অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

স্বপ্ন কী? এর মেকানিজম কী? স্বপ্ন কি সত্যি হয়?

কেউ কেউ স্বপ্ন বানাতে পারে। শুয়ে চোখ বন্ধ করে একটা চমৎকার মুহূর্ত ভাবতে শুরু করল। এরপর একটু একটু করে ঘুমিয়ে যাচ্ছে কিন্তু স্বপ্নটা হাতছাড়া হচ্ছে না। একটা সময় মানুষ গভীর ঘুমে চলে গেছে কিন্তু স্বপ্নের নাটাইটা এখনো তার হাতে। তবে জাগরণে যে স্বপ্নটা সে ইচ্ছামত ঘুড়িরমত উড়াতে পারত, এখন পারবে না। কারণ চেতন মস্তিষ্ক (conscious mind ) দায়িত্ব ছেড়ে দিবে। ড্রাইভিং সিটে চলে আসবে অবচেতন মস্তিষ্ক (subconscious mind)। এখানে যেকোন কিছু ঘটে যেতে পারে। সুখের মুহুর্তে শিঙওয়ালা দানব আসতে পারে, ঘাসে হাঁটাহাঁটি করার সময় সাপ আসতে পারে, প্রেমিকার হাত ধরা অবস্থায় তার বাবা আসতে পারে।

মাঝেমাঝে স্বপ্নের মাঝে ঘুমন্ত ব্যক্তি ধরে ফেলতে পারে- সে স্বপ্ন দেখছে। ফলে সে নিজের মত স্বপ্নকে পরিবর্তিত করা শুরু করে। শিঙওয়ালা দানবের সামনে সাহস করে দাঁড়িয়ে যায়। ঘাসের সাপটাকে পিষে মেরে ফেলে। প্রেমিকার বাবাকে স্বপ্ন থেকে মিশিয়ে দেয় কিংবা প্রেমিকা নিয়ে বাবার চোখের আড়ালে চলে যায়।

চাইলেই নদীতে নোকা না থাকলেও উড়ে চলে যায়। যে মেয়েটিকে কখনো ভালোবাসি বলেতে পারেনি, তার সামনে গিয়ে হড়বড় করে মনের কথা খুলে বলে। ভালগার পর্যায়ে চলে গেলে- যে বিবাহিত নারীর প্রতি আকর্ষণ আছে, তার কাছে গিয়ে নানাপ্রকার ভয়ানক কাজও করে ফেলতে পারে।

স্বপ্নকে বলা হয়- ত্রিমিলন।

আপনার চিন্তা (Thoughts), স্বচক্ষে দেখা অভিজ্ঞতা (Visual experiences) , অনুভূতি (Sensation) এই তিনটির এক মিশ্র রূপ!

স্বপ্ন দেখার প্রথম শর্ত চোখ বন্ধ করা। চোখ খোলা থাকায় স্বপ্ন দেখলে (কোনকিছু দেখতে পাওয়া, শুনতে পাওয়া কিংবা এমনকিছুর গন্ধ পাওয়া যার অস্তিত্ব সেখানে নেই) সেটাকে হ্যালুসিনেশন (Hallucination) বলা হয়। কেউ যদি খোলা চোখের স্বপ্নকে নিয়মিত অনুসরণ করে, মেনে নেয় তাকে স্কিজোফ্রেনিক (Schizophrenic) হিশেবে ডায়াগনোসিস করা হয়।

চোখ বন্ধের পর আপনি যদি ঘুমিয়ে যান, আকস্মিক আপনার মস্তিষ্ক জেগে যেতে পারে। মস্তিষ্ক সক্রিয় হয়ে যায়। সম্পুর্ণ সক্রিয় অবস্থাকে বলা হয়- ঘুমের র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট পর্যায় (REM stage of Sleep). এসময় স্বপ্ন দেখার সাথেসাথে চোখের গোলক কাঁপাকাঁপি করে। মস্তিষ্ক পুরোপুরি সক্রিয় থাকায় এই স্বপ্নকে আমরা ঘুম থেকে জাগার পর স্মরণ করতে পারি।

ঘুমের অন্য পর্যায়গুলোতেও আমরা স্বপ্ন দেখতে পারি। তবে সেগুলো ছাড়াছাড়া, গুরুত্বহীন, আকস্মিক। স্মরণ নাও থাকতে পারে। আবার সেসব স্বপ্ন হতে পারে ভয়ংকর। স্বপ্ন শুরু করার সাথেসাথেই আপনি লাফ দিয়ে জেগেও যেতে পারেন।

যদি কেউ স্বপ্নের সাথে হাঁটাহাঁটি করে, ফুটবল ভেবে সঙ্গীকে লাথি মারে, খাটের উপর দাঁড়িয়ে রকস্টারের মত গান গায়, হাঁটাহাঁটি করে (Sleepwalking disorder) সেটকে মিশ্র নামে ডাকা হয়। REM with Theta Activity.

