সিনেমা হলের গলি

আমাদের এখন প্রয়োজন ডাক্তার অশোকের মতো অসংখ্য গণশত্রুর!

সত্যজিৎ রায়ের অসংখ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘গণশত্রু’ চলচ্চিত্রটি আমার কাছে আলাদা ভাবে ভালো লাগে। হেনরিক ইবসেনের ‘এন এনিমি অফ দি পিপল’ এর কাহিনীকে ভারতের একটি শহরের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি শেষ পর্যন্ত দর্শকের উত্তেজনা ধরে রাখতে সক্ষম। সাধারণ একটি কাহিনী, মগজে ধাক্কা দেয়া কিছু সংলাপ, রূপকের ব্যবহার আর সরল উপস্থাপনা কখন যে দু ঘন্টা সময় নিয়ে চলে যায়, সেটা বুঝতেই পারা যায় না৷

ধর্মের মধ্যে বিভিন্ন কুসংস্কার আর সেই কুসংস্কারকে পুঁজি করে একটি শ্রেণীর ব্যবসা সমাজকে বরাবরই পিছনের দিকে ঠেলে দেয়৷ ঠেলে দেয় বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে। ব্যবসায়ী শ্রেণীটি এই বিপদের উপস্থিতি জেনেও লাভের স্বার্থে একে অগ্রাহ্য করে। শুধু তাই নয়, সত্য যেন কোন ভাবে সামনে না আসে, সেটি নিশ্চিত করতে নানা ভাবে জনগণকে উত্তেজিত করে, সত্য প্রকাশকারীর কণ্ঠ রুদ্ধ করতে সচেষ্ট থাকে যে কোন মূল্যে৷ সত্য প্রকাশকারীই শেষ অবধি গণশত্রু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়৷

‘গণশত্রু’ চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র ডাক্তার অশোক গুপ্ত আবিষ্কার করেন শহরে নতুন ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের মূল উৎস হচ্ছে শহরের সব থেকে জনাকীর্ণ একটি স্থান। সেখানে নির্মিত মন্দিরটিতে চরণামৃত হিসেবে যে জল ব্যবহার করা হচ্ছে সেই জলেই রয়েছে বিভিন্ন রোগের জীবাণু। এখন রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার আগেই এখানে সংস্কার কাজ করতে হবে। যতদিন সংস্কার না হবে ততদিন চরণামৃত পান থেকে বিরত থাকতে হবে, মন্দির বন্ধ রাখতে হবে। ডক্টর অশোক ল্যাব পরীক্ষার রিপোর্ট সহ এই তথ্য প্রকাশ করতে চাইলে বাধাপ্রাপ্ত হন৷

মন্দির এবং শহরের কর্তৃপক্ষ, যার চেয়ারম্যান কিনা ডক্টর অশোকেরই ভাই- এরা যেভাবে তাকে এই তথ্য প্রকাশে বাধা দিতে থাকে সেই চিত্র আমাদের কাছে অপরিচিত নয়৷ ডক্টর অশোকের মূল চিন্তা ছিল স্বাস্থ্য নিয়ে, এখানে ধর্মীয় আচার মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয় কিন্তু বাধাদানকারীরা চরণামৃতে জীবাণু থাকতে পারে না, তুলসি পাতায় জলের দোষ কেটে যায় ইত্যাদি হাস্যকর কথা প্রচার করতে থাকে৷ ডক্টর অশোককে ঘায়েল করার জন্য তাকে প্রশ্ন করা হয়, সে গত দশ বছরে মন্দিরে গিয়েছে কি না? সে নিজেকে হিন্দু মনে করে কি না? ডক্টর অশোককে নাস্তিক প্রমাণ করতে পারলেই যেন তার কথা মিথ্যে হয়ে যাবে।

ডক্টর অশোক ব্যক্তি জীবনে ধর্ম মানেন না। কিন্তু বক্তৃতায় তিনি বলেন, “কারো বিশ্বাসে আমি আঘাত দেব একথা আমি কস্মিনকালেও চিন্তা করিনি”। স্ত্রীর সাথে অন্তরঙ্গ আলাপের এক সময় তিনি স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন, “তোমার কখনো মন্দিরে যেতে ইচ্ছা করে না?” তার স্ত্রী উত্তর দেন, “তোমার আর আমার ইচ্ছার মধ্যে এখন আলাদা কিছু নেই।” ছোটবেলায় তিনিও শুনেছেন নানা অবৈজ্ঞানিক হাস্যকর রীতিনীতি কিন্তু তিনি বলছেন, “কিন্তু তখন তো আর বিজ্ঞান পড়া স্বামী ছিলো না!”

যে মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য তিনি কথা বলতে চাইলেন সেই সাধারণ মানুষ তিনি মন্দিরের বিরুদ্ধে বলছেন মনে করে তার বাড়িতে ভাঙচুর করে। তার এবং তার মেয়ের চাকরি চলে যায়। সিনেমার এ পর্যায়ে এসে দর্শকও পরাজয়ের যন্ত্রণা উপলব্ধি করতে পারবেন৷ কিন্তু এখানেই শেষ নয়। শেষ টুকু দেখতে হলে সিনেমাটা দেখে নিতে হবে, যারা দেখেননি। (ইউটিউবে পাওয়া যাবে)

একদম শেষ দৃশ্যটি আমার কাছে দারুণ লেগেছে৷ টেবিলে রাখা এক কৌটা জীবাণুবাহী চরণামৃত আর তার পাশেই একটা স্টেথোস্কোপ দিয়ে পরিচালক আমাদের বুঝিয়ে দেন বিজ্ঞানের সাহায্যে আমাদের ধর্মীয় কুসংস্কার আর অন্ধ বিশ্বাসকে পরাজিত করতে হবে। প্রয়োজন হলে আমাদের গণশত্রু হতে হবে, বলতে হবে অপ্রিয় কথা।

আমাদের এখন প্রয়োজন ডক্টর অশোকের মত অসংখ্য গণশত্রুর, যারা সব বাধা বিপত্তি হুমকি অগ্রাহ্য করে অপ্রিয় কথা বলবে অন্ধকার আর অপবিশ্বাসের বিরুদ্ধে। যারা কথা বলবে, লড়াই করবে সত্যিকার গণশত্রুদের বিরুদ্ধে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button