খেয়াল করলে অদ্ভুত একটা জিনিস চোখে পড়বে। সিনেমার গল্পগুলো একটার সঙ্গে অন্যটার কোন মিলই নেই কোথাও। ‘ভিকি ডোনারে’র পরে ‘বেওকুফিয়ান’, ‘দম লাগা কে হাইশা’ কিংবা ‘মেরি পেয়ারি বিন্দু’, তারপরে ‘শুভমঙ্গল সাবধান’ আর ‘বরেলি কি বরফি’ এবং সবশেষ ‘আন্ধাধুন’ আর ‘বাধাই হো’; কিংবা ক’দিন পরেই মুক্তি পেতে যাওয়া ‘আর্টিকেল ফিফটিন’- প্রতিবার নিজেকে ভেঙেছেন আয়ুশমান।

সত্যি ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত আর্টিকল ফিফটিনে তিনি পুলিশ অফিসার হয়ে এসেছেন, সিংহাম বা চুলবুল পাণ্ডে টাইপের ডাকসাইটে পুলিশ নয়, হাজারটা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে একটু একটু করে লড়ে যাওয়া দায়িত্ববান একজন পুলিশ অফিসারের রোলে অভিনয় করছেন তিনি, যার কাছে রিভলভার নয়, ভারতের সংবিধানটাই মূল অস্ত্র। যেখানে হিরোইজম নেই, নায়ক যেখানে উড়াধুড়া টাইপের সুপারহিরো হতে পারেন না, যেখানে বুলেটের চেয়ে বুদ্ধির জোরটা বেশি খাটাতে হয়- সেরকম সাদামাটা একটা ক্যারেক্টার।

প্রতিবার তিনি বেছে নিয়েছেন গল্পনির্ভর সিনেমাকে। ভিকি ডোনারের তুমুল সাফল্যের পরে অনেককিছুই করতে পারতেন তিনি, সিনেমার অফার তো শত শত পেয়েছেন। কিন্ত আয়ুশমান স্রোতে গা ভাসাননি, ধরে রেখেছেন নিজেকে। কাজ কম করবেন, কিন্ত করবেন মনের মতো করে। সেজন্যেই ছয় বছরের ক্যারিয়ারে মনে রাখার মতো অনেকগুলো সিনেমা যোগ হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। ভিকি ডোনারকে মুফতে পাওয়া ধরে নিয়েও বলা যায়, এমন ফিল্মোগ্রাফি যেকোন অভিনেতার জন্যেই ঈর্ষণীয় ব্যাপার! দুই বছরের মধ্যে শুভমঙ্গল সাবধান, বরেলি কি বরফি, আন্ধাধুন, বাধাই হো, আর্টিকেল ফিফটিন কিংবা ড্রিম গার্লের মতো সিনেমা ঝুলিতে জমা পড়াটা তো চাট্টেখানি কথা নয়!

সহজাত অভিনয়টা তার সঙ্গী। চেহারা ভালো, কিন্ত সেখানে দারুণ হিরোইজম লুকিয়ে নেই। যে চরিত্রগুলো তিনি করেন, সেগুলোও নায়কসুলভ নয়, মানে প্রচলিত অর্থে নায়ক বলতে আমরা যেরকমটা বুঝি, তেমনটা তো নয়ই। সেই চরিত্রগুলোকেই তিনি অসাধারণ করে তোলেন অভিনয়ের প্রতিভায়। পর্দায় দেখা মানুষটাকে তখন আর দূরের কেউ বলে মনে হয় না, বরং তাকে ফেলা যায় আমজনতার কাতারেই। চরিত্রের ভেতরে তিনি যেভাবে ঢুকে যেতে পারেন সহজে, ঠিক সেভাবেই ঢুকে যান দর্শকের মনের ভেতরেও।

