অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

ডেডলাইন ঢাকা: ১৮৫৭ বিদ্রোহ ও আতংকিত এক শহরের গল্প!

ভারতের আমির খানের ‘মঙ্গল পান্ডে’ সিনেমাটি আমরা অনেকেই দেখেছি। ২৯ মার্চ ১৮৫৭ ব্যারাকপুরে মঙ্গল পান্ডে নামে এক ভারতীয় সৈনিক জনৈক ইংরেজ অফিসারকে হত্যার মাধ্যমে বিদ্রোহের সূত্রপাত। ১০ মে মিরাটে প্রথম ব্যাপক আকারে, এরপর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে উত্তর ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। পূর্ববঙ্গের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিদ্রোহ কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে হলেও এর রেশ এসে পৌঁছেছিল এখানেও।

ঢাকায় সিপাহি সংখ্যা ছিল প্রায় দু’শ। দেশী সিপাহিরা থাকত লালবাগে, তারা পরিচিত ছিল ‘কালা সিপাহি’ নামে। আর ইংরেজ সিপাহিদের বলা হতো ‘গোরা সিপাহি”। কালা সিপাহিরা ছিল শক্ত সমর্থ, অমায়িক। এ জন্য শহরের মুসলমানদের মধ্যে তারা জনপ্রিয় ছিল। মুসলমান অধিবাসী ছাড়া তারা অন্যদের কাছে ছিল অপ্রিয়। মার্চের গোড়া থেকেই ছোটখাট কারনে শহরের বাসিন্দাদের সাথে সিপাহিদের মনোমালিন্যের সূত্রপাত হয়েছিল। যেমন মার্চের শেষে এক ব্রাক্ষ্মণ রুটিওয়ালাকে পেটানোর দায়ে এক সিপাহিকে একশ রুপি জরিমানা করা হয়েছিল। আবার তোপখানার প্রহরীদের প্ররোচিত করার প্রচেষ্টার দায়ে চৌত্রিশ নেটিভ ইনফ্যানট্রির দুজনকে চৌদ্দ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল।

যাই হোক, মিরাটের বিদ্রোহের খবর মে মাসে ঢাকায় এসে পৌছে। এ সময় বাজারে ধর্মপ্রচারকালে সিপাহিদের পক্ষ থেকে মিশনারিদের প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়। এ সময় ঢাকায় গুজব রটে সেপাহিরা স্ত্রী শিক্ষা পছন্দ করে না। যার প্রভাবে বাংলাবাজার ফিমেল স্কুল প্রায় ছাত্রীশূন্য হয়ে পড়ে। মে মাসের শেষ ও জুনের শুরুতে ৭৩ এর দুটি কোম্পানি বদলি হিসাবে জলপাইগুড়ি থেকে ঢাকায় আসে। এর সাথে ১০ জুন ইউরোপীয় বাহিনী ঢাকায় আসতে পারে শুনে সিপাহিরা বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠে। পুরো মে-জুন মাস জুড়েই ঢাকা শহরে গুজব আর উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে চলতে থাকে। একটা গুজব কিভাবে ইংরেজদের আতন্কগ্রস্ত করেছিল তা এইরকম-

“১২ জুন দুপুর সাড়ে বারোটা, মিলব্যারাক থেকে হন্তদন্ত হয়ে এক লোক ছুটে বেরিয়ে শহরের রাস্তায় ইংরেজ যাদের পাচ্ছিল তাদের জানাছিল যে ৭৩ এর দুটি কোম্পানি জলপাইগুড়ি থেকে রওনা হয়েছিল, মাঝপথে তারা ব্যারাকপুরের ছাটাই করা কিছু সিপাহির সঙ্গে একত্র হয়ে বিদ্রোহ করেছে এবং ঢাকায় ফিরে এসে লালবাগ দূর্গে অবস্হানরত দেশী সিপাহিদের সঙ্গে একত্র হয়ে বাজার লুট করছে আর জেলবন্দিদের ছেড়ে দিয়েছে।”

