খেলা ও ধুলা

ধানক্ষেত থেকে জাতীয় দল!

আজ থেকে বারো বছর আগেকার কথা। মাগুরা জেলার কমলাপুর গ্রামে থাকত মেয়েটি। দিনভর বাবার সাথে ধানক্ষেতে কাজ করতে হতো তাকে। যেসব দিন বাংলাদেশের খেলা থাকত, তাড়াতাড়ি কাজ সেরে চলে যেত এক প্রতিবেশীর বাড়িতে খেলা দেখতে। টিভি পর্দায় খালেদ মাসুদ পাইলটকে উইকেটকিপিং করতে দেখে সে ভাবত, ইস, একদিন আমিও যদি ওনার মত হতে পারতাম!

সেই স্বপ্নই যে একদিন সত্যি হয়ে যাবে, কে ভাবতে পেরেছিল! কিন্তু বাস্তবের কাহিনী হার মানায় গল্প-উপন্যাসকেও। তাই তো আপাত অসম্ভবকে সম্ভব করে, ধানক্ষেতে বাবার সাথে কাজ করা সেই ছোট্ট মেয়েটিই আজ বাংলাদেশ জাতীয় নারী দলের অতিরিক্ত উইকেটকিপার হিসেবে বিমানে করে উড়াল দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশ্যে।

যার কথা বলছি, তিনি শামিমা সুলতানা। জাতীয় দলে জায়গা পেয়েছেন অনেক পরে। কিন্তু মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও যে তিনি সেই ছোটবেলা থেকেই বাবার সাথে চলে যেতেন ধানক্ষেতে কাজ করতে। উদ্দেশ্য একটিই, যেভাবে পারেন পরিবারকে আর্থিকভাবে সাহায্য করবেন। ঠিক যেমনটা ছেলে সন্তানেরা করে থাকে!

ছোটবেলা থেকেই এমন মানসিকতা তৈরি হবার পেছনে কারণ হলো, খুব অল্প বয়স থেকেই দারিদ্র্যতার সাথে পরিচয় ঘটেছিল তার। নিজের চোখে দেখেছেন অর্থনৈতিক দৈন্যদশার কারণে চার মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সংসার চালাতে কতটা বেগ পেতে হচ্ছে তার বাবা-মাকে। কিন্তু এত দুঃখ-কষ্টের মাঝেও তার একমাত্র ভালোলাগার জায়গা ছিল ক্রিকেট। ক্রিকেট খেলতে গিয়েই তিনি ভুলে থাকতে পারতেন আর সব জ্বালা যন্ত্রণা। এবং তিনি সত্যিই অনেক সৌভাগ্যবান যে নিজের পরিবার থেকেও সবসময়ই সমর্থন পেয়ে এসেছেন তিনি। তার ক্রিকেট খেলাটিকে খারাপ চোখে দেখেননি পরিবারের কেউ।

নিজের জীবন সংগ্রামের কথা তিনি ব্যক্ত করেন এভাবে,

‘আমাদের নিজেদের চাষের জমি ছিল না। আমরা অন্যের জমিতে ফসল ফলাতাম। তারপর সেই ফসলের অর্ধেক তাদেরকে দিয়ে দিতে হতো। বাকি অর্ধেক আমরা রাখতাম। আমি সবসময়ই চাইতাম কীভাবে আমার বাবাকে সাহায্য করা যায়। তাই আমি ছোটবেলা থেকেই ক্ষেতে যাওয়া শুরু করি, আর কীভাবে জমি চাষ করতে হয় তা শিখে নিই।’

‘তবে আমার বাবা আমাকে পড়ালেখা করতেও উৎসাহ দিতেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরণের খেলা খেলতেও। এমন দিনও গেছে যখন আমার বাবা আমাদের জন্য বই কিনবেন বলে খাবার কম কিনতেন। কারণ তিনি চাইতেন আমরা যেন শিক্ষিত হয়ে উঠি।’

এভাবেই সময় যেতে থাকে, আর শামিমা উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ চুকিয়ে ভর্তি হন ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজে। সেখানেই তিনি প্রথম ক্রিকেট খেলার বড় একটি সুযোগ পান। তাও আবার সত্যিকারের ক্রিকেট বল দিয়ে।

‘আমি ছেলেদের সাথে ক্রিকেট আর ফুটবল খেলতাম। অবশ্য ক্রিকেটের প্রতিই আমার ঝোঁক বেশি ছিল। কিন্তু আমি জানতাম না কোথায় গিয়ে খেলতে পারব। ফরিদপুরে আমার কলেজের পাশেই একটি স্টেডিয়াম ছিল, আর সেখানে আমি প্রথম জাতীয় ক্রিকেট লিগে ঢাকা বিভাগের হয়ে একটি ম্যাচ খেলি। তাদের একজন খেলোয়াড় ইনজুরিতে পড়েছিল। তখন ৮০ জনের মধ্য থেকে আমাকে দলে নেয়া হয়। পরে আমি লিগের পাঁচটি ম্যাচই খেলি, আর বুঝতে পারি যে আমি যদি এই খেলাটা ভালো মত খেলতে পারি, তাহলে এভাবেই বেশ ভালো টাকা আয় করতে পারব।’

