ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

এ যেন চোরে চোরে মাসতুতো ভাই!

তিনি পুলিশের ডিআইজি ছিলেন, নাম মিজানুর রহমান। সিনেমা টিনেমাতে তার আসক্তি আছে কিনা জানি না, তবে নারীপ্রীতি ছিল বেশ। সিনেম্যাটিক কায়দায় তিনি এক তরুণীকে তুলে এনেছিলেন জোর করে। এটা গতবছরের ঘটনা, যে ঘটনা চাঞ্চল্য তৈরি করে। পোষাকে তিনি আইনের লোক, কিন্তু এই পোষাকের মর্যাদা তিনি ক্ষুন্ন করেছেন অপকর্ম করে।

মরিয়ম ইকো নামক এক তরুণীর সাথে ফোনে তার আলাপ হয়। তারপর ফোনেই তিনি সেই তরুণীকে বিভিন্ন অশোভন ইঙ্গিত দিতেন। তিনি নাকি পছন্দ করেছিলেন মরিয়ম ইকোকে। পছন্দ যে কেউ যে কাউকে করতেই পারে। এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু প্রত্যাখাত হওয়ার পর জোর করার অধিকার নিশ্চয়ই কারো নেই, সে তিনি পুলিশই হন কিংবা উকিল। তাছাড়া মরিয়মের এমনিতেও বিয়ে ঠিক হয়েছিল, কানাডা প্রবাসী এক ব্যক্তির সাথে।

মিজানুর রহমান ফোনে আড়ি পেতে মরিয়মের বিয়ে ঠিক হবার কথা জানতে পারেন। ফোনে আড়ি পাতা একটা বড় অপরাধ কারো অজান্তে, শুধু এই অপরাধ হিসেবে ধরলেও মিজানুরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়। যাহোক, মিজানুর বুঝেছেন মরিয়মকে তিনি স্বাভাবিকভাবে তার জীবনে পাবেন না। তাই তিনি মরিয়মকে ক্ষমা চাওয়ার কথা বলে তার বাড়ি যান। হয়ত এতদিন যা করেছেন তা ভুল ছিল এই কনফেশন করার অভিনয়। কিন্তু মেয়েটির বাসায় গিয়ে তাকে কৌশলে জোর করে তুলে নিয়ে আসেন ৩০০ ফিট এলাকায়। সেখান থেকে মেয়েটাকে মারধোর করতে থাকেন পুলিশের এই ডিআইজি। নিয়ে আসেন নিজের বেইলি রোডের বাসায়। ডাক্তার দিয়ে মেয়েটিকে অজ্ঞান করান। তারপর তরুণী যখন ঘুম থেকে ওঠে, আবিষ্কার করে তার পরণে মিজানুর রহমানের স্লিপিং ড্রেস। বুঝতে বাকি থাকে না কি হয়ে গেছে মেয়েটির সাথে..

এরপর কাহিনী আরো নাটকীয়। পিতৃহীন মরিয়ম ইকো আত্মহত্যা করবার চেষ্টা করেন। বাড়ির রান্নাঘরে ঢুকে গ্যাসের চুলায় আগুন জ্বালিয়ে নিজের ওড়নায় আগুন ধরিয়ে দেন। সেই যাত্রায় বেঁচে গেলেও তিন দিন মিজানুর রহমান অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মেয়েটাকে আটকে রাখেন। মরিয়মের মাকে খবর দিয়ে আনা হলে, তিনি মেয়ের এই দশা কেন করা হয়েছে জিজ্ঞেস করেন। তার বিপরীতে মিজানুর রহমানের হুমকি ধামকি শুনতে হয় তাদের। মিজানুর রহমান বলেন, এখান থেকে বাঁচার একটাই উপায়। আমার সাথে আপনার কন্যার বিয়ে দিন।