গুজব শুনে বেশ কিছু ইউরোপীয় রওনা হন ম্যাজিস্ট্রেট কিনসের বাসায় আশু কর্তব্য ঠিক করার জন্য। আর অনেকে বাসায় ফিরে তড়িঘড়ি করে মহিলা ও বাচ্চাদের নিয়ে চলে এলেন সদরঘাট,উঠিয়ে দিলেন নৌকায় নদীতে ভেসে পড়ার জন্য! কালেকটরিতে তখন এজলাস চলছিল। হঠাৎ শোনা গেল ‘আসছে’,’আসছে’,,। কে আসছে সে প্রশ্নের অবকাশ ছিল না কারও, বিচারক উঠে দাঁড়িয়ে বাজালেন বিপদ ঘন্টা, দৌড়ে পালালো পুলিশ অফিসাররা। মুহূর্তে জনশূন্য কাচারী!

অফিস-আদালত সব খালি। কলেজ থেকে বেরিয়ে পড়েছিল সব ছাত্র। অনেকে নৌকা ভাড়া করে রওনা দিয়েছিলেন গ্রামের দিকে বাড়ীর ভৃত্যের হাতে সংসারের চাবি সঁপে। ব্যাপটিস্ট চার্চের উল্টো দিকে এক বাড়ির তিনতলায় ‘ঢাকা নিউজ’ এর সম্পাদক কেম্প সাহেব বসেছিলেন রিভালবার হাতে। আর্মেনীয়ান বনিক সিরকোও সাহস সঞ্চার করে রয়ে গেলেন সে ভবনে। জর্জ, ম্যাজিস্ট্রেট আর কমিশনার টহল দিচ্ছিলেন সদরঘাট টু কোম্পানির বাগান অব্দি (ঢাকা বেঙ্গল ব্যাংকের চৌহদ্দি)। আর বুড়িগঙ্গার তীরে দাড়িয়ে আদি শহরবাসী জমায়েত হয়ে অনুধাবনের চেষ্টা করছিল পুরো ব্যাপারটা? শহরের অবস্হাপন্ন বাসিন্দারা বসেছিলে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে। অকল্পনীয়ভাবে মানুষ এক গলি থেকে আরেক গলিতে ছুটাছুটি করছিল। কেউ কেউ মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখছিল ধনসম্পদ। তবে কিছুক্ষনের মধ্যে হু হু করে বেড়ে গেলো জিনিসপত্রের দাম, সবাই মিলে কিনে নিচ্ছিল খাদ্যদ্রব্যের শেষটুকু। তবে দুস্কৃতকারী হিসেবে ঐ সময়ে শহরে যারা খ্যাত তারা কিন্তু কোন উৎপাতই করে নি!

গুজবের শহর ঢাকা? এর পরের ইতিহাসটা মর্মান্তিক অধ্যায়ের শুরু…

*

অবশ্য, পরে দেখা গেল পুরো ব্যাপারটাই ভিত্তিহীন আর গুজব। পর দিন আতন্কিত ইউরোপীয় শহরবাসীরা কাগজে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানালো, শহরবাসী ভদ্রলোকেরা যেন গুজবে কান না দেন এবং গুজব শুনলে ম্যাজিস্ট্রেট বা তাদের তৈরী ‘কমিটি অফ সেফটি’র সদস্যদের জানাতে! তারা এর সত্যতা যাচাই করবেন। আরও বলা হলো খৃস্টানদের বিশেষ নিরাপত্তা গ্রহনের জন্য যেন তারা পরস্পরকে রক্ষা করেন। শহরের একটা বাড়ি ঠিক করা হল, প্রস্তাব করা হল কমিশনারের বাড়িই হবে সবচেয়ে উপযুক্ত।

