খেলা ও ধুলা

শেষবেলায়, তুমি ভেসে আসা শঙ্খের সুর…

মার্টিন গাপটিলের হাতে বোধহয় অসুর টসুর কিছু একটা ভর করেছিল। নইলে ডিরেক্ট থ্রো-তে এমন রানআউট হরহামেশা দেখা যায় না। গাপটিল নিজেও বোধহয় দশবার চেষ্টা করলে একবার হিট করতে পারবেন এভাবে। সেই একবারটা গতকালই হলো, ধোনির বেলায়। লেগ আম্পায়ার রিচার্ড কেটেলব্রো মোটামুটি নিশ্চিত হয়েই থার্ড আম্পায়ারের শরণাপন্ন হলেন। গ্যালারীতে তখন পিনপতন নিরবতা, জীবনানন্দের কবিতাজুড়ে ভর করা রাজ্যের বিষাদ হানা দিয়েছে সেখানে।

কমেন্ট্রি বক্সে ইয়ান স্মিথ চেঁচাচ্ছেন গলা ফাটিয়ে, তার গমগমে গলায় শোনা যাচ্ছে- ‘ওহ, ডিরেক্ট হিট! ইজ দিস দ্য ওয়ার্ল্ডকাপ? ইটস মার্টিন গাপটিল! ইজ দিস দ্য ফাইনাল?’ নিউজিল্যান্ডের ফাইনাল নিশ্চিত হলো গাপটিলের সেই থ্রো-তে, আর নিশ্চিত হলো সেমিফাইনাল থেকে ভারতের বিদায়। অবসান ঘটলো স্বতন্ত্র একটা যুগের, মহাকালের পাতায় লেখা অনন্য এক উপন্যাসের শেষ অধ্যায়টারও শুরু হয়ে গেল সেই থ্রো-টাতেই।

G

সাইটস্ক্রিনে রিপ্লেটা দেখাতেই সাক্ষী ধোনি দুহাতে মুখ ঢাকলেন, ড্রেসিংরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে হাতচাপা দিলেন রোহিত শর্মাও। বিরাট কোহলি ভেতরে ঢুকেছেন জাদেজার আউটের পরেই। আর মহেন্দ্র সিং ধোনি? পরাজিত সৈনিকের মতো তিনি শরীরটাকে টেনে নিয়ে হাঁটা ধরলেন সাজঘরের পানে। পুরোটা ক্যারিয়ারজুড়ে যাকে সবাই ‘ক্যাপ্টেন কুল’ নামে জেনে এসেছে, যেকোন পরিস্থিতিতে নিজেকে যিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন দারুণভাবে, সেই মানুষটা চোখে জল নিয়ে ছাড়লেন মাঠ। পরাজয়ের গ্লানি কাঁধে চেপে হেঁটে চলেছেন একজন চ্যাম্পিয়ন, একজন জীবন্ত কিংবদন্তী! ক্রিকেট কখনও কখনও এতটাই নির্মম, এতটাই নির্দয়!

অথচ ধোনি মানেই আমাদের কাছে ছিলেন অপরাজেয় এক বীর, মাঠে যতোক্ষণ তিনি থাকবেন, ততক্ষণ বাকী সবাই পার্শ্বনায়ক, এমন কি বিরাট কোহলিও! ধোনি মানেই ডমিনেশন, ধোনি মানেই এক্সট্রাঅর্ডিনারি কিছু, ধোনি মানেই দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত কোন মুভ। নিজেকে পড়ার বা বোঝার সুযোগ দেননি কাউকে, অধিনায়ক ধোনী তাই যতোটা আনরিডেবল, মানুষ ধোনী আরো অনেক বেশী আনপ্রেডিক্টেবল।

ক্যারিয়ারজুড়ে অজস্র আচমকা জুয়া খেলেছেন ধোনী; মাঠে, মাঠের বাইরে সব জায়গায়। প্রতিপক্ষকে ভড়কে দিয়েছেন, হতবাক করেছেন ভক্ত সমর্থকদেরও। একমাত্র অধিনায়ক হিসেবে ভারতকে জিতিয়েছেন পঞ্চাশ ও বিশ ওভারের বিশ্বকাপ, সেই সাথে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ট্রেবল; যে কৃতিত্ব নেই আর কারো, যার পুনরাবৃত্তি করাটাও প্রায় অসম্ভব।

আট বছর আগেই সেই দৃশ্যটা এখনও চোখে ভাসে। নুয়ান কুলাসেকারা ছুটে আসছেন বোলিং এন্ড থেকে, মোটামুটি গজ দশেকের মতো হবে রানআপ। এইটুকু দূরত্ব পেরিয়ে আসতে সেকেন্ড পাঁচেক লাগে, এই সময়টুকুর মধ্যে স্ট্রাইকিং এন্ডে দাঁড়ানো মহেন্দ্র সিং ধোনি হয়তো নিজের বছর ছয়েকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারটায় একবার চোখ বুলিয়ে ফেললেন। দিব্যচোখে দেখতে পেলেন ২০০৭ বিশ্বকাপের পরের সেই সময়টাকে, তার রাঁচির বাড়ির সামনে টায়ার জ্বালিয়ে গালিগালাজ করছে লোকজন, জানালার কাঁচ ভাংছে ঢিলের আঘাতে। ধোনির বাবা পান সিং গেটের ভেতরে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে দেখছেন উন্মত্ত জনতার আস্ফালন।