তাই একসময় নেহাতই শখের বশে ক্রিকেট খেলা শামিমা এবার জানপ্রাণ দিয়ে ক্রিকেট খেলতে শুরু করেন। এবং খুব শীঘ্রই তিনি তার কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের ফলও পেয়ে যান। ২০১০ সালে ভারতে একটি সিরিজ ছিল বাংলাদেশের। সেখানে তিনি ডাক পান। এরপরের বছর আইসিসি নারী বিশ্বকাপের বাছাই পর্বেও খেলেন তিনি।

সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল শামিমার জন্য। কিন্তু ২০১৪ সালে হঠাতই ছন্দপতন। লিগামেন্ট ইনজুরির কারণে দীর্ঘ সময়ের জন্য মাঠের বাইরে চলে যেতে হয় তাকে, যেটিকে তিনি মনে করেন তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সময়।

‘সার্জারি করার পর আমাকে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কারণ বিনা উপার্জনে ঢাকায় থাকবার মত যথেষ্ট টাকা আমার কাছে ছিল না। কিন্তু তখন আমি ভাবি যে জীবনে তো আরও অনেক খারাপ সময়ই পার করে এসেছি। তাহলে এখন কেন পারব না! এসব ভেবেই আমি মনের জোর ফিরিয়ে আনি, ফিটনেস নিয়ে কাজ করতে থাকি, আর এক সময়ে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে জাতীয় দলেও ফিরে আসি।

যদিও শামিমাকে খুব অল্প বয়স থেকেই দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হতে হয়েছে, তবু তার জীবনের লক্ষ্য কখনোই কেবল অর্থ উপার্জনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং তিনি চেয়েছেন সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে। সেই লক্ষ্যে অবিরাম পরিশ্রম করে গেছেন তিনি, এবং সম্পন্ন করেছেন পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনও।

ছোটবেলা থেকেই শামিমার জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া ছিল তার বাবাকে আর্থিকভাবে সাহায্য করা, তার কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করা। সেই চাওয়া পূরণ করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। তার ইনকামে এখন সংসার চলে তাদের। তাই তার বাবাকে এখন আর মাঠে কাজ করতে হয় না। অবসর জীবন উপভোগ করছেন তিনি। কিন্তু তাই বলে শামিমার সংগ্রাম কিন্তু শেষ হয়নি। এখন এক নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি।

‘আমার অনেক টাকার প্রয়োজন। কারণ আমার ভাই কিছুদিন আগে একটা ডেইরি ফার্ম দিয়েছে। সেটাকে বড় করতে টাকার প্রয়োজন। আমরা দুইটি গরু কিনেছি। একটা গরু দিনে দশ লিটার দুধ দেয়। অন্যটা কিছুদিনের মধ্যেই বাচ্চা দেবে।’

এভাবেই প্রতিনিয়ত পরিবারের সবার মুখে হাসি ফোটাতে কাজ করে যাচ্ছেন শামিমা। কিন্তু তিনি নিজে ব্যক্তিজীবনে কেমন? তা পরিষ্কার হবে এর পরের উদাহরণের মাধ্যমে,

‘আমার মনে আছে লালমনিরহাটে একবার একটা টি২০ ম্যাচ খেলার সময় সুইপ করতে গিয়ে মুখে বল লেগেছিল। আমাকে তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, আর মুখে সাতটা সেলাই দেওয়া হয়। কিন্তু আমি তারপরও আবার ওই ম্যাচ খেলতে ফিরে এসেছিলাম, আর উইকেটের পিছনেও দাঁড়িয়েছিলাম। এক সময়ে বুঝতে পেরেছিলাম যে আবারও আমার মুখ থেকে রক্ত পড়ছে। ম্যাচ শেষে আবারও আমি হাসপাতালে যাই, আর তখন জানতে পারি যে আমার একটা সেলাই খুলে গিয়েছিল।’

আসলেই শামিমা এরকম। যত বাধাই আসুক, তিনি কখনও ভেঙে পড়েন না। মাঝপথে হাল ছেড়েও দেন না। শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান। তাই তো বয়স ৩০ পার হয়ে গেলেও এখনও দিব্যি খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। শুধু যে খেলছেন তা নয়। অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছেন আরও অনেক উঠতি নারী ক্রিকেটারকেই। তবে শুধু নারী ক্রিকেটারই নয়, তাকে দেখে অনুপ্রেরণা নিতে পারেন সব বয়সের সব পেশার নারীই। এবং পুরুষেরাও।

তথ্যসূত্র- ডেইলিস্টার

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button