খেলা ও ধুলা

ক্রিকেট যখন শুধু বিনোদন নয়, অনুপ্রেরণারও বাইশ গজ!

ক্রিকেটারদের চকচকে জীবন, তাদের অগণিত ভক্ত আর বিপুল অর্থবিত্তের হাতছানিটা বাইরের গল্প। কারো কারো ভেতরের গল্পগুলো এত মসৃণ নয়। ক্রিকেটাররা শুধু বিনোদনের ফেরিওয়ালা নন, তারাও কখনো কখনো অনুপ্রেরণাদায়ী চরিত্র হতে পারেন। এমন কজন ক্রিকেটারের সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প- যারা নিজেকে ছোট মনে করেন, বড় স্বপ্ন দেখতে ভয় পান, নিজের জীবন নিয়ে হতাশ, তাদের জন্য এই লেখাটি।

মোহাম্মদ রফিক 

দারিদ্রতা যে কি জিনিস, সেটা রফিকের চেয়ে কে ভালো জানে! বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষা জিঞ্জিরা বস্তিতেই ছোটবেলা কাটিয়েছেন। জন্মের কিছুদিন পর হারিয়েছিলেন বাবাকে। পড়ালেখা ওরকম অর্থে করা হয়ে ওঠেনি। তাঁর অন্যতম কাজ ছিলো মাছ ধরা আর ক্রিকেট নিয়ে পড়ে থাকা। যে ধরণের মানুষদের নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না, যাদের নিয়ে কেউ স্বপ্ন দেখে না; মোহাম্মদ রফিক সত্যিকার অর্থে সে ধরণের মানুষগুলোরই প্রতিনিধি ছিলেন। অথচ, সেই তিনিই বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্পিনার! রাজ্জাক, সাকিব,গাজী, মিরাজরা যার উত্তরসূরি।    

খেলার জন্য ফেরিতে করে যেতেন শহরে। একরকম সাদামাটা জীবন তার। দেশের হয়ে খেলেছেন, অনেক অর্জনের স্বাক্ষীও তিনি। বাংলাদেশ যখন আইসিসি চ্যাম্পিয়ন ট্রফি জিতেছিলো, প্রধানমন্ত্রী তার ইচ্ছার কথা শুনতে চেয়েছিলেন। তিনি বললেন, ‘বুড়িগঙ্গার ওইদিকে বাবু বাজারে একটা ব্রিজ হলে মানুষের যাতায়াতে অনেক সুবিধা হতো!’ সেই ট্রফি জয়ের পর দলের প্রত্যেক খেলোয়াড় একটা করে জমি আর গাড়ি পেয়েছিলো। রফিক জমিটা দিয়েছিলেন বাচ্চাদের স্কুলের জন্য! আর গাড়িটা বিক্রি করে সেই টাকায় স্কুলঘর তুলে দিয়েছিলেন। খেলোয়াড় হিশেবে রফিক ছিলেন দলের অন্যতম স্তম্ভ। যতদিন খেলেছেন, ব্যাটসম্যানদের নাচিয়েছেন তার বাঁহাতি স্পিনের বিষে। আছে টেস্ট ওয়ানডে দুই ফরম্যাটেই ১০০’র বেশি উইকেট। টেস্ট ক্রিকেটে আছে সেঞ্চুরিও!

ব্রায়ান লারা 

সাবেক ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান অধিনায়ক, বাঁহাতি ক্লাস ব্যাটসম্যান ব্রায়ান চার্লস লারা, যাকে ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বলা হয়ে থাকে। ক্রিকেট ও রেকর্ডের এই বরপুত্রকে হয়তো খেলাটাই ছেড়ে দিতে হতো। তেমন অবস্থাই হয়েছিলো ২০০২ সালে।

তাঁর শরীরে তখন হেপাটাইটিস বি ধরা পড়ে। লারা সেসময় চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ও পরের ট্যুর থেকে বাদ পড়েন। তাকে হাসপাতালেি কাটাতে হতো বেশিরভাগ সময় উপর। হেপাটাইটিস বি রোগটা নিরাময়যোগ্য হলেও লিভারকে ক্ষতিগ্রস্থ করে ফেলে। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও নেহায়েত কম নয়। কিন্তু হেরে যাওয়ার ভয় লারাকে আটকাতে পারেনি। তিনি কোনো প্রতিবন্ধকতাকে যেন পাত্তাই দিলেন না। ফিরে আসলেন ক্রিকেটে। এই ঘটনার পর ২০০৪ সালে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র এক ইনিংসে চারশত রান করার রেকর্ড গড়েন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে!