এই ভয় দূর করবার উপায় কি? ইংরেজরা লেফটেনান্ট লুইসকে পাঠালেন ঢাকায় ১৮৫৭ সালের অগাস্ট মাসে বিশেষ মিশন দিয়েই। যা প্রকাশ পায় আরো পরে। লুইসের অধীনে একশত নৌসেনা, দুটো চৌদ্দ ইঞ্চি কামান নিয়ে কলকাতা হয়ে ঢাকায় পৌছে। যে দিন নৌসেনাদের জাহাজ সদরঘাটে ভিড়লো, ঘটলো আরেক ঘটনা! সদরঘাটে সেদিন বেশ কয়েকজন যুবক নদীর অপর তীরে সিপাহিদের পোষাক পরে কিছু লোককে পিটিয়েছিল। কেন তা অবশ্য জানা যায়নি। সেদিনও ফের দেখা দিলো শহরে উত্তেজনা। নিরাপদ আশ্রয় ভেবে অনেকে মূলবান জিনিসপত্র ফেলে দিছিলো কুয়োতে! এর আগেও ২৮ জুন শহরতলীতে দুজন দলত্যাগীকে ধরেছিল পুলিশ। কিন্তু সিপাহিরা পুলিশের হাত থেকে তাদের ছিনিয়ে নেয়। পরে এই দুই কোম্পানিকেই পাঠানো হয় প্যারেড করানোর জন্য। বরকন্দাজরা দোষী খুজে বের করতে পারেনি, হয়তো ভয়েই! তবে সিপাহিরা কিন্তু অভিযোগ করেছিল, পুলিশের জন্য তারা শহরে আসতে পারছে না।

এদিকে লুইস সাহেব সৈন্য নিয়ে আস্তানা গাড়লেন ব্যাপটিস্ট চার্চের উল্টোদিকের এক বাড়িতে। আর প্রতিদিন তার সেনা নিয়ে রেকেট কোর্ট আর ঢাকা কলেজের সামনে মহড়া দিচ্ছিলেন। কালেকটরিতে মাঝে মাঝে হয় এই মহড়া। পাহারাদার সিপাহিদের নৌসেনাদের উপস্হিতি এবং সামগ্রিক আচরণ তাদের ক্ষুব্ধ করে সাথে মন্তব্য করে, ‘ইয়ে কেয়া ডার দেখলাতা?’

২রা জুলাই। ঢাকার সেনাবাহিনীর অধ্যক্ষ ডওয়েল সাহেব কামান বসানোর জন্য স্কু’র খোঁজে পাঠিয়েছিলেন একদল সেপাহিকে লালবাগে। এতে সিপাহিদের ধারনা জন্মে তাদের নিরস্ত্র করা হবে। ৩০শে জুলাই। ঢাকায় অধিকাংশ ইউরোপীয় (প্রায় ষাট জন) নিয়ে একটা সভা হলো। উদ্দেশ্য একটা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তোলা। ঠিক হলো দু-ধরনের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী হবে- পদাতিক আর ঘোড়সওয়ার। মেজর স্মিথ এবং মি. হিচিন্স যথাক্রমে দু’ বাহিনীর অধিনায়ক নির্বাচিত হলেন।

বকরি ঈদের তিন দিন (অগাস্ট ১-৩) সারা রাত শহরজুড়ে টহল দিয়ে বেড়ালো স্বেচ্ছাসেবকরা কারণ তারা ভেবেছিল ঈদ উপলক্ষে ঝামেলা হতে পারে। শুধু কি তাই, ইউরোপীয়রা এতই আতন্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল যে অগাস্টের ২ তারিখ যারা গির্জায় উপাসনা করতে গিয়েছিল, কাল্পনিক হামলার ভয়ে তাদের রক্ষার জন্য মোতায়েন ছিল স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী! পরের সপ্তাহে অনেক আর্মেনীয়ান শহর শহর ছাড়তে শুরু করে। গন্তব্য কোলকাতা।

