ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

মেজবান উৎসব; গরুর গায়ে ‘আমাকে জবাই করা হবে’ ব্যানার-মানুষ আসলেই ‘সেরা’ জীব!

মানুষের নৃশংসতার উদাহরণ দিয়ে শেষ হবে না। এই লেখা যখন লিখছি, তখন আরো একটা খবর পেলাম, লালমনিরহাটে ধান খাওয়ার অপরাধে বিষ দিয়ে ৫৭ পাখিকে হত্যা করেছে এক চাতাল মালিক। পশু পাখি হত্যাকাণ্ড সামান্য ঘটনাই আসলে এই যুগে, যখন মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠছে। প্রকাশ্য দিবালোকে গণপিটুনি দিয়ে একজনকে মেরে ফেলছে, পিটুনি উৎসবে শামিল হওয়া অনেকে জানেও না কেন মারছে, শুধু মারতে ভালো লাগছে বলে মারছে।

লালমনিরহাটের পাখি হত্যা
লালমনিরহাটে ধান খাওয়ায় ৫৭ পাখি হত্যা!

হিংস্রতা বোধহয় মানুষের আজকাল প্রধানতম বিনোদন হয়ে উঠেছে। বরগুনার রিফাত হত্যা বলি, কিংবা তারও বেশ কিছু বছর আগে বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড বলি- কি আশ্চর্য রকমে একটা মানুষকে মারা যায়। কোনো বাঁধা নেই। কোনো বিকার নেই কারো মধ্যে। আমি যেখানে থাকি, সেখানেও এরকম একজনকে চিনতাম, যাকে তার বন্ধুরাই কুপিয়ে খুন করেছে। যাকে মারা হয়েছিল সে বিবাহ করেছিল অল্প বছর আগে এবং তার একটি বাচ্চাও ছিল। বাচ্চাটা এতিম হয়ে গেল কি অদ্ভুতভাবে!

কাজেই, মানুষের হিংস্রতার বর্ণনা দিতে গেলে আমরা সবাই এখন নিজেদের জীবন থেকেও হাজারটা গল্প বলতে পারব। আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি কিভাবে সমাজে হিংস্রতা ছোঁয়াচে আকার ধারণ করছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মানুষ বড় ভয় পাই। কারণ, মানুষ খুব সামান্য কারণে এবং সামান্য সময়ের ব্যবধানেও ভয়ংকর বদলে যেতে পারে। মানুষের মধ্যে একটা অবশ হওয়ার প্রবণতা আছে। যখন সে ক্ষুব্ধ হয়, হিংস্র হয়- তখন তার বিবেক মানবিকতা এসব অনুভূতি অবশ হয়ে যায়। এজন্যে আজকাল পত্রিকায় ছেলে বাবাকে খুন করছে, মা সন্তানকে মেরে ফেলছে এসব খবরও খুব অচেনা নয় আমাদের কাছে।

যাহোক, এক প্রসঙ্গে বলতে এসে কত কথা বলে ফেললাম। বলতে এসেছি একটা গরুর কথা। গো-মাংস অনেকের প্রিয়। আমরা গরু কোরবানিও দিয়ে থাকি যারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। প্রাণীজ মাংস আসলে আমাদের খাবারের একটা উৎস। তাই, যেসব প্রাণীর আমরা মাংস খাই, তাদের নিয়ে কথা বলার বিপদ আছে। একদল মহাপন্ডিত সৃষ্টির সেরা জীব এসে বলবে, এতো যখন দরদ তখন খাও ক্যা!

গরু গৃহপালিত পশু। আমাদের গ্রামে দাদা গরু পালতেন। ছোটবেলায় গ্রানে যখন ছিলাম, তখন গরুর দেখভাল করার কাজে দাদা যে দরদী ছিলেন তা দেখতাম। এমনকি একটু বড় হয়ে যখন কোরবানির গরুও কিনে আনা হতো, সেই গরুটাকেও কয়েকদিন কি আদর যত্ন করতাম। কোরবানির সময় মন খারাপ হতো। মনে হতো গরুটা কাঁদছে। হ্যা, গরুর মাংস ঠিকই খেয়েছি কিন্তু একই সাথে প্রাণীর প্রতি অল্পকদিনে যে ভালবাসার অনুভূতি তৈরি হয়েছিল তা তো মিথ্যা নয়। গরু একটা প্রাণী, তারও মৃত্যুযন্ত্রণা আছে এসব বোধও কাজ করত।

প্রাণীজ মাংস মানুষ খাবে বলেই সেই প্রাণীটাকে কষ্ট দেয়া কিংবা প্রাণীটাকে নিয়ে অমানবিক আচরণ করা জায়েজ হয়ে যায় না। ছবির যে গরুটা এটাকে চট্টগ্রামের এক হোটেল মালিক বেঁধে রেখেছেন। মেজবান উৎসব উপলক্ষে জবাই করা হবে। তিনি এজন্যে গরুর গায়ে ব্যানার লাগিয়েছেন, যেখানে লেখা ‘মেজবান উৎসব উপলক্ষে আমাকে জবাই করা হবে।’ যেন তার মেজবান উৎসবে গরুও ভীষণ খুশি। খুশি হয়ে সে জবাই হবে – এই ঘোষণা দিচ্ছে এবং এতে সে আনন্দিত! ব্যাপারটা কি তাই দাঁড়ালো?

মেজবান উৎসব চট্টগ্রাম
ছবি- এস এম সাব্বির

একটু এটেনশনের জন্যে হোটেল পক্ষ এই কাজটা করলেন। মেজবান উৎসব হবে, ভালো কথা। কিন্তু, এভাবে গরুর গায়ে ব্যানার জড়িয়ে মজা করা-এটার মধ্যে কি কোনো অমানবিক আচরণের নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে না? গরুটাকে জবাই করা হবে, একারণে সে নিশ্চয়ই আনন্দিত না। হয়ত সে বুঝতেও পারছে না, তাকে নিয়ে কি করা হবে, কখন তাকে জবাই দেয়া হবে।

গরুটাকে নিয়ে নাকি শহরে বাদ্য বাজিয়ে বাজিয়ে হাঁটানো হয়েছে। প্রতি সোমবারে মেজবান উৎসব উপলক্ষে এমন কাজ করা হয়। কেউ কেউ বলছে চট্টগ্রামে এমনটা নাকি খুব আনকমন ঘটনা নয়। মাঝে মধ্যেই দেখা যায়। উৎসবের নামে অমানবিকতা যদি সেলিব্রেশনের মূল অনুঘটক হয়, তাহলে এই কালচার নিয়ে ভাবার আছে। নিছক মজা করার জন্যে, এটেনশন পাওয়ার জন্যে একটা প্রাণী নিয়ে এভাবে তামাশা করাটা নিন্দনীয়।

মানুষ নিজের ভেতর কতখানি বিকৃত মনোভাব পুষে কেবল আনন্দ পাওয়ার জন্যে, তা বোঝা যায় এই ঘটনার মাধ্যমে। আমরা নিজেদের সৃষ্টি সেরা জীব বলি বটে, কিন্তু মানসিকতায় আমরা দিনে দিনে হচ্ছি পশু। মনের পশুত্ব কোরবান দেয়ার শিক্ষাটাই আমরা শিখতে পারলাম না এখনো, মানুষ হবো কবে!

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button