ডিসকভারিং বাংলাদেশতারুণ্য

চাঁদপুরের সেই অসাধারণ স্থাপত্যশৈলী সমৃদ্ধ স্কুলের গল্প!

নাম তার শাহাবুদ্দিন স্কুল এন্ড কলেজ। প্রথম যখন ফেসবুকে এই বিদ্যালয়ের ছবি ছড়িয়ে পড়ে, ভাবতেই পারিনি এমন একটি স্কুল আছে বাংলাদেশে। তার উপর স্কুলটির অবস্থান চাঁদপুরে, আমার নিজের জেলাও চাঁদপুর। তাই, স্কুলটা দেখার জন্যে তীব্র এক বাসনা তৈরি হয়েছিল মনের মধ্যে।

পরদিনই লঞ্চে করে চাঁদপুর রওনা দিয়ে দিলাম। সোয়া তিনঘন্টা বাদে লঞ্চঘাটে নামার পর দুপুরের খাবার খেয়ে রওনা দিলাম স্কুলটার খোঁজে। আমরা যখন যাই, তখনো অনেকেই স্কুলটাকে চিনে উঠতে পারে না সহজে। কারণ, স্কুলটা প্রায় নতুন এবং স্থানীয় অনেকেই জানে না এমন দৃষ্টিনন্দন নান্দনিক স্থাপত্যের স্কুল হয়েছে চাঁদপুরে।

যাহোক, চাঁদপুর নতুন ব্রীজ পর্যন্ত অটোতে, তারপর ব্রীজের ঢাল থেকে বহেরিয়া বাজার নামক জায়গার নাম বলে সিএনজিতে উঠে পড়ি। সিএনজি প্রথমে চিনতে না পারলেও পরে আলাপ আলোচনা করে বুঝে ফেলেন, আমরা নতুন যে স্কুলটি দেখতে এসেছি সেটি কোথায়। তার ভাষায়, সেলিম চেয়ারম্যানের বাড়ি বললে জায়গাটাকে বেশি ডিফাইন করা সম্ভব। তিনি নামিয়ে দিলেন মূল সড়কে। হাতের বামে একটি রাস্তা চলে গেছে। অদূরে সম্ভবত মুঠোফোন কোম্পানির টাওয়ার দেখা যায়। ওই টাওয়ারের ওদিকটায় গেলেই স্কুল। তিন চার মিনিট হেঁটে আমরা দেখা পেয়ে গেলাম, আমাদের কাঙখিত সেই স্কুলের, শাহাবুদ্দিন স্কুল এন্ড কলেজ।

আমরা ভেবেছিলাম, স্কুলের সদর দরজা বন্ধ থাকবে। অনুমতি নিয়ে ভেতরে যেতে হবে। কিন্তু, তখন গিয়ে এমন কোনো নিরাপত্তা বাঁধা পেরুতে হয়নি। খোলা গেট, স্কুলের ভেতরও নিরবতা, দুই তিনজন ছোট ছোট ছেলে স্কুল আঙ্গিনায় ঘুরছে। তারা এই স্কুলেরই শিক্ষার্থী। স্কুলের পাশেই তাদের বাড়ি। দেখলাম, দুইজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে মেয়েও স্কুলটা দেখতে এসেছে। তাদের সাথে কথা বলে জানা গেল, একজন স্থাপত্যবিদ্যা নিয়ে পড়ছেন, তাই দেখতে এলেন স্কুলটা। তাদের বেশ চমৎকৃত হতে দেখা গেল।

স্কুলটার ভেতর ঢুকেই প্রথমেই একটা কথা মনে হলো, ওয়াও! আর যখন গোটা স্কুলটা এক চক্কর ঘুরে ফেললাম, তখন বুকটা হুহু করে উঠলো। মনে হলো, স্কুল জীবন যদি আবার শুরু করা যেত, যদি এমন নান্দনিক স্কুলে পড়তে পারতাম! আহারে নস্টালজিয়া…তখন মাথায় প্রশ্ন আসলো, আচ্ছা এই স্কুলে এখন যে ছোট ছোট শিশুরা পড়ছে তারা লি অনুধাবন করতে পারছে, কি অপরুপ নান্দনিক এক পরিবেশে তারা পড়ার সুযোগ পাচ্ছে?

