ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

জাদুর শহর ঢাকা? নাকি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি?

ঢাকা শহরের মানুষ আগ্নেয়গিরির উপর বসবাস করছে। এই কথাগুলো খ্যাতিমান স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন-এর। বছর দুয়েক আগের কলাম থেকে নেয়া লেখাটি এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আবার তুলে ধরছি।

নেপালে ভূমিকম্প হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন- “নেপালে ভূমিকম্পের সময় বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়েছে। বৈদ্যুতিক শকে বহু লোক মারাও গেছে। ঢাকা তার চেয়েও ভয়াবহ অবস্থায় আছে। নেপালের কাছাকাছি যদি একটা ভূমিকম্প হয়, তাহলে ঢাকা শহরের গ্যাস লাইনগুলো বিস্ফোরণ হবে। তার মানে ঢাকার চারদিকে গ্যাস বের হবে। ভবন চাপা পড়ার ২১ দিন বেঁচে থাকার ইতিহাস রয়েছে পৃথিবীতে। কিন্তু আগুন লাগলে তো এক থেকে দেড় ঘণ্টার বেশি মানুষ বাঁচার তো কোনো সম্ভাবনা নেই। জাপানের নতুন উন্নত শহর কোবেতে প্রায় সাত দিনের উপর আগুন জ্বলেছে কারণ ওখানে প্রচুর ফার্নেস ছিল। আমাদের ঢাকা শহরের আগুন ১০/১৫ দিনে কেউ থামাতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।

এই দুর্ঘটনার পর আমরা হাসপাতালে যাব। কিন্তু ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় দুটি হাসপাতাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ। এই দুটো সবার আগে ভেঙ্গে পড়বে। অর্থাৎ আপনি আহতদেরকে সেখানে নিতে পারবেন না। ঢাকা শহর এবং বাংলাদেশকে যারা নিয়ন্ত্রণ করবেন সেই সচিবালয় ভবন ভেঙ্গে পড়বে। এগুলো সবই গবেষণায় পাওয়া গেছে। এরপর আসেন ফায়ার ব্রিগেড যারা উদ্ধার করবে তারা যেখানে থাকেন কিংবা গাড়িগুলো যেখানে রাখা হয়, সেগুলো প্রায় সবগুলোই ভেঙ্গে পড়ার আশংকা আছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোবাশ্বের স্যার ওই কলামে লিখেছিলেন- ফায়ার সার্ভিস নিয়েও। ফায়ার ব্রিগেড হলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছাগলের তিন নম্বর বাঁচ্চা। অর্থাৎ একেবারে অসহায়। অন্যদের বরাদ্দের তুলনায় সে বরাদ্দ পায় না, লাফায় কিন্তু মায়ের দুধ কখনো খেতে পারে না। এই অবস্থা বদলাতে ফায়ার সার্ভিসকে নিয়ে আসতে বলেছিলেন- দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ে। কারণ দুর্যোগের সময় দুর্যোগ মন্ত্রণালয় তাদেরকে ব্যবহার করবে অথচ তারা ওই মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেই। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার।

দুর্যোগ প্রশমন নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছিলেন- ঢাকা শহরের উন্মুক্ত স্থানগুলোকে এভাবে তৈরি করতে হবে যাতে দুর্যোগ আক্রান্ত মানুষেরা এসব সুবিধা সেখানে পান। মানুষকে জানতে হবে ভবন ভেঙ্গে পড়লে আমি কোন জায়গায় যাব। কার সঙ্গে যোগাযোগ করব? আমি ওই জায়গায় গেলে পানি পাব, খাবার পাব, আশ্রয় পাব। সেজন্য স্থায়ী ব্যবস্থা থাকতে হবে। এই জিনিসগুলো পৃথিবীর প্রায় সব জায়গায় রয়েছে। সুইজারল্যান্ডে মাটির নিচে এমন ব্যবস্থা রয়েছে।

উনার কলাম থেকেই সরাসরি উদ্ধৃতি তুলে ধরি- ‘আমাদের ২০ শতাংশ মানুষ মারা যাবে ভবনের ভেতর চাপা পড়ে। আর ৮০ শতাংশ মানুষ মারা যাবে রাস্তায় ভবন চাপা পড়ে। আমি শক্তিশালী ভবন তৈরি করলাম কিন্তু আশপাশের ভবনগুলো নড়বড়ে তাহলে অবস্থা কী হবে? আরও ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো ঢাকা শহরের অধিকাংশ ভবনগুলোতে সাধারণ কাঁচ ব্যবহার করা হয় যেগুলো একটা ঢিল ছুঁড়লেই ভেঙ্গে যায়। ভূমিকম্পের সময় এই কাঁচগুলো আগে ভেঙ্গে পড়বে। এগুলো শক্তিশালী বুলেট হয়ে মানুষের গায়ে আঘাত করবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর নজির রয়েছে। এ ভবনগুলোতে সবসময় টেম্পারড গ্লাস ব্যবহার করতে হবে। কারণ এটি ভাঙলে গুড়ো গুড়ো হয়ে যায়। মানুষের তেমন ক্ষতি হবে না। এগুলো ব্যবহারে বাধ্যতামূলক করা দরকার। যাতে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়। শুধু দুর্যোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।’

‘শুধু ঢাকা শহরেই ৭০ থেকে ৮০ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। যেগুলো আন-আইডেন্টিফাইড। এমন আনআইডেন্টিফাইড অজস্র ভবন রয়েছে যেগুলো বাইরে থেকে খুব সন্দর ও আধুনিক মর্ডানের মনে হবে কিন্তু নির্মাণ কাজের গুণগত মান ঠিক নেই।’

চকবাজার, চকবাজারে আগুন

‘ভুমিকম্পের পর নেপালে যে ঘটনা ঘটেছে। ঢাকায় হবে অন্যটা। ঢাকার মানুষজন আগ্নেয়গিরি উপর বসবাস করছে। মাকড়সার জ্বালের মতো বৈদ্যুতিক লাইন, তিতাসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাইপ ছড়িয়ে আছে। প্রচুর বৈদ্যুতিক তার ছিড়ে যাবে। স্পার্ক তৈরি হবে। তার মানে নিচে গ্যাস জ্বলবে। উপরে ইলেকট্রিক স্পার্ক। সুতরাং ঢাকা শহর একটা অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হবে। ঢাকা মেডিকেল ও অন্যান্য ভবন সবার আগে ভেঙ্গে পড়বে। এই যে ঝুঁকিপূর্ণ ৭০ হাজার ভবনের ৭০ টিও যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে উদ্ধার কাজ কীভাবে হবে?’

উনার লেখায় অনেক করণীয় বলেছিলেন। পুরো লেখাটা এই লিংকে। যদিও একাডেমিক আলোচনা, তবে মোটা দাগে আতংকজনক- সেই সাথে দিক নির্দেশনামূলকও বটে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button