ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

মেয়র সাঈদ খোকনের পদত্যাগ চাই!

“রোম যখন আগুনে পুড়ছিলো, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলো।”

বহুল ব্যবহৃত ও পরিচিত এক প্রবাদ। এই প্রবাদটা খুব মনে পড়ছে আজকাল। একটা শহরে যখন দূর্যোগ আসে, তখন সেই শহরের দায়িত্বপ্রাপ্ত শাসককে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হয়। যদি শাসক নিজেই দূর্যোগটাকে অনুভব করতে না পারেন, সেই দূর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হু হু করে বেড়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক।

ঢাকা সহ সারাদেশের ডেঙ্গুর মহা বিস্তার প্রসঙ্গে কথা বলছি। ঢাকায় বেশ কিছুদিন ধরে ডেঙ্গু ভীষণভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলছে। হাসপাতালগুলোতে গেলে মন শক্ত রাখা কঠিন হয়ে যায়। মানুষের ভেতর আতংক বিরাজ করছে। রক্তের চাহিদা বেড়ে গেছে। রাতদিন সব একাকার হাসপাতালে৷ ডাক্তাররা সেবা দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন, বিরাম নেই তাদের। ঢাকা থেকে ডেঙ্গুর বিস্তার ধীরে ধীরে ছড়িয়ে গেছে সারা দেশেও।

ডেঙ্গু, সাঈদ খোকন

এই পর্যন্ত ৫০ জনের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে সংবাদমাধ্যমসূত্রে আমরা জানতে পেরেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি হলে হলে, শহরে প্রতি বাড়িতে বাড়িতে প্রতিদিনই কেউ না কেউ আক্রান্ত হচ্ছে নতুন করে৷ মানুষ অসহায় বোধ করতে শুরু করেছে। তারা ভেবেছে, এই সময়ে তারা নগরের কর্তাব্যক্তিদের পাশে পাবে৷ নগরপিতারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিবেন এই দূর্যোগে।

কিন্তু, আমরা আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, দুইজন মেয়রের এই শহরে নগরপিতাদের নির্লজ্জ অবহেলা। বিশেষ করে মেয়র সাঈদ খোকনের কথা না বললেই নয়৷ এই ব্যক্তি শুরু থেকেই ডেঙ্গুর বিস্তারকে একপ্রকার প্রত্যাখ্যান করতে চেয়েছেন। তিনি তার বক্তব্যগুলোতে বোঝাতে চেয়েছেন, চিন্তার কোনো কারণ নেই, পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।

জনগণ ভেবেছিলো, শহরে এমন এক দুঃসময়ে তিনি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন। তিনি ‘দায়িত্ব’ নিয়েছেন বটে। তিনি বলেছেন, “আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, ডেঙ্গু নিয়ে আতংকের কিছু নেই।” তিনি এতো বড় দায়িত্ব কিভাবে নিলেন, তিনিই ভালো জানেন। এডিস মশারা কি তার কানে কানে এসে বলে গেছে, আপনি দায়িত্ব নেন, আমরা আর কাউকে বেশি একটা কামড়াবো না…

শুধু তাই নয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের এই মেয়র সাঈদ খোকন ডেঙ্গুর সাথে ছেলেধরা গুজবের তুলনা দিয়েছেন। তার মতে, ডেঙ্গু নিয়ে যা বলা হচ্ছে বাস্তবতা নাকি ওরকম নয়। লোকে গুজব ছড়াচ্ছে। সংবাদমাধ্যম বলেছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষ তিনলাখ। এটাতে তিনি ব্যাথিত হয়েছেন হয়ত। তিনি বলেন, “ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সাত থেকে দশ হাজারের বেশি হবে না।”

তিনি যখন এই বক্তব্য রাখেন, সেই একই সময়ে শহরে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা এতোটাই বাড়ছে যে অনেকেই সিট পাচ্ছে না। হাসপাতালের ভেতরে তিল ধারণের জায়গারও যেন অভাব। অথচ, তিনি দৈব বাণী দিয়ে বেড়াচ্ছেন। লোকে ডেঙ্গুকে মহামারি বলতে চাইছে। তিনি বলেন, “ডেঙ্গু ভাইরাসের বিস্তার এখনও মহামারি আকার নেয়নি। মহামারির একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা আছে।”