ডি সাইফ

স্কুলটার মধ্যে নিজস্বতা আছে। বাঙ্গালিয়ানা ছোঁয়া আছে। সম্পূর্ণ স্কুলে কাঠের ব্যবহার এতো চমৎকার ভাবা যায় না! করিডোরে লাইটগুলো ঘেরা যে গোলক দিয়ে তা যেন অনেকটা বাবুই পাখির বাসা। দুইতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সামনে চোখে পড়বে সবুজ ফসলের মাঠ। কৃষক সেখানে মাঠে চাষ করছে। আশেপাশের গাছপালার সবুজ রঙ চোখে লেগে থাকবে। প্রকৃতির স্নিগ্ধ আবেশ মনে রেশ রেখে যাবে। কোলাহলমুক্ত এই পরিবেশে শান্ত হয়ে আসবে যান্ত্রিকনগরের অশান্ত মন।

এই অদ্ভুত ঐশ্বর্যময় স্কুলটির স্থাপত্য করেছেন লুৎফুল্লাহিল মজিদ রিয়াজ। তিনি দেশরুপান্তরে গল্প করেছেন কিভাবে পাশ্চাত্য নয় বরং দেশীয় ঘরানার স্থাপত্য ভাবনা এসেছে তার কাছে। বলেন, “এই যে স্লাইডিং জানালা, এটা তো এসেছে পশ্চিম থেকে। আমাদের এখানে তো সেটা ছিল না। এখানে ছিল সব খোলামেলা। আপনাকে মূল ঘরে প্রবেশের আগে একটা ছোট গেট পার হতে হয়। তারপর উঠান। উঠানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ঘর।

আমাদের এখানে ট্রপিক্যাল ওয়েদার। আলো-বাতাসের যাওয়া-আসা আছে। এর সঙ্গে মিলিয়েই আমরা স্থাপনাগুলো গড়ে তুলতে চাই। আমাদের এখানে যে চালা ঘর তৈরি হয়- সেরকম। তবে নিশ্চয় আগের সময়ের মতো করে নয়। এর সঙ্গে আধুনিকতার একটা ফিউশন আমরা যুক্ত করার চেষ্টা করি সব সময়।”

চাঁদপুর শাহাবুদ্দিন স্কুল এন্ড কলেজ

আদতেও তাই, স্কুলটা দেখলে আপনি আলো বাতাসের এক নিবিড় যোগসূত্র তৈরি হতে দেখবেন। প্রাকৃতিক রিসোর্সের সর্বোত্তম ব্যবহার হয়েছে এখানে। ডিজাইনেও প্রাকৃতিক আলো বাতাসের প্রাচুর্যকে কাজে লাগানোর প্রয়াস লক্ষ্যনীয়।

মজিদ রিয়াজ স্কুলটার স্থাপত্য সম্পর্কে বলেন,
“প্রথমে আমি ভেবেছি এই স্কুলটা হবে একটা গ্রামে, সবুজ পরিবেশের মধ্যে তাই কোনোভাবে যেন এ পরিবেশর যে হারমনি, তা নষ্ট না হয়। আমি হয়ত সাদা অথবা অন্য কোনো রঙের একটা ভবন তৈরি করতে পারতাম। কিন্তু তাতে সেটা প্রকৃতির সাথে বেমানান হতো।

এমন রং চেয়েছি যা স্কুলের ছেলেমেয়েদের পরিচিত। আমি বেছে নিয়েছি গাছের পাতা। অঙ্কুরে একটি গাছের পাতার রং থাকে কচি সবুজ। সময়ে সে তার রং পাল্টায়। আমি প্রকৃতির রংটা ধরে রাখতে চেয়েছি। মাটির রঙে স্কুল ভবনটি রাঙিয়েছি।”