কতক্ষণ স্বপ্ন দেখেন বলে আপনার ধারণা? স্বপ্ন ১ সেকেন্ড হতে পারে। এক মিনিট হতে পারে। ২০ কিংবা ত্রিশ মিনিটও হতে পারে। মাঝেমাঝে জেগে উঠে আপনি দেখলেন ঘেমে একাকার। আপনার ধারণা হল- সারারাত স্বপ্ন দেখেছেন। আপনার ধারণা ভুল। হতেও পারে, মাত্র দশ সেকেন্ডে আপনি দশ বছর সময়কালের স্বপ্নের ক্ষেত্র ঘুরে এসেছেন।

স্বপ্নের উপর অলৌকিকত্ব আছে?
না। কোন অলৌকিকত্ব নেই। পুরোটাই বেশ লৌকিক ও খুব সাধারণ মেকানিজমের উপর গড়ে উঠেছে।

ধরুন, আপনার মেয়ে স্কুল থেকে আজ একা আসবে। আপনি অফিসে চোখ খুলে ভাবছেন- আপনার মেয়েটা রাস্তায় আছে। মেয়েটা নিশ্চয় একা আসতে পারবে না। হয়তো কেউ তাকে টিজ করছে। এরপর আপনি কয়েকজন মানুষের কথা স্মরণ করতে পারছেন। আগেরদিন ঐ রাস্তায় তারা দাঁড়িয়ে ছিল। আপনি ভাবছেন- সেই ছেলেগুলো মেয়েটাকে টিজ করছে। অথবা মেয়েটা তো রাস্তা পার হবে। কোন বাইকার তাকে ধাক্কা দিচ্ছে। এত দেরি কেন হচ্ছে। সে কী হাসপাতালে? এরপর আপনি হাসপাতালের কথা ভাববেন। কাছাকাছি যে হাসপাতাল সেটার ছবি ভেসে আসবে আপনার মাথায়। এরপর আরো অনেক কিছু।

খেয়াল করুন- আপনি কিন্তু কখনোই ভাববেন না- ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত কেউ এসে মেয়েকে টিজ করছে। কারণ আপনি জানেন ট্রাম্প আমেরিকায় থাকে সে এখানে আসতে পারবে না। কিংবা আপনি ভাবতে পারবেন না, আপনার মেয়ে প্লেন ক্রাশ করেছে। কারণ আপনি জানেন, আপনার মেয়ে স্কুল থেকে দশ টাকায় রিক্সাতেও আসতে পারে। এতটুকু রাস্তা আসতে নিশ্চয় দুটো রানওয়ে আর একটা প্লেন সার্ভিস নেই। অথবা আপনি চাইলেও ভাবতে পারবেন না- মেয়েটা ট্রেনে কাঁটা পড়তে পারে। কারন স্কুলের রাস্তার আশেপাশে একশ কিলোমিটারের মধ্যেও কোন ট্রেন স্টেশন নেই।

এবার ভাবুন-আপনি স্ট্রেসে আছেন। আপনার মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে পারেননি। তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছেন। এবার কী দেখবেন?

দেখবেন রাস্তায় আপনার মেয়েকে বখাটেরা উত্যক্ত করছে। বখাটের ছেলেটা ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা রবিউল ইসলাম নামের আপনার পুরাতন কোন বন্ধু। যে মেয়েদের উত্যক্ত করত। যেহেতু ঘুমিয়ে গেলেও আপনার মস্তিষ্কের উপর খানিক নিয়ন্ত্রণ আছে (কারণ চিন্তাটা মাথায় নিয়েই আপনি ধীরেধীরে ঘুমিয়ে পড়েছেন), আবার খানিকটা নিয়ন্ত্রনহীন। আপনি পত্রিকায় ট্রাম্পের নিউজ পড়েছেন তাই বখাটের জায়গায় ট্রাম্প। আপনার অনিয়ন্ত্রিত মস্তিষ্ক ইচ্ছেমত আপনার স্বপ্নকে পরিবর্তিত করছে। তবে পুরোটা পারছে না। কারণ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতেও। দেখছেন-আপনার মেয়ে ট্রেনে কাঁটা পড়েছে। দূর্ঘটনার অংশটুকু আপনার নিয়ন্ত্রিত মস্তিষ্ক সাজিয়েছে কিন্তু মোটর সাইকেলের জায়গায় এনেছে ট্রেন। কারণ আপনি সেদিন কিংবা গতকাল কিংবা অনেক আগে ট্রেনে কোন মেয়ে কাঁটা পড়েছে, সেই খবর পড়েছেন। আপনার মস্তিষ্ক সেই স্মৃতিটাকে আপনার অগোচরে সাজিয়ে রেখেছে। আপনি যখন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছেন, আপনার মস্তিষ্ক সেই স্মৃতিকে তুলে এনেছে। কারণ স্মৃতিটা ভয়ের। এবং এক্সিডেন্টের সাথে মিলে যায়। আজ ভয় আর এক্সিডেন্টের জন্য স্ট্রেসে থাকায় সেই স্মৃতিটা উঠে এসেছে।