মার্টিন গাপটিল 

নিউজিল্যান্ডের এই ওপেনার জনপ্রিয় তাঁর বিধ্বংসী ব্যাটিং স্টাইলের জন্যে। কিন্তু মাত্র তেরো বছর বয়সের একটি ঘটনা হতে পারতো মার্টিন গাপটিলের বিদায় কাব্য। সে বছর একটি মারাত্মক দুর্ঘটনায় তার জীবন প্রায় শেষ হয়ে যেতে বসেছিলো। তবে জীবন বাঁচলেও তার পা মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ডাক্তার অনেক চেস্টা করেও শেষ রক্ষা করতে পারেন নি, কেটে ফেলতে হয়েছিলো পায়ের তিনটা আঙ্গুল! ডাক্তারদের আশংকা ছিলো হয়তো গাপটিল আর আগের মতো হাঁটতেই পারবেন না।

তবে, এখন তো তিনি রীতিমতো দৌড়াচ্ছেন! সেই ঘটনার পর তিনি নিজেকে আরো প্রত্যয়ী হিশেবে গড়ে তুলতে চাইলেন, পরিশ্রম করতেন আগের চেয়েও দ্বিগুণ গতিতে। ২০১৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে রীতিমতো ওয়েস্ট ইন্ডিজকে একাই উড়িয়ে দিয়েছিলেন বিধ্বংসী ব্যাটিং দিয়ে, করেছিলেন এক ম্যাচে অপরাজিত ২৩৭*!

দিনেশ চান্দিমাল

শ্রীলংকার বর্তমান জাতীয় দলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় এই চান্দিমাল। অথচ, তার ক্রিকেট হাতেখড়ি হয়েছিলো স্পিন বোলিংয়ের মাধ্যমে। কিন্তু স্কুল টিমের হয়ে মাত্র দুই ম্যাচ খেলার পর বোলিংয়ে চাকিংজনিত ত্রুটি ধরা পড়ে তার। বোলিং থেকে হন নিষিদ্ধ। কোচ তার দিকে কিপিং গ্লাভস ছুড়ে দিলেন, বল করা হবে না, তাই ধরার কাজটাই দেয়া হলো তাকে। ১৭ বছর পর্যন্ত এই কাজটিই তিনি করলেন, সাথে ব্যাটিংয়ের কিছু উন্নতি হলো। ফলে স্কলারশীপ পেলেন বিখ্যাত আনন্দ কলেজে।

কিন্তু ভাগ্যের লীলাখেলা বোঝা দায়। ২০০৪ সালে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলংকা আক্রান্ত হলো ভয়ংকর সুনামিতে। চান্দিমালের ঘরবাড়ি ভেসে গেলো, ভেসে গেলো তার ক্রিকেট খেলার যাবতীয় সরঞ্জাম, সাথে ভেসে গেলো সম্ভাব্য আর যা কিছু থাকলে ঘুরে দাঁড়াতে পারতো তারা, সব কিছুই।

সব কিছু বলতে গেলে শুরু করতে হয়েছিলো নতুন করে। ভেঙ্গে পড়েননি চান্দিমাল। মচকে যাননি বলেই, সুনামির দিন থেকে ঠিক সাত বছর পর, ২০১১ সালে তিনি শ্রীলংকার জাতীয় দলে সুযোগ পান, অভিষেক হয় টেস্ট ক্রিকেটে। সুনামিতে ঘুরে দাঁড়ানো অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছেন সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষের ম্যাচে। প্রোটিয়াদের ভয়ংকর পেস আক্রমণ সামলে তাদের ভূমিতে টেস্ট জয়ে রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। রাখছেন এখনো।

রেমন্ড প্রাইস 

জিম্বাবুয়ান স্পিনার। এই মানুষটার জন্ম থেকেই নানান বাধায় জীবন পার করতে হয়েছে। জন্মটা হয়েছিলো নির্ধারিত সময়ের বেশ আগে। ফলে একটি রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন, যে রোগে প্রতি চারজন মানুষে একজন বাঁচে। রেমন্ড সেই একজন হতে পেরেছেন কিন্তু রোগের কারণে হারিয়েছিলেন শ্রবণ শক্তি। একটি অপারেশনে শ্রবণশক্তি মোটামুটি ফিরে পেলেও অন্যান্য ডিফিকাল্টি ঠিকই অনুভব করতেন তিনি।

