খেলা ও ধুলা

প্রথম আলোর ‘ঘরোয়া ক্রিকেট’ সংক্রান্ত জোরপূর্বক বিতর্ক ও একটি প্রতিবাদ

প্রথম আলো’র সংবাদ মারফত জানতে পারলাম, বিশ্বকাপে বাংলাদেশের স্কোয়াড কি হবে, সেটার মোটামুটি একটা ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। জাতীয় দলে গত এক বছর ধরে যারা খেলেছেন, তারাই যে বিশ্বকাপের দলে নির্বাচকদের ভাবনার করিডোরে থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক। বোর্ড প্রেসিডেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, তেমনটাই ঘটতে চলেছে। একই দিনে মাশরাফি বিন মুর্তজাও জানিয়েছেন, বিশ্বকাপের দলে চমক থাকার সম্ভাবনা নেই। এমনকি ঘরোয়া ক্রিকেটের পারফরম্যান্সটাকেও খুব বেশি আমলে নিচ্ছেন না ওয়ানডে অধিনায়ক। মাশরাফির ভাষ্য অনুযায়ী, ঘরোয়া ক্রিকেটের দুর্দান্ত পারফর্মারেরা বেশিরভাগ সময়ই নিজেদের পারফরম্যান্সটাকে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে অনূদিত করতে পারেন না।

সংবাদের ভেতরে ঢুকে মনে হলো না নাজমুল হাসান পাপন খুব ভুল কিছু বলেছেন। পনেরো জনের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে কারা থাকতে পারেন, সেটা নিয়ে মতভেদ হবার আশঙ্কা খুব একটা নেই। আবেগের বশে আশরাফুল বা নাসিরকে অনেকেই দলে চান, তাদের হিসেবটা আলাদা। এমনিতে জাতীয় দলের একাদশ সাজাতে গেলেও মোটামুটি ৭/৮টা নাম কমন থাকবেই। দুই-তিনটার বেশি পজিশন নিয়েই হয়তো নানা জনের নানা মত থাকবে।

আটে কেউ মিরাজকে চাইবেন, কেউবা সাইফ উদ্দিনকে। কেউ হয়তো নিজের একাদশে মিথুনকে রাখবেন, কেউ রাখবেন না। ইনিংসের উদ্বোধনে তামিমের সঙ্গী কে হবেন, সেটা নিয়েও নির্বাচকদের একটু ভাবতে হতে পারে, কারণ রঙিন জার্সিতে লিটন-সৌম্য কারো ব্যাটেই রানের ফোয়ারা নেই। এই বিষয়গুলো বোর্ড প্রেসিডেন্টও খোলাসা করে বলেছেন, সাত আর আট নম্বর পজিশন নিয়েই যে ভাবনাটা বেশি, সেটা ফুটে উঠেছে তার বক্তব্যে। কিন্ত বিশ্বকাপের প্লেনে কোন পনেরো জন উঠবেন, সেটা তো অনেকটাই নির্ধারিত।

পাপন মোটামুটি চৌদ্দ জনের নাম বলেই দিয়েছেন। পঞ্চ পাণ্ডব তো আছেনই, সেইসঙ্গে সৌম্য-লিটন-সাব্বির-মিরাজরা দলে জায়গা পেতে পারেন বলে জানিয়েছেন তিনি। পেস অ্যাটাকে মাশরাফিকে সঙ্গ দেবেন মুস্তাফিজ, তৃতীয় পেসার হিসেবে দলে থাকবেন রুবেল বা তাসকিনের কেউ। মোহাম্মদ মিথুনকে নিয়ে চৌদ্দ জন তো হয়েই গেল! এবং বাস্তবতা হচ্ছে, পাপন বা মাশরাফি মিডিয়ার সামনে দল নিয়ে কিছু না বললেও তো বিশ্বকাপের স্কোয়াডটা এমনটাই হবার কথা ছিল।

প্রথম আলো একটা সংবাদ প্রকাশ করেছে আজ, শিরোনাম হচ্ছে- ‘তবে ঘরোয়া ক্রিকেটের কী দরকার?’ ঢাকা লিগে দারুণ ফর্মে থাকার পরেও কয়েকজন খেলোয়াড়কে জাতীয় দলের জন্যে বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না, অন্যদিকে রান না পাওয়া অনেকেই বিশ্বকাপের বিমানে চড়বেন- এটাই ছিল এই লেখার মূলভাব। ঘরোয়া ক্রিকেটের পারফরম্যান্সকে যদি মূল্যায়ন করা না-ই হয়, তাহলে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে কি লাভ- প্রশ্নটা একেবারে অযৌক্তিক নয় অবশ্য।

কিন্ত ঘটনা হচ্ছে, বিশ্বকাপের স্কোয়াডে প্রত্যেকটা দলই নিজেদের সেরা খেলোয়াড়কে পাঠাতে চায়, সম্ভাব্য সেরা একাদশ নিয়ে মাঠে নামতে চায়। এর আগে পরীক্ষা-নীরিক্ষা হয়, অনেকেই করে, বেস্ট ইলেভেন খোঁজার জন্যে বিশ্বকাপের আগের বছরগুলোতে অনেককেই সুযোগ দেয়া হয়। সেখানে বাংলাদেশের জাতীয় দলে বর্তমানে যারা খেলছেন, বা সর্বশেষ ম্যাচগুলোতে যারা খেলেছেন, তাদের চেয়ে ‘বেটার অপশন’ কি আছেন কেউ?