ডেঙ্গু, মেয়র সাঈদ খোকন

সাঈদ খোকনের মহামারির সংজ্ঞা কি এডিস মশারা জানে? তারা বোধহয় জানে না। তাই তারা বাছবিছার না রেখে সবাইকেই কামড়েছে। আওয়ামীলীগ, বিএনপি, ডান বাম বলে কাউকে পার্থক্য করেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফিরোজ মারা গেছেন ডেঙ্গুতে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েরও একজন ছাত্র মারা গেছেন। পুলিশের এসআই মারা গেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের উপসচিবের স্ত্রী মারা গেছেন। একজন সিভিল সার্জন মারা গেছেন। প্রতিদিনই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। কেউই বাদ যাচ্ছে না।

সাঈদ খোকনের কাছে কি এই তথ্যগুলো ছিলো না? কেন স্বাভাবিক সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে এমন একটা ভাব ধরতে চাইলেন তিনি! মানুষ এখন অন্ধকারে বাস করে না। দিন দুনিয়ার সব খবর সে পায়। আপনি এসব মনভোলানো আলাপ করলে মানুষ বিশ্বাস করবে কেন? যার স্বজন মারা যায় যায়, যে ঘরে রোগী আছে, যে হাসপাতালে সিট না পেয়ে মানুষ আরো হতাশায় ডোবে তাদেরকে আপনি আপনার ‘মহামারি’ সংজ্ঞা বোঝালেই তারা বুঝবে!

মানুষ এইসব নির্লজ্জ বক্তব্য শুনতে চায় না নেতার কাছে। মেয়র কোনো জাদুর পরশ নিয়ে সব ঠিক করে দেবেন, এমন আশাও করে না মানুষ। মানুষ চায় আপনি তাদের ব্যাথায় সমব্যাথী হবেন, মর্মবেদনাটা বুঝবেন, উদ্যোগ দিবেন। সমস্যার গায়ে বোরকা লাগিয়ে বুঝাতে আসবেন না, সব ঠিক আছে…

আপনি সেই জায়গায় ব্যর্থ। এডিস মশা আপনার কথা শুনেনি৷ তারা তাদের কাজ করে গেছে। আপনি বা আপনারা মশার ঔষধ ছিটানোর যন্ত্র নিয়ে মাঠে নেমে বোঝাতে চান, সব মশা নির্মুল করবেন। এটা কি আপনার কাজ? আপনার কাজ যেটা ঠিকঠাক করুন না। করতে পেরেছেন? মশার যে ঔষধ ছিটানো হয়, সেটা যে অকার্যকর আপনি এটাও স্বীকার করতে চাননি।

আপনি ক্রমাগত ডেঙ্গু বিস্তারকে ধামাচাপা দিতে চেয়েছেন। কিন্তু সংকট এতো প্রকট হয়ে গেছে যে এখন আর ‘গুজব’ বলে এটাকে চালিয়ে দেয়ার অবস্থা নাই আপনার। আতংকিত হওয়ার কিছু নেই বলে সমস্যাকে আর বোরকা দিয়ে ঢেকে রাখা আপনার পক্ষে সম্ভব না। তাই, চ্যানেল আই সাংবাদিক যখন আপনাকে জিজ্ঞেস করলো, আপনি এখন এসে বলতে বাধ্য হচ্ছেন, পরিস্থিতি ক্রমেই জটিলতর হচ্ছে! এখন আপনি স্বীকার না করে পারছেন না, দিন যত বাড়ছে পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে।

চাপের মুখে সংকটের কথা বললেও এই অবনতির পেছনে কার দায়? এই প্রশ্নে আপনি আবার খোলসে ঢুকে গেলেন। কাউকে দায় দিতে নারাজ আপনি। নিজে তো কখনো দায় নেবেন না, এটা আপনার কথাবার্তার ধারাবাহিকতা দেখেই বোঝা যায়।

সাঈদ খোকন

এখন এসে আপনি বলছেন, জনগণকে সাথে নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবেন। অথচ, জনগণ যে সংকটে এটাই এতোদিন স্বীকার করেননি আপনি। আপনি গুজব বলেও পরিস্থিতির গুরুত্বকে হালকা করে দেখেছেন। আবার বলছেন, কাউকে দায় দিতে চান না। কাউকে দায় দিতে হবে কেন? নিজের ভুলটা স্বীকার করা যায় না?