১২ অগাস্ট। ঢাকার খৃস্টান অর্থাৎ ইংরেজদের পক্ষে আলেকজান্ডার ফর্বেস (ঢাকা নিউজ সম্পাদক) কমিশনারের কাছে আবেদন জানালো, বিপদ হলে খৃস্টানরা যাতে ফলির মিলে আশ্রয় নিতে পারে এজন্য মিলটি সজ্জিত করার জন্য আর্থিক সাহায্যের। উত্তরে কমিশনার ডেভিডসন হুমকির সুরে বললেন, ঝামেলা হলে খৃস্টানরা যদি শহর ত্যাগ করে তবে রাজস্বের অনেক ক্ষতি হবে আর এ কাজে তার অর্থ বরাদ্দ করার ক্ষমতা নাই! এতে ইংরেজ শহরবাসী দমবার পাত্র নন। তারা নিজ খরচে দু’শ লোক নিয়োজিত করে যাতে আক্রমন হলে সেখানে পাঁচ-ছয় হাজার লোকের আক্রমন ঠেকানো যায়!

২৯ অগাস্ট দিনটি ছিল মহররম। এদিনও শান্তি ভঙ্গের আশন্কায় ঘোড়সওয়ার বাহিনী টহল দিল সারা রাত। উৎসবের প্রধান কেন্দ্র হোসনি দালানে ভিড় হয়নি অন্যান্যবারের মতো। মুসলমানরা ভীত হয়ে পড়েছিল খানিকটা। শহরে ছিল থমথমে ভাব। আদি শহরবাসীরা কিন্তু বুঝতে পারছিল না সাহেবরা কেন এত উত্তেজিত আর কেনই-বা স্বেচ্ছাসেবকরা এত কষ্ট করে রাতে টহল দিচ্ছে?

১৭ সেপ্টেম্বর। একশ নাবিক নিয়ে একটা স্টিমার আসাম যাওয়ার পথে থামলো ঢাকার সদরঘাটে। ঢাকা ছেড়ে আর অগ্রসর হতে অনিচ্ছা দেখালো। তাদের নাকি ঝোঁক দেখা গিয়েছিল বিদ্রোহের। মাঠে নামলেন ম্যাজিস্ট্রেট কারনাক আর লে. লুইস। গুলিভরা বন্দুক ও বেয়নেট দেখিয়ে ফেরত পথে যাত্রা করালেন। শহরে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছিল।

তার বিস্ফোরণ ও এর সমাপ্তি ঘটলো ২১ থেকে ২৬ শে নভেম্বরের মধ্যে…

*

২১ নভেম্বর গোয়েন্দাসূত্রে চট্টগ্রামের সিপাহিদের বিদ্রোহের খবর ঢাকা পৌঁছালো। চিন্তিত লে. লুইস সামরিক ও বেসামরিক লোকদের নিয়ে এক বৈঠক করল কিভাবে ঢাকার দেশী সিপাহিদের নিরস্ত্র করা হবে।

২২ নভেম্বর। ভোরের আলো ফোটেনি তখনও, নির্দেশমত একে একে সকাল ৫টায় জড়ো হলো কমিশনার, জজ, কিছু সিভিলিয়ান আর কুড়ি জন স্বেচ্ছাসেবক। জায়গাটা উল্লেখিত নেই, তবে অনুমান করা হয় সেটা ঢাকা কলেজ! 

লে.লুইস, লে.ইটিবিয়াস, লে.ডডওয়েল ও উইলিয়াম ম্যাকফারসন অগ্রসর হলেন লালবাগের দিকে। একই সময় লে.রিন্ড, ফরবেস, হ্যারিস, স্বেচ্ছাসেবী নলেন পোগজ, স্যামুয়েল রবিনসন ও জন জারকাস রওনা দিল সরকারি কোষাগারের দিকে, প্রহরীদের নিরস্ত্র করতে। তোপখানায় তখন প্রহরা দিচ্ছিল জনা পনের সিপাহি। তাদের অনেকেই তখন ঘুমে। ঘুম থেকে তুলে যখন তাদের নিরস্ত্র করা হচ্ছিল তখনই শোনা গেল লালবাগ থেকে গুলিগোলার শব্দ। ইংরেজ স্বেচ্ছােসেবীরা হঠাৎ আওয়াজে খানিকটা হতচকিত হয়ে যায়। আর সে সুযোগে তোপখানার প্রহরীরা পালালো।