কে জানে, হয়তো ধোনি এতকিছু ভাবেনইনি। আর দশটা শটের মতোই ব্যাট চালিয়েছিলেন তিনি, হয়তো মেমোরি লেন থেকে ঘুরে আসার দরকারই পড়েনি তার। মুরালি বোলিং করছিলেন, হুট করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে যুবরাজ সিংকে অপেক্ষায় রেখে নেমেছিলেন তিনি, ফাইনাল ম্যাচেও জুয়া খেলতে পিছপা হননি। তারই ফলাফল, গম্ভীরের সঙ্গে শতরানের জুটি, আর ৭৯ বলে ৯১ রানের ধ্রুপদী একটা ইনিংস।

উনপঞ্চাশতম ওভার, কুলাসেকারার বলে ব্যাটটা একপাক ঘুরলো, হেলিকপ্টার শট যেটার নাম। লং অনের ওপর দিয়ে বল উড়ে গেল সীমানার বাইরে। ধোনি তাকিয়ে রইলেন গমনপথের দিকে, সেই দৃষ্টিতে আকর্ষণ নেই, নেই অনেক কিছু পেয়ে যাবার আনন্দ, অথবা কাউকে দেখিয়ে দেয়ার স্পৃহা। ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময় ধোনিকে যেমন নির্লিপ্ত দেখা গেছে, তেমনই রইলেন তিনি। চোখে আনন্দের অশ্রু নিয়ে যুবরাজ সিং এসে জড়িয়ে ধরলেন ধোনিকে, কমেন্ট্রিবক্সে রবি শাস্ত্রীর গলা আপ্লুত করলো কোটি ভারতীয়কে, ধোনি আপ্লুত হলেন না মোটেও, ভাসলেন না আবেগে।

ভারতের ক্রিকেটে ধোনির আসনটা অন্যরকম উচ্চতায়। সেটা শুধু তিনি বিশ্বকাপ জিতেছেন বলে নয়, পরিসংখ্যানের কারণেও নয়। তিনি তার দলের ভেতরে একটা মন্ত্র গুঁজে দিয়েছেন, বিশ্বসেরা হবার মন্ত্র। শেবাগ-দ্রাবিড়-লক্ষণের মতো কিংবদন্তী ক্রিকেটারদের তিনি বসিয়ে দিয়েছেন, শুধুমাত্র তারা ফিল্ডিঙে আপ টু দ্য মার্ক নন বলে। ২০১১ বিশ্বকাপের পরে গম্ভীরকেও ছেঁটে ফেলেছেন টিম কম্বিনেশনে জায়গা না হবার কারণে।

আনন্দবাজার পত্রিকায় গৌতম ভট্টাচার্য একবার লিখেছিলেন- অধিনায়ক এমএসডির সবচাইতে বাজে এবং সবচাইতে দারুণ সিদ্ধান্ত ওই একটাই- সৌরভ-দ্রাবিড়-লক্ষণকে ওয়ানডে টীম থেকে ছেঁটে ফেলা। ব্যাটিং অর্ডারের তিন মহীরূহকে ওয়ানডে দল থেকে বাদ দিয়ে বিশ্বকাপের কথা মাথায় রেখে দল গোছানোটা তো চাট্টেখানি কথা নয়। শতকোটি ভক্ত সমর্থকের প্রত্যাশার চাপ মাথায় নিয়ে আটাশ বছর পর ভারতকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন ধোনি, প্রমাণ করেছেন নিজের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা।

উপমহাদেশীয় আবেগের ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি কখনও ধোনির মধ্যে। মাথার ওপর এভারেস্ট সমান প্রত্যাশার চাপ নিয়ে দশটি বছর ভারতের মতো ফলপ্রত্যাশী দলের ক্যাপ্টেনের হটসিট সামলেছেন দারুণ দক্ষতায়। বুকের ভেতরে মাউন্ট ফুজির আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে রেখে, যে আগুণে পুড়েছে প্রতিপক্ষ, কতো কতোবার!