মেয়র আনিসুল হকের কথা এই প্রসঙ্গে একটু বলা যায়। শহরে তিনি মেয়র, তখন চিকুনগুনিয়ার বিস্তার হলো খুব। পরিস্থিতি তখনো জটিল ছিল। সেই সময়ে আনিসুল হক মানুষের সচেতনতা জরুরি এটা বোঝাতে বলে ফেলেছিলেন, “আপনার ঘরের ভেতরে গিয়ে আমি মশারি টানাতে পারব না। আপনার চৌবাচ্চায় আমি ওষুধ লাগাতে পারব না। আপনার ঘরের ভেতর সামান্য স্বচ্ছ পানিতে যে মশা জন্মাচ্ছে, সেটা আমি মারতে পারব না।”

সেই সময়ে আনিসুল হক ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। তাকে নিয়ে ট্রল হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় ওঠে। সেই বক্তব্যের একদিন পরই তিনি ঠিকই ক্ষমা চেয়েছিলেন সবার কাছে। তিনি এটাও জানিয়েছিলেন, সমস্যা নিরসনে যা করার দরকার সব করবেন। এই তথ্যও দিয়েছেন যে, কর্তব্যে অবহেলা করার কারণে দুই বছরে তার সময়ে ১০৯ জনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, যা গত ১৫ বছরেও ঘটেনি।

এটাই একজন ভাল শাসক এবং মন্দ শাসকের পার্থক্য। আনিসুল হক তার মেয়র জীবনে হাস্যকর পাতলা কথা, দায়সারা কথা বলেছেন খুব কমই। কথার চেয়ে কাজটা বেশি করতেন। এইজন্যে তাকে গলাবাজি করতে হতো না৷ সবাই ঠিকই বুঝে নিয়েছে, আনিসুল হক কোন মাপের মানুষ। তবুও তিনি তো দেবতা নন, রক্তে মাংসে গড়া একজন। ভুল হতেই পারে। মিসকমিউনিকেশনও হতেই পারে। এটা স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার যে সৎ সাহস সেটা ছিল বলেই, আনিসুল হক স্মরণীয় হয়েছেন।

সাঈদ খোকন আপনিও একজন মেয়র। শহরের এই সময়ে একের পর এক ফালতু বক্তব্য আপনি দিয়ে গেছেন। সমস্যাকে অবহেলা করেছেন। দায় স্বীকারের ধারে কাছে আপনি নেই। আপনি সমস্যাকে ‘গুজব’ তুলনা দিতেও দ্বিধা করেননি। সেই আপনি যখন বুঝতে পারলেন, পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে তখন সাংবাদিক আপনাকে জিজ্ঞাসা করলো, আপনি ক্ষমা চাইবেন জাতির কাছে? এই নগরের মানুষের কাছে? আপনার কি ফিল হয়, ক্ষমা চাওয়া উচিত?

আপনি কি জবাব দিলেন?! আপনি বললেন, আপনি মনে করেন না, নগর কর্তৃপক্ষ কোনো ভুল করেছে। আপনি মনে করেন না, আপনারা ভুল পথে আছেন!

সাঈদ খোকন

এর পরে আর কিছুই বলার থাকে না। কেন একজন প্র‍য়াত মেয়রকে মানুষ বার বার স্মরণ করে, আর জীবিত মেয়র থাকতেও মানুষ নিজেদের অভিভাবকহীন ভাবে – তার কারণ কি কখনো ভেবেছেন? আপনি কি ফিল করেন, আপনি নৈতিকভাবে এখনো যোগ্য এই নগরপিতার আসনে থাকার জন্যে? আমরা সাধারণ মানুষ সেটা আর ভাবতে পারছি না। আমাদের কাছেই লজ্জা লাগে। আমাদের নিজেদেরকে বড় হতভাগা মনে হয়। আপনার ক্ষমা চাইতে হবে না। আপনি বরং পদত্যাগ করুন।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button