ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

তাজ পরিবার, একটি গুম কিংবা সাধারণ নাগরিকের অস্তিত্বহীনতার প্রতিচ্ছবি…

তিনি বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের পুত্র। স্বাধীনতা সংগ্রামে তাজউদ্দিন আহমেদের অবদান, বঙ্গবন্ধুর সহচর হিসেবে তার অবস্থান, তার প্রজ্ঞা, নেতৃত্বগুণ সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি একটি বিশেষ স্থানজুড়ে আছেন। তাজ পরিবারের নৈতিকতা, আদর্শবাদী, আপোষহীন, স্পষ্টবাদী চরিত্র – এই পরিবারটিকে দেশের অন্যতম সম্মানিত এবং সর্বজনশ্রদ্ধেয় পরিবার হিসেবে ধরা যায়। রাজনৈতিক এই পরিবারটির কাছে বাংলাদেশের রাজনীতি কিংবা ইতিহাসও তাদের অবদানের জন্য ঋণী রইবে।

এই পরিবার থেকে তাজউদ্দিন আহমেদের পুত্র সোহেল তাজ মূলধারার রাজনীতিতে এসে ভীষণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তার মেইনস্ট্রিম রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত হয়নি নানান কারণে। সেসব ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু, সবচেয়ে বড় কথা, এই পরিবারের কেউ ক্ষমতার রাজনীতির বলতে সরাসরি জড়িত না থাকলেও কিংবা কেউ মন্ত্রী এমপি না হলেও এই পরিবারটির গুরুত্ব সবসময়ই বেশ উঁচু একটা জায়গায় থাকবে। তাদেরকে সেই সম্মানটুকু দিতে হবে। তাদের নিরাপত্তার দিকেও তাই সেই নজরটুকু দিতে হবে।

অথচ, গত কদিন ধরেই একটা ঘটনা বেশ পীড়া দিচ্ছে। সোহেল তাজের ভাগ্নে গুম কিংবা অপহৃত হয়েছেন। ভাগ্নেকে কয়েকদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে কোনো আপডেট পাওয়া যাচ্ছিলো না। তাই, সোহেল তাজকে ফেসবুক লাইভে আসতে হলো। সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে অনুরোধ, আবেদন যা-ই বলুন সবই চেয়েছেন তিনি লাইভে। একাধিকবার তাকে ফেসবুকে লাইভ করতে হয়েছে।

ভাগ্নেকে উদ্ধারের জন্য যতটুকু আইনী উদ্যোগ নেয়া দরকার ছিল সেটুকু তার পরিবারের তরফ থেকে নেয়া হয়েছে বলে জানা যায়। সোহেল তাজের ভাগ্নে সৌরভের বাবা জানান, থানা থেকে কেউ যোগাযোগ করেনি তার সাথে। তিনি নিজেই যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন কিন্তু খোঁজ মিলছিলো না সৌরভের।

উল্লেখ্য, এর আগে র‍্যাব পরিচয়ে সৌরভকে উঠে নেয়ার অভিযোগও জানা যায়। পরে সৌরভকে অবশ্য তারা ফিরিয়েও দেন। কিন্তু, এবার সৌরভ আবারো যখন অপহৃত হলেন, তখন শেষ পর্যন্ত সোহেল তাজকে লাইভে আসতে হলো। তিনি কিছুই চাননি কারো কাছে, না ভোট, না সংসদ সদস্য পদ, না পদপদবি, না ক্ষমতা, না মন্ত্রীত্ব। বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে তিনি বাধ্য হয়েছেন এইরুপ পরিস্থিতিতে লাইভে এসে সবাইকে ঘটনাটা জানাতে। তিনি শুধু তার ভাগ্নেকে ফেরত চেয়েছেন, নিরাপদে তার ভাগ্নে ঘরে ফিরবে এইটুকুই চেয়েছেন।

দৃশ্যপটটা একবার চিন্তা করুন। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ পরিবারের একজন সদস্য এভাবে গুম হয়ে গেলেন। আর ভাগ্নেকে ফিরে পেতে নিজের মুখে তাজ পরিবারের আরেক সন্তানকে লাইভে এসে আবেদন রাখতে হলো।

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মের নায়কদের অন্যতম তাজউদ্দিন আহমেদ পরিবারের সাথে এই ঘটনাটি একটি ন্যাক্কারজনক উদাহরণ হয়ে থাকলো। একজন সোহেল তাজকে যখন নিজের আপনজনকে ফিরে পেতে এভাবে লাইভ করতে হয়, তখন একদম সাধারণ নাগরিকের অবস্থাটা একবার ভেবে দেখুন। সোহেল তাজ পরিচিত মুখ, তার আবেদন অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। অনেকের এইটুকু প্রিভিলেজও নেই। সোহেল তাজকে বলতে হয়, আওয়াজ তুলুন, আজকে আমার ভাগ্নে অপহৃত হয়েছে, কাল আপনারও কেউ হতে পারে..

তাজ পরিবার

কাল ঘটতে পারে এমন কিছুর কথা নাইবা ধরলাম, গত কিছুবছর ধরে এধরণের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তার পরিত্রাণ কি ছিলো? আরেকটি বিষয় যা ভাবার মতো তা হলো, এই দেশে তাজ পরিবারের কাউকে অপহরণ করার কথা ভাবতে পারে এরা কারা? এদের চালায় কারা? সোহেল তাজ প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত আবেদন জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সোহেল তাজকে সন্তানসম জ্ঞ্যান করেন বলে আমরা জানি। প্রধানমন্ত্রীর স্নেহধন্য সোহেল তাজ খারাপ সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। যারা অপহরণ করেছে তারা নিশ্চয়ই জানে সোহেল তাজ কে? তাজউদ্দিন আহমেদ কে? জানে না। জানা উচিত। তাহলে এতবড় কলিজা যারা দেখাতে পারে তাদের পরিচয় কি উন্মোচন হবে না? শুকরিয়া অবশেষে সোহেল তাজের ভাগ্নেকে পাওয়া গেছে। সুস্থভাবেই ফিরে এসেছে সৌরভ।

তবুও, কথা থেকে যায়। তাজ পরিবারকে হয়রানি কারা করেছে তাদের বিচার রাষ্ট্র করবে কিনা, তাদের পরিচয়, মুখোশ খুলে দেয়া হবে কিনা এই প্রশ্ন আমাদের মনে জাগে। সোহেল তাজও কি ভাগ্নেকে ফিরে পাওয়ার পর বিচার চাওয়ার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবেন কিনা আমরা জানি না। কিন্তু, নাগরিক হিসেবে আমরা প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে চাই। কারণ, যেখানে তাজ পরিবারকেও এমন অনিশ্চয়তাময় দিন পার করতে হয়, গুম হয়ে যাওয়া প্রিয়জন ফিরে পাওয়ার অস্থিরতায় দিন কাটাতে হয়, ফেসবুকে এসে ভাগ্নেকে ফিরে পেতে সবার কাছে আকুল আবেদন করতে হয়, সেখানে আমরা কে?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button