নৌসেনারা লালবাগ পৌছে দেখল সিপাহিরা প্রস্তুত। তারা আগেই বোধ হয় খবর পেয়েছিল। প্রহরী গুলি ছুড়ছিল আর মারা পরলো এক ইংরেজ। দেশী সিপাহিরা এ ধরনের কোন আক্রমণ আশা করেনি। সবাই নিরুদ্বেগে ঘুমাছিল। গুলিবর্ষণের শব্দে বিমূঢ় হয়ে গেলেও তাদের প্রত্যেকের কাছে থাকা দশ রাউন্ড গুলি দিয়েই প্রত্যুত্তর দিচ্ছিল।

অস্ত্রাগারের চাবি থাকে সুবেদারের কাছে। সিপাহিরা তাকে অস্ত্রাগার খুলে দিতে অনুরোধ করলে অস্বীকৃত জানান তিনি। সুবেদারের স্ত্রীও অনুরোধ জানিয়েও প্রত্যাখ্যাত হলো। সিপাহিরা এ পর্যায়ে সুবেদারকে হত্যা করে চাবি ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু ততক্ষনে প্রবল হয়ে উঠেছিল ইংরেজরা। পরীবিবির মাজারের সামনে বসানো একটা কামান থেকে অগ্রসরমান ইংরেজদের দিকে গোলা ছুড়া হয়। ইংরেজরা চারদিক থেকেই তাদের ঘিরে ফেলে। উপায়ান্তর ছিল না আর প্রতিরোধের। অস্ত্রের অভাবে আত্মসমর্পণ করেও জীবন দিতে হয়েছিল নৃশংসভাবে। রক্তাক্ত হয় পরীবিবির স্মৃতিসৌধ। অনেক সিপাহির লাশ ফেলে দেয়া হয় দূর্গের পশ্চিম দিকের পুকুরে। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয় অনেককে। গ্রেফতার কুড়ি জন সিপাহির মধ্যে এগারজনকে (সুবেদারর পত্নীসহ) দেয়া হল ফাঁসি ও বাকিদের যাবজ্জীবন কারাদন্ড। গ্রেফতারকৃত সিপাহিদের ফাঁসি দেয়া হয় বর্তমান বাহাদুর শাহ্ পার্কে, যা তখন পরিচিত ছিল আন্টাঘর ময়দান নামে। দাফন করা হয়েছিল সলিমুল্লাহ এতিমখানার দক্ষিণে, যে এলাকা এক সময় পরিচিত ছিল ‘গোরে শহীদ মহল্লা’ নামে। সরকারি তথ্য মতে, লালবাগের সংঘর্ষে নিহত হন একচল্লিশ জন সিপাহি ও তিনজন ইংরেজ নৌসেনা। সংঘর্ষের সময় অনেক সিপাহি কেল্লা ছেড়ে পালিয়েছিল জলপাইগুড়ির দিকে আবার তিনজন পালাবার সময় বুড়িগঙ্গা নদীতে ডুবে মারা যায়। দেশী সিপাহিরা এ ধরণের একটা কিছু ঘটতে পারে বলে হয়তো প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু এত শীঘ্রই ঘটবে তা হয়তো ভাবেননি। ইংরেজদের বিনা প্ররোচনা, অতি আতন্কের কারণে দূর্গ আক্রমন। 

