ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

চকবাজারে মৃত্যুর মিছিল: আমরাই কি দায়ী নই?

ঢাকা মেডিকেলে এখন লাশের মিছিল। পুরান ঢাকার চকবাজার থেকে একটার পর একটা লাশ আসছে সেখানে, পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া মৃতদেহগুলো দেখে চেনার কোন উপায় নেই। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ। অনেকে উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন চারপাশে, আপনজনের কোন খোঁজ তারা পাননি এখনও। মানুষগুলো বেঁচে আছেন, নাকি মৃতের মিছিলে নাম লিখিয়েছেন, সেটাও জানেন না তারা! বোর্ডে লেখা লাশের অঙ্কটা পাল্টে যাচ্ছে কিছুক্ষণ পরপর, উদ্ধার করে আনা হচ্ছে নতুন নতুন মৃতদেহ। শেষযাত্রার আগে কাগজের পৃষ্ঠায় একটা সংখ্যা হয়েই টিকে থাকছেন মানুষগুলো…

তিনদিনের সরকারী ছুটি, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর দারুণ একটা সুযোগ! সেই সুযোগটা তারা পেলেন না আর। মর্মান্তিক এক অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নিলো সত্তরটা তাজা প্রাণ। মৃতের সংখ্যা বাড়ছে সময়ের সাথে, হয়তো একশো ছাড়িয়ে যাবে সেটা। গুরুতরভাবে আহতও হয়েছেন বেশ কয়েকজন।

রাত ১০টা ১০ মিনিটে পুরান ঢাকার নন্দকুমার দত্ত সড়কের চুরিহাট্টা মসজিদ গলির রাজ্জাক ভবনে আগুন লাগে। রাতে পৌনে একটার দিকে পাশের কয়েকটি ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। চকবাজার এলাকার গ্যাস লাইন থেকেও ওই সময় আগুন বের হচ্ছিল। অগ্নিকাণ্ডের পর ওই এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। জানা গেছে, সেই এলাকায় প্রচুর কেমিকেল গোডাউন আছে, রাজ্জাক ভবনের নীচতলাতেও রাসায়নিক দ্রব্যের কারখানা ছিল। সেকারণেই আগুন ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুত, চলে গেছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

আবার স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, স্থানীয় ওয়াহেদ ম্যানশন থেকে আগুনের সূত্রপাত। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রাতে ওয়াহেদ ম্যানসনের সামনে একটি পিকআপ ভ্যান ও একটি প্রাইভেট কারের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এরপর প্রাইভেট কারের গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ হয়। ওয়াহেদ ম্যানসনের নিচতলায় রয়েছে একটি পারফিউমের দোকান। গাড়ির আগুন পারফিউমের দোকানে লাগে, পরে পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ বলেছেন, ওয়াহিদ ম্যানসনের সামনে একটি প্রাইভেট কার দাঁড়িয়েছিল। গাড়িতে ছোট ছোট অনেক রুম ফ্রেশনারের বোতল ছিল। সেই বোতল বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত।

ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে কিছু জানানো হয়নি। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রচণ্ড বেগ পেতে হয়েছে সংস্থাটিকে। পুরান ঢাকার সরু গলি দিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারছিল না ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, তাছাড়া পাঁচটি ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পরে আগুনের ভয়াবহতা বেড়ে গিয়েছিল প্রচণ্ডভাবে, আশেপাশে পানির উৎস না থাকায় কাজটা আরও কঠিণ হয়ে উঠেছিল। পরে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে কাজ করেছে বিমানবাহিনীও। ভোরের দিকে নিয়ন্ত্রণে এসেছে আগুন, তারপরই শুরু হয়েছে উদ্ধার অভিযান।

ঔষধ কিনতে রাতে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন আয়েশা বেগম। এর খানিক পরেই ঘটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। আয়েশার কোন খোঁজ পাচ্ছেন না স্বজনেরা, ফোনটাও ডেড হয়ে আছে। ঢাকা মেডিকেলের লাশের ভীড়ে আয়েশাও একজন কিনা, সেটা জানেন না তার পরিবার। খেলনার দোকানের মালিক এনামুল হকের বাবা খুঁজে ফিরছেন ছেলেকে, পোড়া লাশের ভীড়ে হয়তো মিশে আছেন এনামুল, পরিবারের সদস্যরা সনাক্তও করতে পারছেন না। আগুনে পুড়ে এমনই বিকৃত হয়ে গিয়েছে লাশগুলোর চেহারা!

চকবাজারের হায়দার মেডিকো নামের ঔষধের দোকানের মালিক ছিলেন মঞ্জু। রোজ রাতে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও কাছের চার বন্ধুকে নিয়ে আড্ডায় মেতে উঠতেন তিনি। সারাদিনের কাজ শেষ করে বন্ধুরাও চলে আসতেন ফার্মেসীতে, গতকালও এসেছিলেন। আর কোনদিন একসঙ্গে আড্ডা দেয়া হবে না তাদের, কারণ চারজনের কেউই বেঁচে নেই! হায়দার মেডিকোর ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া চারটি মাথার খুলি, হাড়গোড়। চারজনের কারো কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, আর তাই এই চারটি মৃতদেহ যে চার বন্ধুর, সেটা নিয়ে সন্দেহ নেই কোন। আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে যে, দোকান থেকে বের হবার সুযোগটাও পাওয়া যায়নি।

সকাল সোয়া ৮টা পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেলের মর্গে মোট ৬৫টি মরদেহ নেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ৫ জন নারী, ৩টি শিশু ও ৫৭ জন পুরুষ। মর্গের বারান্দায় সারিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে মরদেহগুলো। আর মৃতদের একটি তালিকা টাঙ্গিয়ে দেওয়া হয়েছে মর্গের বাইরে দেয়ালে। সেখানে স্বজন হারানোদের ভীর বাড়ছে। তারা নাম দেখে জানতে চেষ্টা করছেন তাদের স্বজনদের কেউ রয়েছে কিনা। এছাড়া লাশ দেখেও সনাক্ত করার চেষ্টা করছেন। তবে মৃতদের অধিকাংশের চেহারাই এমনভাবে পুড়ে গেছে যে কোনও ভাবে তা থেকে বোঝার উপায় নেই, কার লাশ কোনটি।

নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছিল অজস্র মানুষ। সেখানেও দুর্ঘটনার পেছনে দায়ী ছিল কেমিক্যাল কারখানাগুলো। এবারও মৃত্যুর মিছিলে কেমিক্যাল কারখানারই দায়। সরু গলি, ঘিঞ্জি এলাকায় কেন কেমিক্যাল কারখানা থাকবে, বিশ্বের আর কোন জনবান্ধব শহরে এমন নজির আছে কিনা আমাদের জানা নেই। লাশের সংখ্যা বাড়ছে, আরও বাড়বে। আমাদের সচেতনতা বাড়বে না কখনও। ক’টা বাড়তি টাকার আশায় আবাসিক ভবনের নিচে কেমিক্যাল গোডাউন ভাড়া দেবো আমরা, ডেকে আনবো শত শত মানুষের মৃত্যু। কর্তৃপক্ষও থাকবে উদাসীন। ক’দিন গেলেই আবার সব ভুলে যাবো, ভুলে যাওয়াটাই তো নিয়তি! মৃত মানুষগুলো তো একেকটা সংখ্যার চেয়ে বেশি কিছু নয় আমাদের কাছে!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button