মা মেয়ে রাজি না হলেও মিজানুর ক্ষমতার দাপটের সামনে এসব আপত্তি ম্রিয়মাণ। ৫০ লাখ টাকা কাবিনে মগবাজার কাজী অফিসের কাজী ডেকে এনে মরিয়মকে বিয়ে করেন মিজানুর। এরপর লালমাটিয়ায় ৫০ হাজার টাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া করে সংসার শুরু করেন মিজানুর। বাড়ির নিচে দুইজন পুলিশ পাহারা দেয় সর্বক্ষন। মরিয়ম যেন গৃহবন্দী হয়ে পড়েন সেখানে। মাঝে মধ্যে মারধোর জুটে কপালে।

একদিন মরিয়ম ফেসবুকে মিজানুর রহমানকে স্বামী পরিচয় দিয়ে ছবি প্রকাশ করেন। এই ছবি দেখেই মিজানুর ক্ষীপ্ত হন। পুলিশের উপরমহলেও জানাজানি হয় ঘটনা। এই ঘটনার পরই তাদের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। মরিয়ম ইকো সমাজিকভাবে ডিআইজি মিজানের স্ত্রী পরিচয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অটল থাকেন। কিন্তু তার তার বিরুদ্ধে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় গোপন রেখে বাসা ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের মামলা করা হয়। এই মামলায় মরিয়মকে ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর পুলিশ গ্রেফতার করে। ১৩ ডিসেম্বর আদালতে হাজির করার পর তার জামিন আবেদন নাকচ হয়। তাকে কারাগারে যেতে হয়। শুধু তাই নয়, মরিয়মের বিরুদ্ধে ভুয়া কাবিন করার অভিযোগ এনে আরও একটি মামলা করা হয়। যুগান্তর পত্রিকার প্রতিবেদক কাবিননামার মামলা অনুসন্ধান করতে গিয়েই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। জানা যায়, ডিআইজি মিজানের কেলেঙ্কারির ঘটনা।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এই ডিআইজির ‘আলুর দোষ’ যে পুরানা সেই খবরও মিডিয়ায় একের পর এক আসতে থাকে। বিশেষ করে, সিলেটে ডিআইজি থাকা অবস্থায় তার কুকীর্তির কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি নিজেকে পরিচয় দিতেন প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় বলে৷ প্রায়ই, ফোন কানে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে আপা ডাকার ভং ধরতেন মিজান। সিলেটের উপশহরে পরিবার নিয়ে থাকার কথা বলে যে বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন, সেখানে সপ্তাহান্তে তার কাছে বিশেষ ‘মেহমান’ যেত। শোবিজের নায়িকা, গায়িকা সহ অনেকে মিলে সেখানে পার্টি হতো।

সিলেটে আওয়ামীলীগ নেতা উস্তার আলীর বাড়িতে ভাড়া থাকতেন তিনি। উস্তার আলী তার সম্পর্কে বলেন, “আমার বাড়ির তৃতীয়তলায় ভাড়া থাকতেন ডিআইজি মিজান। কিন্তু সুন্দরী মেয়েসহ বিভিন্ন মডেল প্রায় তার বাসায় আসত। আশপাশের লোকজন এসব নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন। এমনকি পুলিশের কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তাও আমাকে নিষেধ করেন তাকে যেন আমি বাসা ভাড়া না দিই। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে ডিআইজি মিজানকে বাসা ছেড়ে দিতে অনুরোধ করি।

এরপর তিনি বাসা ছেড়ে দিলেও প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়ে আমার লন্ডন প্রবাসী ছোট ভাইকে চাপ দিয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হেনস্তা করার সব চেষ্টা করেন। তবে পুলিশের কিছু ভালো অফিসারের হস্তক্ষেপে সেই বিপদ থেকে রক্ষা পাই। কিন্তু বাসা ভাড়া নিয়ে মেয়ে এনে ফুর্তির ঘটনায় আমি খুব কষ্ট পেয়েছি। তার মতো একজন পুলিশ অফিসারের কাছে এমনটি কোনোদিনও আশা করিনি।”