স্থানীয় ইংরেজি পত্রিকা ঢাকা নিউজে সব খবর ছাপা হল বেশ ফলাও করে।

‘বৃহস্পতিবার সকালে ঠিক সাতটায় চারজন বিদ্রোহী, যাদের ধরা হয়েছিল রোববার অপরাহ্ণে এবং জজ কোম্বি যাদের মৃত্যুদন্ডাদেশ দিয়েছিলেন, তাদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল গির্জার উল্টোদিকে ফাঁকা জায়গায় তৈরী ফাঁসিকাষ্ঠে। ফাঁসির মঞ্চের ডানদিকে ছিল নাবিকরা, সামনের দিকে স্বেচ্ছাসেবী পদাতিক ও অশ্বারোহী বাহিনী। তিনজন বিদ্রোহী নিজেরাই গলায় দড়ি ঝুলিয়ে মৃত্যুবরন করলেন সাহসের সঙ্গে। চতুর্থ জন ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। তাকে ঝোলাবার জন্য সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছিল। তাদের আহত বন্ধুদের হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল এ দৃশ্য দেখার জন্য। যারা ছিল বিশ্বস্ত, তারাও ছিল সেখানে, পুরো ব্যাপারটা সম্পন্ন হয়েছিল ‘উইথ দি আটমোস্টস ডিসেন্সি এন্ড ইন কমপ্লিট সাইলেন্স’। আরেকজন সিপাহিকে মঙ্গলবার সকাল সোয়া সাতটায় গির্জার উল্টোদিকে ঝোলানো হল, সব কিছু আগের মতোই সুন্দর এবং স্বাভাবিকভাবে।

বিচারের বর্ণনায় ব্রেনাল্ড বলেন, ‘এটাই ছিল ভবিতব্য। এ ধরনের উদাহরণ সাধারন মানুষের উপর সৃষ্টি করবে চমৎকার প্রতিক্রিয়া। এখন নেটিভরা যেমন ভদ্র, আগে মনে হয় না তাদের এমনটি দেখেছি।’

ঐ সময় ইংরেজদের সাহায্য করেছিল জমিদাররা, সেকথা বলতে ভুলেননি ঢাকা বিভাগের কমিশনার। তিনি জানিয়েছিলেন, শিবজয় উজির, মনোহর, রাজকিষাণ রায়, মাহমুদ গাজি, আসাদ আলি মৌলবি এবং যশোধর কুমার পাইন তাকে প্রচুর সাহায্য করেছিলেন আর বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল জমিদার গনি মিয়ার কথা। পরবর্তীকালে যিনি এ কারনে পেয়েছিলেন নবাব খেতাব! মোটা অন্কের অর্থ, হাতি, ঘোড়া, নৌকা সবই দিয়ে প্রশাসনকে সাহায্য করেছিলেন গনি মিয়া। শুধু কি তাই? মধ্যশ্রেনীর একাংশ সমর্থন করেছিল ইংরেজদের। অনেক ঢাকার ভদ্রলোকেরা বেশ উল্লসিত হয়েছিলেন। তবে ঢাকার মূল অংশের সব মানুষ ছিলেন নীরব আর চলমান নাটকের দর্শকমাত্র।

১৮৫৭ সিপাহি বিদ্রোহে ঢাকার নানান গল্প প্রচলিত রয়েছিল এই শহরের বাসিন্দাদের কাছে। সেসব কাহিনী আরেকটি মঙ্গলপান্ডে থেকেও চিত্রনাট্যে শ্রেয় হতে পারে। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ তাৎক্ষনিক নাহলেও পরবর্তী সময়ে জন্য সৃষ্টি করেছিল কিছু প্রতীকী মূল্যবোধের। সেসব কি এ গল্পের বাইরে?

তথ্যসূত্র:

  1. dacca news, dacca, march-december 1857. 
  2. reminiscences of dacca, majumdar hridaynath, calcutta,1885.
  3. সিপাহি যুদ্ধ ও বাংলাদেশ,রতনলাল চক্রবর্তী, ঢাকা-১৯৮৪
Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button