সিনেমা হলের গলি

লক্ষ্মী আগারওয়াল কিংবা এক অন্যরকম দীপিকা পাড়ুকোনের গল্প!

সকাল সকাল ইনস্ট্যাগ্রাম আর টুইটারে দিপীকা পাড়ুকোনের একাউন্ট থেকে আপলোড করা ছবিটা দেখে চমকে উঠেছেন সবাই! গালের একপাশ ক্ষতবিক্ষত, অ্যাসিডের আঘাতে পুড়ে যাওয়া চামড়া; মানবসৃষ্ট বিভৎসতার ভয়াবহ এক নমুনা যেন! এরমধ্যেও দৃষ্টি কেড়ে নেয় মায়াবী চোখজোড়া- ছবির মানুষটা যে দীপিকা পাড়ুকোন, সেটা বুঝতে কোন সমস্যা হয়নি। তার পরবর্তী সিনেমাটা কি নিয়ে, সেই তথ্য যাদের জানা ছিল, তারা ভিরমি না খেলেও, অবাক হয়েছেন যথেষ্টই!

রাজী সিনেমার জন্যে ফিল্মফেয়ারে সেরা পরিচালকের পুরস্কার বিজয়ী পরিচালক মেঘনা গুলজার অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার লক্ষী আগারওয়ালের জীবন কাহিনী অবলম্বনে বানাচ্ছেন নতুন সিনেমা, আর সেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করছেন দীপিকা পাড়ুকোন। অ্যাসিড আক্রান্ত নারী হিসেবে নিজেকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার জন্যেই এই বেশভূষা নেয়া। সিনেমার ফার্স্টলুক হিসেবেই আজ মুক্তি দেয়া হলো এই স্থিরচিত্রটা। দপিকার চরিত্রের নাম মালতী, ইনস্ট্যাগ্রামে ছবিটা শেয়ার দিয়ে দীপিকা লিখেছেন- ‘এমন একটি চরিত্র, যা আমার সঙ্গে সারাজীবন থাকবে…মালতী।’ ‘ছপাক’ শিরোনামের এই সিনেমাতে অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক হিসেবেও থাকছেন দীপিকা।

পাঠক, আপনাদের নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে, কে এই লক্ষী আগারওয়াল? কি এমন করেছিলেন তিনি, বা কি ঘটেছিল তার সঙ্গে, যে মেঘনা গুলজার বা দীপিকা তাকে নিয়ে সিনেমা বানাতে বসলেন?

লক্ষী আগারওয়ালের জন্ম হয়েছিল দিল্লীর এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। বয়স যখন বছর পনেরো, তখন নাইম খান নামের এক লোক তার বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। স্বাভাবিকভাবেই, সেটা প্রত্যাখ্যান করে লক্ষীর পরিবার, কারণ তারা হিন্দু। লক্ষী নিজেও সেই লোককে পছন্দ করতো না, নাইম খানের বয়সও ছিল তার দ্বিগুনেরও বেশি! প্রত্যাখ্যাত হবার পরে লোকটা আরও বেশি করে বিরক্ত করা শুরু করে লক্ষীকে, পুলিশে অভিযোগ জানিয়েও নিস্তার পাওয়া যাচ্ছিল না তার হাত থেকে।

লক্ষী তখন স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি দিল্লির খান মার্কেটে একটা বইয়ের দোকানে সহকারী হিসেবে কাজ করতো। ২০০৫ সালের কথা বলছি। এক সকালে বাসা থেকে হেঁটে খান মার্কেটের দিকে যাচ্ছিল লক্ষী, দোকানের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে, এমন সময় রাস্তার উল্টোপাশ থেকে নাইম খানকে আসতে দেখলো সে। অন্যদিকে তাকিয়ে হেঁটে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলো লক্ষী, কিন্ত সে জানতো না, নাইম সেদিন খালি হাতে আসেনি। ছোট একটা বিয়ারের বোতলকে নিজের দিকে উড়ে আসতে দেখলো লক্ষী, হাত বাড়িয়ে সেটা ঠেকানোর চেষ্টা করলো সে।

লক্ষী আগারওয়াল এবং তার মেয়ে পিহু

তারপরে কয়েকটা মূহুর্তে যেন নরক নেমে এলো কিশোরী লক্ষীর ওপরে। বিয়ারের বোতলটা ছিল অ্যাসিডভর্তি, সেই তরলটা আঘাত করলো লক্ষীর মুখে, হাতে। রাস্তায় গড়িয়ে পড়ে চিৎকার করতে থাকলো মেয়েটা, আশেপাশের মানুষগুলো তখন হতভম্ভ হয়ে তাকে দেখছে! প্রায় মিনিট পাঁচেক পরে এক ট্যাক্সিওয়ালা পাঁজাকোলা করে তাকে গাড়িতে ওঠালো, নিয়ে গেল হাসপাতালে। যমে মানুষে টানাটানি শুরু হলো, ডাক্তারদের হার না মানা মানসিকতা লক্ষীকে ফিরিয়ে আনলো মৃত্যুর মুখ থেকে। তবে সুন্দর মুখটাতে চিরদিনের জন্যে একটা দাগ বসে গেল তার।