আপনি তখন স্বপ্নে হাসপাতাল দেখতে পাবেন। দেখবেন নার্সরা আপনার মেয়েকে ফেলে রেখেছে। ডাক্তার পাশের রোগীকে দেখছে কিন্তু আপনার মেয়ে মারা যাচ্ছে। ভুলেও খেয়াল করছে না। দুনিয়ার সবকিছুই ঘটতে পারে আপনার স্বপ্নে।

যা কোনোদিন দেখেননি সেটা স্বপ্নে আসে কীভাবে?
কোনোকিছুই শূন্য থেকে আসে না। আপনার মস্তিষ্কের নিউরনের অলগলিতে শত সহস্র স্মৃতি আছে। আপনার মস্তিষ্ক সেগুলো এক করে একটা নতুন কিছু দাঁড় করায়। আজ থেকে একশ বছর আগে ইট ছিল। কিন্তু সংসদ ভবন ছিল না। এত চমৎকার একটা স্থাপনা কী কেউ দেখেছিল? কেউ ভেবেছিল?

দেখেনি। ভাবেনি।

সেই একই ইট দিয়ে একজন শিল্পীর মস্তিষ্ক জোড়াতালি দিয়ে সম্পুর্ণ ইউনিক, নতুন একটা স্থাপনা তৈরি করেছে যেটা এর আগে কেউ দেখেনি। কেউ ভাবেনি। যে ইটে পাঁচশ বছর আগে পুরাতন দালানগুলো তৈরি হত, সেই একই ইটেই আজকের সবচাইতে সুরম্য অট্টালিকাটিও তৈরি হচ্ছে। পার্থক্য হচ্ছে ভাবনায়।

তেমনই আপনি জীবনে যা কিছু দেখেছেন, যা কিছুর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, সবকিছুই জোড়াতালি দিয়ে অদ্ভুত একটা জিনিস হয়তো দেখতে পাবেন। আপনার ধারণা এমন জিনিস কখনো দেখেননি, কিন্তু আপনি জানেন না, এই জিনিস আপনার অবচেতন মনই তৈরি করেছে। পুরো ব্যাপারটি আপনার অনুমতি নিয়েই বানানো হয়েছে।

আপনি কখনোই একটা নতুন জিনিস স্বপ্নে আনতে পারবেন না। দেখবেন না। যে দানবটা আপনি কখনো দেখেননি সেটারও দেখবেন চোখ আছে। কারণ আপনার দেখা পৃথিবীর সকল প্রাণিতে চোখ আছে। দেখবেন, সেটার ডানা আছে কিংবা বিশটা পা আছে। কারণ আপনার দেখা অনেক প্রাণী আছে যেগুলোর ডানা আছে, অনেক পা আছে। আপনার মস্তিষ্ক সবগুলো স্মৃতিকে কেঁটেকেঁটে জোড়া লাগিয়ে জগাখিচুড়ি বানিয়ে একটা নতুন জিনিস আপনার সামনে উপস্থাপন করেছে। জিনিসটা নতুন নয়, কম্বিনেশনটা নতুন। একই ইট শুধু ভিন্ন গড়নের দুটো দালানের মত।

মাঝেমাঝে মন হয়- একটা জায়গায় আগে কখনো আসেননি, সেখানে গিয়ে মনে হচ্ছে আগেও এসেছিলেন?
কাউকে দেখে মনে হচ্ছে আগেও দেখেছেন? [এ বিষয়ে জানার আগ্রহ থাকলে কমেন্টে জানাবেন]

স্বপ্নের তাবীর বা ব্যাখ্যা নিয়ে নানান ধরণের জ্যোতিষ ব্যবসাটা বেশ ইন্টারেস্টি। আপনি নিজেই যে ব্যাখ্যা দিতে পারবেন, সেটার জন্য কারো কাছে যাবার আদৌ প্রয়োজন নেই। ব্যাখ্যা খুবই সিম্পল। জ্যোতিষীরা আপনার সাইকোলজিকে ব্যবহার করে। আপনার চোখের দিকে তাকিয়ে, আপনার সাথে কথা বলে সবগুলোকে গণিতের মত প্রসেসিং করে একটা আউটপুট আঁকারে জানিয়ে দেয়।

একজন সাইকিয়াট্রিস্ট কিংবা সাইকোলজিস্ট কিংবা অভিজ্ঞ জ্যোতিষী অনেক কিছুই বুঝতে পারে। যেটা স্বাভাবিক চিন্তায় আপনার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু এসব ঘটে। এগুলো লজিক ও বিজ্ঞান। [এ বিষয়ে পোস্ট লেখা শুরু হবে চ্যালেঞ্জের ১৫০ দিন পার হবার পর]

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button