আনামুল হক বিজয় ঢাকা প্রিমিয়ার লীগে টানা তিন ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছেন, দারুণ কৃতিত্ব এটা, সন্দেহ নেই। বোর্ড প্রেসিডেন্টও তার এই পারফরম্যান্সের কথা স্মরণ করেছেন। ঘরের মাঠে দ্বিপাক্ষিক কোন সিরিজ হলে বিজয় হয়তো রাডারের নিচেই থাকতেন, কিন্ত খেলাটা ইংল্যান্ডে, টুর্নামেন্টটা বিশ্বকাপ, সবচেয়ে বড় কথা, পনেরো জনের বেশি কাউকেই জায়গা দেয়া যাবে না- আর একারণেই ঝুঁকি নেয়ার সুযোগটা খুব বেশি পাচ্ছেন না নির্বাচকেরা। সৌম্য বা লিটনের চেয়ে বৃটিশ কণ্ডিশনে বিজয় কোনভাবেই বেশি ইফেক্টিভ হবেন না- এটা ক্রিকেট বোঝা মানুষজন স্বীকার করবেন নিশ্চয়ই।

একই কথা প্রযোজ্য ফরহাদ রেজা বা কামরুল ইসলাম রাব্বীদের বেলায়ও। এবারের প্রিমিয়ার লীগের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী বোলার ফরহাদ রেজা, কিন্ত তার সবশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচের স্মৃতিটার ওপরেও জমেছে ধুলোর পরত। বিশ্বকাপের মতো আসরে প্রতিটা ম্যাচই যেখানে হাইভোল্টেজ, সেখানে অনেকদিন ধরে জাতীয় দলের বাইরে থাকা কাউকে মাঠে নামিয়ে ভালো পারফরম্যান্স আশা করাটা বোকামি। তবুও অভিযোগটা মেনে নেয়া যেতো, যদি আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটের মানটা ঠিক থাকতো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে ঘরোয়া ক্রিকেটের মানের আকাশ-পাতাল তফাৎ, তাহলে কি করে বিশ্বকাপের মাস দুয়েক আগে প্রিমিয়ার লীগের পারফরম্যান্সকে আমলে নেয়া সম্ভব?

মাশরাফি যেটা বলেছেন, এর আগে অনেকেই জাতীয় লীগ বা ঢাকা লীগে ফাটাফাটি পারফর্ম করে জাতীয় দলে ঢুকেছে, কিন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রেশারটা তারা নিতে পারেননি। তুষার ইমরান থেকে শুরু করে শুভাগত হোম, কিংবা মোশাররফ রুবেল- অনেক নামই নেয়া যায়। তারা ঘরোয়াতে যেভাবে প্রভাব বিস্তার করে খেলেছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটটাকে সেভাবে স্মরণীয় করে রাখতে পারেননি। এখানে তাদের কোন দোষ নেই, ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানটাই তো ঠিক রাখতে পারেনি বিসিবি।

ঢাকা লীগে মিরপুর বা ফতুল্লার উইকেটে ক্লাবের বোলারদের টানা সেঞ্চুরী হাঁকালেই যে কোন ব্যাটসম্যান ওভাল বা লর্ডসে গিয়েও আন্তর্জাতিক মানের বোলারদের শাসন করতে পারবেন, এরকম কোন গ্যারান্টি তো নেই। সেখানকার কণ্ডিশন আলাদা, প্রতিদ্বন্দ্বিতাটাও বহুগুণ বেশি, সবচেয়ে বড় কথা, প্রতিপক্ষের বোলারেরা তো ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে খেলেন না, তারা অনেক বেশি পারদর্শী। এতসব বিষয় আমলে না নিয়ে হুট করে ‘ঘরোয়া ক্রিকেটের কি দরকার’ টাইপের একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়াটা বোকামি। আর এই বোকামিটা যখন দেশের সবচেয়ে বড় মিডিয়া হাউজের পক্ষ থেকে করা হয়, তখন হতাশাটা বাড়ে।

ঘরোয়া ক্রিকেটের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার হাজারটা অবকাশ আছে, বাজে আম্পায়ারিং বা ম্যাচ পাতানো নিয়ে প্রথম আলো আগে যেসব প্রতিবেদন করেছে, সেগুলো বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতার পথে মাইলফলক হয়ে আছে, থাকবে। কিন্ত বিশ্বকাপের দল ঘোষণা নিয়ে তারা যেভাবে বিষয়টাকে একপেশে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে, সেটা মেনে নেয়ার মতো নয়। যাদের পথের দিশারী হবার কথা, তারাই যদি ভুল পথ দেখায়, সেই হতাশাটা গোপন করা যায় না কোনভাবেই।

নিউজিল্যান্ড থেকে ফেরার পরে খেলোয়াড়দের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে সবারই কমবেশি ধারণা আছে, এই সময়ে যেখানে স্থিতিশীল একটা মানসিক অবস্থা দরকার ক্রিকেটারদের, তখন দল নির্বাচন নিয়ে এমন অহেতুক একটা বিতর্ক উস্কে দেয়াটা প্রথম আলোর মতো বড় সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button