মাটি রঙয়ের এই স্কুলবাড়িটি আপনাকে আধুনিক অথচ ক্ল্যাসিক রুচির সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। গ্রাম বাংলার সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়া আছে এই স্কুলঘরে। আপনি কোনো গ্রামের বাড়িতে গেলে দেখলেন দুয়ার / বারান্দা সংলগ্ন জায়গায় বসার জায়গা আছে। স্কুলেও বারান্দায় এমন বসবার জায়গা আছে। যেখানে অভিভাবকরা বসতে পারেন, শিশুরাও বসতে পারেন। আর গোটা স্কুলঘরটা এতো খোলামেলা যে, এই ফাঁকা জায়গায় যেন অবারিত স্বাধীনতা। সিঁড়িটাও এমন প্রশস্থ, চোখের আরাম দেখেও।

শাহাবুদ্দিন স্কুল এন্ড কলেজ

স্কুলঘরের পাশে একই সাথে একটি মসজিদ। ছোট কিন্তু অসাধারণ সৌন্দর্য এই মসজিদটির। মসজিদ এবং স্কুলের সামনে খোলা জায়গা। যেখানে আমরা বাচ্চাদের হুড়োহুড়ি করতে দেখেছি। ফরিংয়ের পেছনে দৌড়াতে দেখেছি৷ শুক্রবারে মসজিদে অনেকে নামাজ পড়তে এলে, এজায়গায় তারা নামাজও পড়তে পারবেন। সব মিলিয়ে চমৎকার পরিকল্পনার সাথে চমৎকার ভাবনা, দূরদৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন এই শাহাবুদ্দিন স্কুল।

স্কুলটাকে কেন উন্মুক্ত রাখা হয়েছে, বাঁধাহীন প্রাচীর হীন মুক্ত রাখা হয়েছে তা জানা গেল মজিদ রিয়াজের কথায়। বললেন, “জনগণের প্রতিষ্ঠানকে জনগণের জন্য অবারিত রাখতে হবে। যদি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয় তাহলে স্থানীয়রা তার ক্ষতি করার মনোভাব দেখান। যদি তার প্রবেশে কোনো বাধা না থাকে, সে যদি নিজের মনে করতে পারে, তাহলে তার ক্ষতি সে করবে না।”

নিঃসন্দেহে উদার ভাবনা, বলতেই হয়। এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা শাহাবুদ্দিন একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। এলাকার চা দোকানে বসে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেই, দোকানের মানুষ এই ভদ্রলোকের বেশ প্রশংসাই করলেন। বললেন, স্কুলের সম্পূর্ণ নির্মাণ ব্যয় তার৷ স্কুল পরিচালনা ব্যয়ও তিনিই নির্বাহ করছেন। ছাত্র ছাত্রীদের কাছ থেকে নামমাত্র (৫০ টাকা ) অর্থ নেয়া হচ্ছে। গোটা স্কুলের খরচ, শিক্ষকদের বেতন সব কিছু তিনিই বহন করছেন শাহাবুদ্দিন ফাউন্ডেশন থেকে। শুনে ভালো লাগলো। ব্যক্তিউদ্যোগে এমন প্রয়াস, সৌন্দর্য পিয়াসী ও শিক্ষানুরাগী মনন এই সময়ে এসে দেখা মেলে কদাচিৎ। জনাব শাহাবুদ্দিন এজন্যে বাহবা পাওয়ার যোগ্য।

শাহাবুদ্দিন স্কুল

 

শেষ বিকেলের লঞ্চ ধরে ঢাকার পথে ফেরার পালা। তাই ফিরতে হলো। কিন্তু, স্কুলটা মনে ধরেছে খুব। হয়ত আবার আসবো কোনোদিন, বড় হওয়ার ক্রমাগত যাতনাগুলো উড়িয়ে দিতে এমন স্বর্গীয় স্কুলে ফিরে আসার চেয়ে দারুণ আর কি হতে পারে!

( স্কুলে দুপুর ২/৩ টা পর্যন্ত ক্লাস চলে। ক্লাসের সময়ে এসে কেউ শিক্ষার পরিবেশে ব্যাঘাত ঘটাবেন না প্লিজ। আর শুধু স্কুল নয়, বাংলাদেশের যেখানেই যান, পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন।)

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button