তিনি যখন জিম্বাবুয়ের হয়ে খেলা শুরু করেছিলেন  তাকে বলা হয়েছিলো “ইউজল্যাস” ক্রিকেটার, তাকে খেলা ছেড়ে দেয়ার জন্য জোরও করা হয়েছিলো। প্রফেশনাল খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন তাঁকে তাড়া করতো। তাই স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি তিনি অদ্ভুত অদ্ভুত কাজ করতেন, কারণ কিছু একটা করে বেঁচে তো থাকতে হবে। টয়লেট ক্লিনিংয়ের কাজ, এয়ার কন্ডিশান ঠিক করার মতো কাজগুলো করে তাকে অর্থ যোগাতে হতো।

সেই রেমন্ড প্রাইসই আইসিসির ওয়ানডে বোলার র‍্যাংকিংয়ে দুই নাম্বার পর্যন্ত উঠে এসেছিলেন!

রবীন্দ্র জাদেজা

অনেক বাংলাদেশীর কাছেই নামটা হয়তো অপ্রিয়। তবে ভারতীয় জাতীয় দলে তার আসার পেছনে রয়েছে নিখাদ আত্মত্যাগ।

জাদেজার বাবা ছিলেন একজন সাধারণ সিকিউরিটি গার্ড। সিকিউরিটি গার্ড হিশেবে তার বাবা যা পেতেন তা দিয়ে সংসার চালানো ছিল অনেক কষ্টের। তিন সন্তানের খরচ যোগাতে হিমশিম খেতে হতো তাকে। বাবা চাইতেন ছেলে আর্মি স্কুলে ভর্তি হোক, এবং অফিসার হোক। চাওয়াটা অমূলক নয়, তবে জাদেজা তার পুরো মনোযোগ যে আগে থেকেই দিয়ে রেখেছেন ক্রিকেটে। আগ্রহ পেতেন মায়ের সহযোগিতায়। কিন্তু সেই মাও মারা গেলেন হুট করেই এক এক্সিডেন্টে।

মা মারা যাওয়ার পর জাদেজার বড় বোন দায়িত্ব নেন। তিনি একটা হাসপাতালের নার্স হিশেবে যোগ দেন, তাতে যা আসতো সেটি দিয়ে পরিবারের দেখাশুনা করার পাশাপাশি জাদেজার ক্রিকেটের পেছনেও ব্যয় করতেন। সেই জাদেজা আজ ভারতীয় দলের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটারদের একজন!

মারভান আতাপাত্তু 

সাবেক শ্রীলংকান অধিনায়ক। অথচ তার শুরুটা ছিলো বড়ই আশ্চর্যরকমের। যখন টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হলো, প্রথম ম্যাচেই দুই ইনিংসে তিনি ধারাবাহিক পারফর্ম করলেন। দুই ইনিংসেই শূন্য! দল থেকে বাদ পড়লেন।

২১ মাস পর তিনি আবার দলে ডাক পেলেন। এটি তার দ্বিতীয় সুযোগ নিজেকে প্রমাণ করার। এইবার তিনি অনেক চেষ্টা করলেন। ফলে প্রথম ইনিংসে শূন্য করে আউট হলেও দ্বিতীয় ইনিংসে এক রান করতে পেরেছিলেন! তাকে আবার বাদ দেয়া হলো।

এই সময়ে তিনি ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে প্রচুর রান করতে লাগলেন। নেটে প্রচুর প্র্যাকটিস করতে থাকলেন। ১৭ মাস পর আবার তাই ডাক পেলেন জাতীয় দলে। এবারও তিনি হতাশ করেননি! আবারো প্রথম ইনিংসে শূন্য এবং দ্বিতীয় ইনিংসেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। কী অসাধারণ ধারাবাহিক পারফর্মেন্স!

হয়তো এরপর আর সুযোগ পাওয়ারই কথা ছিলো না তার। তবুও ভাগ্যবিধাতা ভিন্ন গল্প অবতারণা করবেন বলেই হয়তো তিনি আবারো ডাক পেয়েছিলেন! এবার তিন বছর পর। তারপর বাকিটা ইতিহাস। ১৬ টা সেঞ্চুরি , ৬ টা ডাবল সেঞ্চুরি মিলিয়ে রান করতে থাকলেন অবিরাম, শ্রীলংকার ব্যাটিং লাইনআপের নির্ভরতার প্রতীক হলেন, পেলেন শ্রীলংকান দলটিকে নেতৃত্ব দেয়ার সম্মান!

এটাই জীবন! সামনে কত কি অপেক্ষা করে! একবারের ব্যর্থতায় থেমে গেলে সেটা কখনো জানা হয় না আর…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button