অভিজ্ঞতার ওপরে তারুণ্যকে বরাবরই প্রাধান্য দিয়েছেন তিনি, আজকের রোহিত শর্মা যখন বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রানের মালিক হন, তখন হঠাৎই মনে পড়ে, ছয় থেকে তুলে এনে রোহিতকে দিয়ে ইনিংস ওপেন করার সিদ্ধান্তটা কিন্ত ২০১৩ সালে ধোনিই নিয়েছিলেন। লোকজন সমালোচনা করেছে, গালাগাল দিয়েছে, কিন্ত ফলাফল হিসেবে ধোনি বিশ্বকাপ নিয়ে এসেছেন ঘরে, দলকে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতিয়েছেন ইংল্যান্ডের প্রতিকূল কণ্ডিশনে, টেস্টে দলকে বানিয়েছেন এক নম্বর। ধোনিকে পছন্দ না করা লোকটাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়, ভারতের ক্রিকেটে সফলতার অন্যরকম একটা মানদণ্ড নির্ধারিত হয়েছিল ধোনির হাত ধরেই।

২০১৩ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আগেই বলেছিলেন, ভারতকে বিশ্বের সেরা ফিল্ডিং টিম বানাবেন। ধোনি কথা রেখেছেন। স্কোয়াডের প্রতিটা সদস্যকে আলাদাভাবে ফিল্ডিং কোচের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে। ফিটনেস নিয়ে ধোনি নিজে খেটেছেন, দলের সবাইকে খাটতে বাধ্য করেছেন।

ধোনিকে নিয়ে লিখতে বসলে লেখা শেষ হবে না আসলে। তিন ঘন্টার একটা সিনেমাই যাকে পুরোপুরি তুলে ধরতে পারেনি, হাজারখানেক শব্দের দুয়েকটা আর্টিকেলে আর কি হবে! ধোনি কি জিনিস সেটা জানেন বিরাট কোহলি, অধিনায়ক হবার পরে যিনি অন্ধের মতো অনুসরণ করতেন ধোনির দেয়া পরামর্শগুলোকে। ভারতীয় ক্রিকেটে ধোনিই একমাত্র অধিনায়ক, যিনি স্বেচ্ছায় অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিয়ে অনুজের অধীনে খেলেছেন দুই বছরেরও বেশি সময়। ইগো ক্ল্যাশের রমরমা খবরগুলো শুধু ট্যাবলয়েডের পাতাই ভরিয়েছে, ড্রেসিংরুমের অন্দরমহলে ঢুকতে পারেনি কখনও।

ধোনি কি জিনিস, সেটা জানে স্ট্যাম্প মাইক্রোফোন। জাদেজা-অশ্বিন থেকে শুরু করে আজকের চাহাল-জাদব, যাকে খুশি জিজ্ঞেস করুন, প্রায় প্রতিটা উইকেটের ভাগীদার হিসেবে তারা ধোনির নাম নেবেনই। মাইক্রোফোনে শোনা ‘ইধার সে নেহি, দুসরি তারাফ সে ডাল’ (ওভার দ্য উইকেট) কিংবা ‘বিচওয়ালে ডান্ডে সে মার’ (মিডল স্ট্যাম্প বরাবর) সাজেশন আসার পরের বলেই ব্যাটসম্যান যখন রেসিপি অনুযায়ী বোকা হয়ে উইকেটটা বিলিয়ে দিয়ে আসেন, তখন ধোনির অবদান অস্বীকার করাটা হবে অকৃতজ্ঞতার শামিল।

ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ খেলছেন, সেটা জানা ছিল সবার। শেষটা যে এত জলদি হবে, সেটা ভাবা যায়নি। শেষবেলায় খানিকটা সমালোচনা ঘিরে ধরলো তাকে, ধীরগতির ব্যাটিং নিয়ে কথা শুনতে হলো। তাতেও অবশ্য নির্বিকার তিনি। দলের বিপদে ঠিকই নির্ভরতার যোগান আসছিলো সর্বকালের অন্যতম সেরা ফিনিশারের ব্যাট থেকে। সেরা ছন্দের সময়টা অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছেন। ব্যাট হাতে যেমন তেমন হলেও, গ্লাভস হাতের ধোনিকে বিট করার মতো কেউ এখনও শুধু ভারত কেন, ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটেও নেই এই মূহুর্তে।

সেটার পাশাপাশি অভিজ্ঞতার বিশাল ভাণ্ডার তো আছেই, এটুকু উজাড় করে দেয়ার জন্যেই নিজেকে বিশ্বকাপ পর্যন্ত ধরে রেখেছিলেন। বিশ্বকাপ শিরোপাটা শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখার বাসনাটাও হয়তো ছিল মনের কোণে। দেশের মাটিতেই আনুষ্ঠানিক বিদায় বলে দেবেন ক’দিন পরে, সেটার জন্যেই আপাতত অপেক্ষা। মহেন্দ্র সিং ধোনি নামের ক্রিকেটের বিশাল কলেবরের উপন্যাসটার সমাপ্তি ঘটতে চলেছে ক’টা দিন বাদেই- এটুকু ভাবতেই কেমন যেন মন খারাপ হয়।

ভারত কখনও আমার পছন্দের দল ছিল না, ধোনি ছিলেন পছন্দের। ক্রিকেটে পাকিস্তান ম্যাচ ছাড়া ভারত কোনদিন আমার ভালোবাসা পায়নি, ধোনি পেয়েছিলেন। ভালোবাসার বিদায়বেলায় আবেগের চোরাস্রোতে ক্ষণিকের জন্যে ভেসে যাওয়াটা বোধহয় বাড়াবাড়ি কিছু নয়…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button