যাইহোক, মিজানুরের কেলেঙ্কারির গল্প যখন একে একে বেরুতে থাকে, ঠিক তখন মিজান আরো একটি বড় ভুল করে ফেলেন। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করার অভিযোগে তিনি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের নারী সংবাদ পাঠিকাকে হত্যার হুমকি দেন। ৬৪ টুকরা করে ফেলবেন কেটে এমন কথাও বলেন। এই হুমকির অডিও ভাইরাল হয় তখন। ক্ষীপ্ত মিজান বলেন, “এখন তুই আত্মহত্যা করবি। না হলে তোরে মাইরা ফালামু আমি। পৃথিবীর কোনো শক্তি নাই। এখন বের হ….তোরে তিনশ ফিটে নিয়ে ইজ্জত হরণ করতে চাইছি না? মানুষকে জড়ো করে বলছিস না? যেদিন মানুষ জড়ো করে অপমান করছিস এর রেজাল্ট আমি মিজান যদি বেঁচে থাকি, আমি কুত্তার বাচ্চা না হই, আমার বাবা যদি পয়দা করে থাকে, তাহলে তোরে আমি দেখাব। তুই যদি আমার… ছিঁড়তে পারিস…তোর জামাইরে বের হতে বল। রাস্তায় বের হতে বল। টুকরা টুকরা করব। আর তোরে করব ৬৪ জেলায় ৬৪ টুকরা।… গালি। আমার কথার বাইরে যদি ঢাকা শহরে চলছ তোকে আমি মাইরা ফালামু।”

মিজানের বিরুদ্ধে নারীপ্রীতি, যৌনহয়রানি, হুমকি ধামকি এসব অভিযোগের বাইরে অসংখ্য অভিযোগ আছে অর্থ আত্মসাতের, দূর্ণীতির। সেসবের ফিরিস্তি দিতে গেলে মহাকাব্য হয়ে যাবে। মরিয়ম ইকোর ঘটনা জানাজানির পর তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল ডিএমপি থেকে। এরপর দুদক তার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করেছিল। সেটা গতবছরের কথা। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, টিটুয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় এক কোটি টাকা আত্মসাৎ, ক্ষমতা ব্যবহার করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া – কত যে অভিযোগ এক মিজানুরের বিরুদ্ধে!

সে পুলিশের কর্মকর্তা, তার দুইসন্তানকে পড়ালেখা করাচ্ছেন কানাডায়, সেখানে খরচ হয় ৪/৫ লাখ টাকা। সেগুনবাগিচায় দুই হাজার বর্গফুটের একটি বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট কিনে ভাড়া দিয়েছেন তিনি, যে ফ্ল্যাট তার ভাগিনার নামে। তার এক ভাইয়ের নামে বেইলি রোডে কিনেছেন আলিশান ফ্ল্যাট। উত্তরায় স্ত্রীর নামে আছে ফ্ল্যাট ও প্লট। হবিগঞ্জে রয়েছে তার বাগানবাড়ি…

এই যখন অবস্থা তখন এমন দূর্ণীতিপরায়ণ অসৎ এবং দুশ্চরিত্র একজন মানুষের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনগত ব্যবস্থা নেয়াটাই স্বাভাবিক। তাকে সামাজিকভাবে বয়কট করাও নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। তার মতো একজন অপরাধীকে সাহায্য করা তো দূরে থাক, বরং তার অপকর্মের জন্য যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করাই দৃষ্টান্তমূলক হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু, আমরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, এই মিজানুর রহমানের মতো লোককে বাঁচাতে খোদ দুদক থেকেই সাহায্য করা হয়েছে। দুদকের পরিচালক এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি মিজানুরকে রক্ষা করতে ৪০ লক্ষ টাকা ঘুষ নিয়েছেন।