বলিউডের এই বিশাল আঙিনায় আয়ুশমান পুরোপুরি আউটসাইডার একজন। বাবা-চাচা বা গডফাদার টাইপের কেউ ছিলেন না এখানে। পরিবারের মধ্যে সিনেমায় কেউ কখনও নাম লেখাননি। অমৃতসরের মতো ছোট একটা শহর থেকে উঠে আসা আয়ুশমান জানতেন, এই জায়গাটা চোরাবালিতে ভরা, এখানে টিকে থাকতে হলে কাজ দিয়েই থাকতে হবে। আয়ুশমান তাই শুরু থেকেই স্ক্রীপ্ট বাছাইয়ের ক্ষেত্রে প্রচণ্ড সতর্ক থেকেছেন। সেটার পুরস্কারও হাতেনাতেই পাচ্ছেন তিনি। গত বছরে খানদের সিনেমাও যখন এক সপ্তাহের মাথায় সিনেমা হল থেকে নেমে গেছে, সেখানে আয়ুশমানের আন্ধাধুন টানা আড়াই মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রদর্শিত হয়েছে! আয়ুশমান মানেই এখন হিট মেশিন, কারণ গল্পের কদরটা বলিউডে এই মূহুর্তে তার মতো করে আর কেউ করেন না।

একটা সময় ব্লগ লিখতেন তিনি, সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি- সবকিছু নিয়েই অগাধ জ্ঞান তার, সেই জ্ঞানটাই হয়তো তাকে সাহায্য করেছে ‘ভালো’ আর ‘কম ভালো’র মধ্যে পার্থক্যটা বজায় রাখতে। স্ক্রীনটাইম নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই কোন, চরিত্রটা অন্ধ নাকি বোবা, সেটাও তার মাথায় থাকে না একদমই। তিনি শুধু গল্পের সঙ্গে চরিত্রের সামঞ্জস্যতা খোঁজেন হন্যে হয়েই, যে গল্পটা তাকে শোনানো হচ্ছে, সেটাকে বিশ্বাসযোগ্য মনে হলেই পা বাড়ান সামনের দিকে।

২০১২-১৩ সালে ভালো গল্পের অনেক সিনেমাও মার খাচ্ছিল, বলিউডের দর্শক তখনও কন্টেন্ট জিনিসটাকে সেভাবে গ্রহণ করেনি, ২০১৮-তে এসে যেভাবে করেছে। আয়ুশমান তখন হাল ছাড়েননি, নিজের রাস্তা থেকে সরে যাননি, লাইন বদলে উদ্ভট গল্পের সিনেমায় নাম লেখানোর কথাও ভাবেননি। ‘বেওকুফিয়ান’ বা ‘মেরি পেয়ারি বিন্দু’র মতো সিনেমাগুলো খুব একটা ভালো করতে পারেনি বক্স অফিসে, তাতে দমে যাননি তিনি। সেই হাল না ছাড়া মানসিকতার পুরস্কারটা আয়ুশমান পাচ্ছেন এখন।

আর হ্যাঁ, ঝুঁকি নেয়ার প্রবণতাটাও এগিয়ে রেখেছে আয়ুশমানকে। বাধাই হো সিনেমার কথাই ধরুন না। অমিত রবীন্দরনাথ নামের আনকোরা এক পরিচালক সিনেমা বানাবেন বলে ঘুরছিলেন দ্বারে দ্বারে। অভিনেতা হিসেবে বেশ কয়েকজনের কথাই ভেবেছিলেন, তার স্ক্রীপটটা পছন্দ হয়নি অনেকের, না করে দিয়েছেন তারা। বেচারা রবীন্দরনাথ আয়ুশমানের কাছেও গিয়েছিলেন আরেকবার হতাশ হবার মানসিকতা নিয়েই।

কিন্ত ভালো গল্পের কদরটা বলিউডে আয়ুশমানের থেকে ভালো খুব বেশি লোকে বোঝেন না, গল্পটা শুনে নিজের চরিত্রের গভীরতা কতটুকু, নায়িকার সঙ্গে প্রেমের সুযোগ কতটা পাওয়া যাবে সিনেমায়, এসব না ভেবেই রাজী হয়ে গিয়েছেন আয়ুশমান। তার বিশ্বাস ছিল, সিনেমাটা ‘ক্লিক’ করবে, করে গেছে। একজন অভিনেতার জন্যে এই ট্যালেন্টটা থাকাও যে খুব দরকার। সেটা আয়ুশমানের আছে বলেই টানা ছয়টা হিট ফিল্ম এখন তার নামের পাশে! আয়ুশমানের এই স্বপ্নের দৌড়টা খুব দ্রুত শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না। আয়ুশমান জ্বলছেন আপন তেজে, বলিউডের আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাদের একজন তো এখন তিনিই!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button