মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

কাবিন, দেনমোহর- ইসলাম কী বলে?

আমি জীবনেও ভাবিনি কখনও দেনমোহর নিয়ে আমাকে লিখতে হবে। মুসলিমদের জন্য এটি কমন “নলেজ” হবার কথা, এবং আমাদের দেশে ৯০% এরও বেশি মানুষ যেখানে মুসলিম, সেখানে সেই জনসংখ্যার ৯০% এরও বেশি লোকের কাবিন সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা না থাকাটা অত্যন্ত হতাশাজনক।

ইসলামিক তরিকায় বিয়ে করতে হলে আগে দেনমোহর, তালাক, স্বামী-স্ত্রীর কর্তব্য ইত্যাদি সম্পর্কে ভালভাবে জ্ঞান নিয়ে তবেই বিয়ে করা উচিৎ। ব্যাপারটা সহজ, আপনি বন্দুক কেনার আগে বন্দুকের লাইসেন্স নেয়ার মতন ঘটনা। ভুল সময়ে ভুল জায়গায় ট্রিগার টানলে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে।

আমাদের দেশে “বিয়ের লাইসেন্সের” প্রচলন করা সময়ের দাবি। শুধু যে বাল্যবিবাহই বন্ধ করবে সেটি তা নয়, এইসব বিষয়েও লোককে শিক্ষিত হতে বাধ্য করবে। নাহলে সমাজে প্রচন্ড বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে, যা কিছুদিন আগেই এক চিকিৎসকের আত্মহত্যার ঘটনার সময়ে আমরা দেখেছি।

বরাবরের মতই উদাহরণ দিয়ে শুরু করে মূল কথায় আসছি, তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে।

একটি পোস্ট কিছুদিন আগে ফেসবুকে দেখেছিলাম। এক মহিলা তাঁর হবু স্বামীর কাছে দেনমোহর হিসেবে কুরআনের একটি নির্দিষ্ট সূরা মুখস্ত করতে বললো। তাতেই নাকি তাঁর মোহর আদায় হয়ে যাবে। ভদ্রলোক দিন রাত এক করে মুখস্ত করে ভদ্রমহিলাকে শুনালেন, তিনি সন্তুষ্ট হলেন, এবং বিয়ের মত দিলেন। তাঁর মাও নাকি নিজের বিয়ের সময়ে তাঁর বাবাকে এইরকম একটি নির্দিষ্ট সূরা মোহর হিসেবে নিয়েছিলেন। তিনি চান, তাঁর কন্যাও একই কাজ করুক।

“সুবহানাল্লাহ” “মাশাল্লাহ” “আমিন” বলতে বলতে লোকে পোস্টটাকে ভাইরাল করে দিল। ঘটনাটা মাথায় রাখুন। শীঘ্রই ফিরে আসছি। আগে আমি আরেকটা ঘটনা বলি। এবং অবশ্যই, আমার প্রিয় নবীজির (সঃ) জীবনী থেকেই।

বদর যুদ্ধের দুই মাস পরে হজরত আলী(রাঃ) যখন রাসূলুল্লাহর (সাঃ) কাছে ফাতিমার (রাঃ) হাত চাইলেন, তখন রাসূলুল্লাহ ফাতিমার (রাঃ) মত জিজ্ঞেস করলেন। যখন বুঝতে পারলেন তাঁর কন্যার মত আছে, তখন তিনি আলীর (রাঃ) কাছে জানতে চাইলেন, “মোহর হিসেবে তুমি কী দিতে পারো?”

আলীর (রাঃ) জবাব শোনার আগে একটি পয়েন্ট কি লক্ষ্য করেছেন? ফাতিমার (রাঃ) মতামত জিজ্ঞেস করেছিলেন স্বয়ং রাসূলাল্লাহ(সঃ)। আমাদের দেশে কিছুদিন আগেও পিতা মাতারা এই কাজটা করতেন? “ধর ছাগল পাতা খাও”- নিয়ম মেনে চলে যাকে তাকে ধরে এনে কন্যার বিয়ে দিয়ে দিতেন। কন্যা দ্বিমত করলে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলতো চলতোই- ক্ষেত্রবিশেষে মারধরও হতো। মেয়ের বিয়েতে মেয়েরই মতামত জিজ্ঞেস করা হতো না। এখনও অনেক অঞ্চলেই, অনেক পরিবারেই এই কাজটা করা হয়ে থাকে। মেয়েকে সারাজীবন ভুল বিয়ের দায়ভার বহন করে বেড়াতে হয়। কোন অন্ধকার যুগে আমরা বাস করছি? 