এনামুল বাছির মিজানুরকে দুদকের তদন্ত থেকে অব্যাহতি দেয়ার চুক্তি করে ঘুষ চেয়েছিলেন ৫০ লাখ, সাথে একটি গাড়ি। এর মধ্যে মিজানুর নাকি ৪০ লাখ টাকা দিয়েওছিলেন। এবছর জানুয়ারির ১৫ তারিখ রমনায় বাজারের ব্যাগে করে ২৫ লাখ টাকা দিয়েছেন এনামুলকে, পরে ফেব্রুয়ারিতে আরো ১৫ লাখ টাকা নগদে দেন। কিন্তু, এত টাকা দেয়ার পরেও উপরমহলের চাপ থাকার কারণে এনামুল বাছির মিজানুরকে অব্যাহতি দিতে পারেননি। রিপোর্ট জমা দিতেই হতো তাকে। জুন মাসের ২ তারিখ এই কথা মিজানুরকে জানালে তখন মিজানুর ক্ষীপ্ত হন।

তিনি নিজেই ঘুষ লেনদেনের কথা ফাঁস করে দেন। প্রমাণ হিসেবে অডিও রেকর্ড হাজির করেন, যা এটিএন নিউজে প্রচারিত হয়।

এনামুল নাকি নিজ থেকেই ঘুষ লেনদেনের অফার দিয়েছিলেন। দুদকে মিজানুরের ফাইল দেখে তার মনে হয়েছে মিজানুরকে ধরার উপায় নেই। তিনি সাহায্য করতে পারবেন কিন্তু টাকা ছাড়া সম্ভব নয়। জানুয়ারি মাসে রমনায় তারা দেখা করে ঠিক করেন, একে অপরের বিষয় দেখবেন। মিজানুর রহমান এনামুলকে দেয়া টাকা প্রসঙ্গে বলেন, “আমি তাঁকে করজোড়ে বলি, আপনি আমার ভাই। আপনার হাত ধরি-পা ধরি, আপনি আমাকে ইয়ে করেন। এরপর ১৫ জানুয়ারি রমনা পার্কে গিয়ে তাঁকে ২৫ লাখ টাকা দিই।”

এনামুলের সাথে কথা চালাচালির জন্য তাকে একটা ফোনও কিনে দেন, নতুন সিম দেন। যে সিম তার ড্রাইভারের নামে তোলা। এই সিমেই গত ছয়মাস ধরে তারা কথা চালাচালি করেন। অডিও রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও এনামুল বাছির বেমালুম অস্বীকার করেন ঘুষ নেয়ার কথা। মিজানকে খারাপ লোক উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এগুলো সঠিক নয়। এটি একটি বানোয়াট মেটার।” এনামুল বাছিরকে আপাতত সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। শর্ষের ভেতর আরো কত ভূত লুকিয়ে আছে, থলের মধ্যে লুকিয়ে আছে এমন কত বিড়াল তা কেবল মাঝে মধ্যে এমন ‘সাময়িক বহিষ্কার’ নোটিশেই ধারণা করা যায়।

তবে, আরো চমক আছে। মিজানুর নিজে কি বলছেন এও ঘুষ দেয়ার ব্যাপারে তা শুনলে আপনি হাসতে হাসতে কাঁদতেও পারেন হু হু করে। যার বিরুদ্ধে লাম্পট্য, যৌন হয়রানি, দূর্ণীতি সহ সব কেলেঙ্কারির অভিযোগ সেই মিজানকে জিজ্ঞেস করা হয়, কেন আপনি ঘুষ দিলেন এনামুল বাছিরকে। মিজান উত্তর দিলেন, “আমি বাধ্য হয়েছি। আমি ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছি। আমি কোনো অন্যায় করেনি। একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তা হলে এ দেশে কখনো দুর্নীতি দমন হবে না।”

মিজানের কথা শুনে সেই গল্পটা মনে পড়ে গেল। এক হুজুর আর এক চোর ভোরে পুকুরঘাটে এসেছে। চোর চুরি করে ফ্রেশ হওয়ার জন্য এসেছে আর হুজুর এসেছে ওজু করতে। চোরকে দেখে হুজুর ভাবছে, আহারে কি পরহেজগার আদমি, আজানের আগেই নামাজের জন্য হাজির। আর চোর ভাবছে, হালার পো হালায় মনে হয় আমার থেকেও বড় চোর। না জানি কত বড় চুরি কইরা এখানে আসছে…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button