লক্ষীর কেবিনে কোন আয়না রাখা হয়নি, বদলে যাওয়া চেহারাটা দেখে যদি সেই ধাক্কাটা সইতে না পারে কিশোরি মেয়েটা- এই ভয়ে। একজন নার্স সকালে একটা গামলায় পানি নিয়ে আসতো লক্ষীর মুখ পরিস্কার করে দিতে- সেই পানির দিকে তাকিয়ে ব্যান্ডেজে ঢাকা বিকৃত চেহারাটার প্রতিচ্ছবি দেখে আঁতকে উঠতো লক্ষী। গায়ে অ্যাসিড পড়ার সেই মূহুর্তটার কথা পরে বলেছিল লক্ষী- ‘মনে হচ্ছিল, কেউ বুঝি আমার গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে! এত কষ্ট, এত যন্ত্রণা এর আগে কখনও পাইনি আমি। আমার হাত আর মুখ তখন শরীর থেকে আলাদা করে ফেললেও বোধহয় এতটা ব্যাথা পেতাম না আমি!

লক্ষ্মী আগারওয়াল- অ্যাসিডদগ্ধ হবার আগে ও পরে

লক্ষীর গল্পটা এখানে শেষ হয়ে যেতে পারতো। ভারত বা বাংলাদেশের হাজার হাজার অ্যাসিডদগ্ধ নারী যেভাবে বাকিটা জীবন ঘোমটার আড়ালে মুখ ঢেকে কাটিয়ে দেয়, লক্ষীও সেভাবে জীবন কাটাতে পারতো। কিন্ত লক্ষী ঠিক করলো, এভাবে নয়, সে বাঁচবে বাঁচার মতো করে, কারো করুণার পাত্রী হয়ে নয়। ২০০৬ সালে হাইকোর্টে একটা পিআইএল দাখিল করলো সে, বেআইনীভাবে খোলা বাজারে এসিড বিক্রি বন্ধের দাবীতে। ২০১৩ সালে আদালত রায় দিলো, কোম্পানীর লাইসেন্স ছাড়া অ্যাসিড কেনাবেচা করা যাবে না, পুরো ব্যাপারটাতে সরকারের নজরদারী থাকতে হবে।

এর মাঝের সময়টাতে নিজের পড়ালেখা শেষ করেছেন লক্ষী, একটা এনজিও খুলেছেন অ্যাসিডদগ্ধ নারীদের সাহায্য করার জন্যে। ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে সতর্ক করেছেন, পথসভা করেছেন। ইন্টারনেট যখন সহজলভ্য হলো, তখন অনলাইন পিটিশন চালিয়েছেন, এরও আগে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষের স্বাক্ষর নিয়েছেন পিটিশনের জন্যে অ্যাসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করিয়েছেন তরুণদের। ভারতে অ্যাসিডের আগহাতে ঝলসে যাওয়া নারীদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন তিনি।

সাবেক মার্কিন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা লক্ষীকে পুরস্কৃত করেছেন তার সাহসিকতা এবং পরিশ্রমের জন্যে, বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আরও অনেক পুরস্কার পেয়েছেন লক্ষী, ভারত সরকারও যথাসাধ্য সাহায্য করেছে তাকে। লক্ষীর ওপরে যে লোক অ্যাসিড হামলা করেছিল, আদালতে বিচার হয়েছে তারও। অ্যাসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়েই পরিচয় হয়েছিল অলোক নামের এক তরুণের সঙ্গে, বন্ধুত্ব থেকে বিয়ে পর্যন্ত গড়িয়েছিল সম্পর্কটা, কিছুদিন আগে তারা আলাদাও হয়ে গিয়েছেন।

মেঘনা গুলজার এবং দীপিকা পাড়ুকোন

এক কন্যাসন্তানের জননী লক্ষী তখন বেশ খানিকটা বেকায়দায় পড়েছিলেন, কারণ উপার্জন করার মতো কোন চাকুরি ছিল না তার। অনেকেই তাকে চাকুরি দিতে চেয়েছেন, কিন্ত লক্ষীর আত্মসম্মানবোধ টনটনে, কারো করুণার পাত্রী হবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও তার ছিল না। লক্ষী বলেছিলেন, যদি সরকার থেকে তাকে কোন চাকুরির প্রস্তাব দেয়া হয়, তাহলেই তিনি ভেবে দেখবেন। পরে একটা টিভি চ্যানেলের উপস্থাপিকা হিসেবে যোগ দিয়েছেন তিনি।

লক্ষী আগারওয়ালের জীবনটা সিনেমার চেয়েও বেশি নাটকীয়, সেখানে সুখের চেয়ে কষ্টটা বেশি, জীবনের পথটা সেখানে ভীষণ কণ্টকাকীর্ণ। সেই জীবনটাকেই এবার সিনেমায় ফুটিয়ে তুলতে চলেছেন দীপিকা পাড়ুকোন, ক্যামেরার পেছনে তো মেঘনা গুলজার আছেনই! দুই মেধাবী নারী মিলে ভক্তদের জন্যে কি উপহার নিয়ে আসেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ২০২০ সালের ১০ই জানুয়ারী মুক্তি পাবে ‘ছপাক’। দীপিকার আজকের ছবিটাই বলে দিচ্ছে, সিনেমা নিয়ে আগ্রহী হবার উপাদান যথেষ্টই আছে ‘ছপাক’-এ!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button