যাই হোক, রাসূলুল্লাহর (সঃ) প্রশ্ন শুনে আলী (রাঃ) জানালেন তাঁর কিছুই নেই। আলী (রাঃ) সারাজীবনই হতদরিদ্র ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন, “তোমাকে না আমি যুদ্ধ সরঞ্জাম দিয়েছিলাম, সেগুলো কোথায়?” আলী(রাঃ) সাথে সাথে বললেন, “জ্বি, আমার একটি ঘোড়া, একটি তলোয়ার এবং একটি যুদ্ধবর্ম আছে।”

রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেন, “তোমার ঘোড়ার প্রয়োজন আছে, তলোয়ার ছাড়া তোমার চলবে না – এবং যুদ্ধবর্মের প্রশ্ন উঠলে তুমি ওটা বিক্রি করে দিতে পারো।” আলী (রাঃ) বাজারে গিয়ে যুদ্ধবর্ম বিক্রি করলেন। এক সাহাবী জানতেন তিনি বিয়ের জন্য সেই বর্ম বিক্রি করছেন। তাই উচ্চমূল্যে সেটি কিনে নেন ভাইকে সাহায্য করার জন্য। যদিও টাকার পরিমান এমনও ছিল না যে মানুষের চোখ কপালে উঠে যাবে।  আলী (রাঃ) নগদ টাকা নিয়ে ফিরে এলে নবী (সঃ) বিয়ের আয়োজন করতে বলেন।

এখন উপরের দুই ঘটনা পড়ার পরে যেকোন বুদ্ধিমান পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগবে, যদি কুরআনের একটি আয়াত, একটি সূরা মোহর হিসেবে গৃহীত হয়, তাহলে নবী (সঃ) কেন আলীকে (রাঃ) অতি সামান্য হলেও (নিজের সামর্থানুযায়ী) “নগদ” মোহর আনার শর্ত দিলেন? তিনিতো বলতেই পারতেন, “ঠিক আছে আলী(রাঃ), তুমি সূরা ইয়াসিন মুখস্ত করে আসো (বা অন্য যেকোন সূরা) – আমার মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দেব।”

তার মানে কী?

জ্বি, ঠিকই ধরেছেন, বাংলাদেশের যেসব মানুষ আহ্লাদীপনা করে বলে যে কুরআনের একটি আয়াতও মোহর হিসেবে দেয়া যায়, অথবা মোহর না দিলেও চলে অথবা ব্লা ব্লা ব্লা – এইসব ফালতু নিয়ম ইসলামে নেই।

আল্লাহ স্পষ্ট করে কুরআনে বিধান করে দিয়েছেন, বিয়ে করতে হলে অবশ্যই স্ত্রীকে তাঁর হক বুঝিয়ে দিতে হবে। প্রাইমারি হক হচ্ছে এই মোহর প্রদান। শর্ত হচ্ছে বিয়ের প্রথম রাতে প্রবেশ করার আগেই স্ত্রীর দেনা শোধ করতে হবে। “যদি এবং কেবল যদি” স্ত্রী অনুমতি দেন তাঁর স্বামীকে টাকা পরে পরিশোধের, তবেই কেবল সেই ব্যক্তি বাসর ঘরে প্রবেশ করতে পারবে, নাহলে নয়। রেফারেন্স লাগবে? বাড়ির সেল্ফ থেকে কুরআন খুলে প্রথমেই চার নম্বর সূরা “আন নিসা” খুলে পড়তে শুরু করুন, “আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও খুশীমনে। তারা যদি খুশী হয়ে তা থেকে অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ কর।” (কুরআন ৪:৪)

চব্বিশ পঁচিশতম আয়াতে গিয়ে আল্লাহ আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, “…..এদেরকে ছাড়া (মা, বোন, দাদি, নানী, চাচী, খালা প্রমুখ) তোমাদের জন্যে সব নারী হালাল করা হয়েছে, শর্ত এই যে, তোমরা তাদেরকে স্বীয় অর্থের বিনিময়ে তলব করবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য-ব্যভিচারের জন্য নয়।…..”

“আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি স্বাধীন মুসলমান নারীকে বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে না, সে তোমাদের অধিকারভুক্ত মুসলিম ক্রীতদাসীদেরকে বিয়ে করবে। আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে ভালোভাবে জ্ঞাত রয়েছেন। তোমরা পরস্পর এক, অতএব, তাদেরকে তাদের মালিকের অনুমতিক্রমে বিয়ে কর এবং নিয়ম অনুযায়ী তাদেরকে মোহরানা প্রদান কর এমতাবস্থায় যে, তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে-ব্যভিচারিণী কিংবা উপ-পতি গ্রহণকারিণী হবে না।” (এছাড়াও আরও অনেক সূরায় বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ মোহর আদায়ের কথা বলেছেন। ৫:৫, ৩৩:৫০, ৬০:১০ ইত্যাদি)

ভাল করে লক্ষ্য করুন, আল্লাহ স্পষ্ট করে বলছেন, সামর্থ্যে না থাকলে বড় লোকের মেয়ে বিয়ে না করে ক্রীতদাসী বিয়ে করো – তবুও দেনমোহর দাও। এবং নিজের সামর্থ্যের বাইরে যেও না।

খুবই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট।

আপনি যদি সামর্থ্য না রাখেন বড়লোকের কন্যা বিয়ে করার, তাহলে সমাজের লোকের সামনে নিজের কলার উঁচু করার জন্য নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে, ব্যাংক থেকে “ওয়েডিং লোন” নিয়ে, “সেনাকুঞ্জ” “হোটেল সোনারগাঁও” বা এই জাতীয় মহাদামি কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে নিজের পায়ে কুড়াল মারবেন না। 

ইদানিং দেশে এই ফাজলামিটাই চালু হয়েছে। বিয়েতে প্রথমেই আমরা জানতে চাইছি মোহর কত? যদি কেউ বলে দশ লাখ টাকার নিচে, তখনই মুখ বাঁকিয়ে বলছি, “ফকিরনির ঘরে বিয়ে দিচ্ছেন নাকি? আমার ভাগ্নির বিয়ের দেনমোহর ধার্য্য হয়েছে পঁচিশ লাখ।” পাশের থেকে আরেক ফাজিল বলে উঠবে, “আমার বোনের মেয়ের কাবিন হয়েছে এক কোটি টাকায়।” তারপরে আরেকজন ইনিয়ে বিনিয়ে বলবেন, “আজকের যুগে কেউ দশ লাখ টাকায় কাবিন করে?”

শুরু হয়ে যায় নতুন ফাজলামি। মেয়েপক্ষ “সমাজের” কাছে মুখ রক্ষার্থে ছেলে পক্ষ্যকে চাপ দেয় কাবিন বাড়াতে। ছেলেপক্ষ এই শর্তে রাজি হয় যে আপাতত উসুল এক দুই লাখ টাকা, এবং বাকিটা তোলা থাকবে। বিয়ে হয়ে যায়, এবং ঝামেলা বাঁধে তখন যখন তালাকের প্রশ্ন আসে। পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা শোধ করে তালাক নেয়ার সামর্থ্য তো নাই। কী করা যায়? হয় স্ত্রীর দুষ্টামি মেনে নাও, না হয় আত্মহত্যা করো।

বিয়েরও আগে আমাদের চিন্তা করতে হবে তালাকের ব্যাপারে। যেকোন কাজ শুরু করার আগে আপনি নেগেটিভ ফল সম্পর্কে চিন্তাভাবনা না করলে সেটার জন্য প্রস্তুতি নিবেন কিভাবে? ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কেউই জানেনা, কাজেই যত প্রস্তুত থাকবেন তত ভাল। ভাল রেজাল্ট আসলে কোনই সমস্যা নাই, আর খারাপ ফল আসলে পূর্ব প্রস্তুতি তখন কাজে লাগবে।

এইটা যে বুদ্ধিমান মানুষেরই করা উচিৎ। এই ঘটনায় কিছু অনলাইন চটি পত্রিকার সংবাদ শিরোনাম করে, “পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার টার্গেট ছিল মেয়েটির।”

চটি পত্রিকার রিপোর্টারকে কানে ধরে চটকানা দিয়ে বুঝানো উচিৎ যে এখানে হাতিয়ে নেয়ার কিছু নেই। মোহরের টাকা মেয়েটির নিজের অধিকারের টাকা। এতদিন উসুল না করে সে বরং ছেলেটিকে দয়া দেখিয়েছে। এখানে বরং মেয়েটি হিরো ছিল, ভিলেন নয়। কিন্তু বাঙালি জনতা সেটা বুঝলে তো! গালাগালি করে ভরিয়ে দিয়েছিল ফেসবুক।

যাই হোক, উপরের বাস্তব ঘটনা, কুরআনের আয়াত এবং হাদিসের রেফারেন্স থেকে আমরা নিশ্চই বুঝতে পারছি যে অতিরিক্ত দেনমোহর নিয়ে ফাজলামি আমাদের সামাজিক একটি রীতি। আবার “একটি আয়াত, একটি সূরা, কিংবা ঈমান/হজ্জ্ব/রোজা ইত্যাদিও দেনমোহর হতে পারে” জাতীয় উৎকট কথাবার্তাও সামাজিক ফাজলামি থেকেই সৃষ্টি। ইসলামের সাথে এরও কোন সম্পর্ক নেই। একজন মুসলিমের আপনাতেই দায়িত্ব কুরআনের আয়াত মুখস্ত করা, আল্লাহর উপর ঈমান আনা, সামর্থ্য হলে হজ্জ্ব করা ইত্যাদি। কেউ বাংলা সিনেমা স্টাইলে বলতে পারেন, “আমাকে ভালবেসো, তাহলেই আমার মোহর আদায় হয়ে যাবে।” – এইসব কথাবার্তাও ফালতু। মুসলিম স্বামীর এমনিতেই অবশ্য কর্তব্য স্ত্রীকে ভালবাসা। কোন নারীর বিয়ের “শর্ত” এইসব হতে পারে না। মোহরে অবশ্যই ম্যাটেরিয়াল মূল্য থাকতে হবে।

ইসলাম নারীর অধিকারের জন্য মোহরের ব্যবস্থা রেখেছে। এবং ইসলাম এর ক্ষেত্রে নিচের কয়েকটি শর্ত আরোপ করে।

১. বিয়ের পূর্ব-শর্ত দেনমোহর। কোন এক্সকিউজ নেই, এক্সেপশনও নেই। মোহরের টাকা না থাকলে বিয়ে করতে পারবে না। ফকিরিগিরি কর গিয়ে। 
২. স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে মোহর প্রদান করতেই হবে। আবারও কোন এক্সকিউজ, এক্সেপশন নেই। 
৩. অবশ্যই ন্যায়সংগত হতে হবে। সামর্থ্যের বাইরে কাউকেই জোর জবরদস্তি করা যাবেনা। আমার সামর্থ্য এক দুই লাখের, আমাকে সেই অনুযায়ীই মোহর দিতে হবে। “লোকে কী বলবে” ভাবলে আমার বিয়ে করার দরকার নেই। 
৪. কেবলমাত্র স্বামী এবং স্ত্রী “উভয়ে মিলে” যাবতীয় অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে পারবেন। তৃতীয় পক্ষের নাক গলানোর কিছু নেই। স্বামীর সামর্থ্য, আয়, নিয়্যত বুঝে স্বামী – স্ত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।

কাবিন, দেনমোহর

কাজেই, কেউ যদি মোহর নিয়ে আহ্লাদী মার্কা পোস্ট আলহামদুলিল্লাহ, সুবহানাল্লাহ ইত্যাদি লিখে পোস্ট করেন, অথবা বিয়ের সময়ে ফাজলামি আচরণ করেন, তখন তাদের মুখের উপর এই লেখার বিষয় বস্তু তুলে ধরতে পারেন।

খুবই আফসোসের সাথে লক্ষ্য করতে হয় এত সহজ এবং এত স্পষ্ট নিয়ম উল্লেখ থাকলেও আমাদের সমাজে এখন দেনমোহর একটি বিভীষিকায় পরিণত হয়েছে। আল্লাহ কুরআনে সূরা আল ইমরানের ১০৩ নম্বর আয়াত শুরু করেছেন এই বলে যে, “আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে (দড়ি, rope) সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর;….”

আমরা তাঁর কথা শুনি না, মানি না বলেই গভীর গর্তে পড়ে যাই। তারপরে অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াই।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button