এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ডবিবিধ

বালি ও হাজার কাঠগোলাপের গল্প!

শুক্লা সরকার চৈতি

বালি ইন্দোনেশিয়ার একটা দ্বীপ। হাজার মন্দির আর হাজার কাঠগোলাপ এর দ্বীপ বালি। যেদিকেই তাকাবেন সেদিকেই খুব সুন্দর মন্দির,ভাস্কর্য আর কাঠ গোলাপ গাছ। আমাদের বিয়েটা লাভ ম্যারেজ। আমরা দুজন মেডিকেলে ব্যাচমেইট ছিলাম। একসাথে পড়াশোনা শেষ করে গত ফেব্রুয়ারি এর ১ তারিখে গাটছড়া বাঁধি। আমাদের প্রেম ও দীর্ঘ দিনের, প্রায় ৬ বছর এর। বিয়ে আর হানিমুন নিয়ে আমাদের অনেক জল্পনা কল্পনা ছিল। বিয়েটা স্বপ্নের চেয়েও সুন্দর ছিল। আর হানিমুন? বলে বোঝানো যাবে না।

বালি, ইন্দোনেশিয়া

প্রথমে হানিমুন ডেস্টিনেশন ছিল মালদ্বীপ,কিন্তু হঠাৎ একদিন বালির কিছু ছবি দেখি ইন্সটাগ্রামে। সমুদ্রের মাঝে সুইং আর পৃথিবীর শেষ প্রান্তের হ্যাভেন্স গেইট। সাথে সাথে কিছু স্টাডি করি বালি ট্যুর নিয়ে। তারপর থেকে বালি ছাড়া মাথায় কিছু ঢোকেনি। একসাথে চার্ম, নির্জনতা, অ্যাডভেঞ্চার, পার্টি প্লেইস, শান্ত সমুদ্র, অশান্ত সমুদ্র, পাহাড়, ঝরনা, পাহাড়ের ক্লিফ থেকে সমুদ্র দর্শন, হাজার বছরের পুরানো মন্দির, কি নেই বালিতে! তখন হঠাৎ করেই দেখি যে বালিতে যাওয়া একটা ক্রেইজ মত হয়ে গেছে। লিটারেলি সবাই যাচ্ছে। বাট সবার ট্যুরই ইনকমপ্লিট মনে হতো, মনমত ঠিক ছিল না কারো ট্যুরই। ঠিক করলাম নিজেরা ট্যুর প্ল্যান করবো,নিজেদের মত সাজাবো।

প্রায় ১.৫ বছর ধরে শুধু প্ল্যানই করেছি। শেষ পর্যন্ত সেপ্টেম্বর এর ১৫ তারিখ রাতে আমরা উড়াল দেই আমাদের স্বপ্নের উদ্দেশ্যে। আমাদের এই ট্যুরের গল্প বলি। যারা যেতে চান তাদের সাহায্যে আসবে হয়ত।

বালি, ইন্দোনেশিয়া

নিট খরচঃ আমরা প্লেইন টিকেট কাটি একটা এজেন্সির মাধ্যমে।কারন আমরা টিকেট কাটি মাত্র ১৫ দিন আগে।পার্সোনালি কাটতে গেলে খরচ বেশি পড়তো। আমাদের যাওয়া আসা এয়ারফেয়ার পড়ে ৭৬ হাজার। আরো আগে কাটলে আরো কমে পাওয়া যেতো। যাওয়ার আগে আমরা সব হোটেল বুকিং দেই দেশে বসেই
Agoda.com এ, ক্রেডিট কার্ড দিয়ে। ইটস কস্ট ইফেক্টিভ। এজেন্টরা অনেক টাকা বেশি রাখে।ক্রেডিট কার্ড দিয়ে নিজেরা কাটলে সেভ হয় অনেক টাকা। আমাদের প্ল্যান ছিল গিলি আর নুসা লেম্বংগ্যান এ আমরা ভিলা আর পার্সোনাল কটেজে থাকবো আর বালি তে একটু বাজেট ৩ তারকা হোটেলে থাকবো। কারন, বালির দিন গুলা খুব হেকটিক যায়।

৩ টা হোটেলে ছিলাম মোট।

১.বালিতে ৬ রাত ছিলাম আমরা হোটেল ট্যারেসে।এটা কুতা’তে। অসাধারণ লোকেশন। বের হলেই সব খাবার দোকান,পেছন দিকে মেইন শহরের পার্টি ম্যুড। ১০ মিনিট হাটা রাস্তায় বিচ। সব মিলিয়ে ভাল ছিল। খরচ পার নাইট ২৭৫০,বাফে ব্রেকফাস্টসহ।

২.গিলি ত্রাওয়াংগানে ২ রাত আমরা থাকি উটারা ভিলাসে। খুব সুন্দর ভিলা। পার্সোনাল সুইমিং পুল ছিল ভিতরে। আর পুরো ভিলা পাশের ভিলা থেকে দেয়াল দিয়ে সেপারেট করা। প্রাইভেসি রেটিং 10/10। পার নাইট 8500 করে ছিল,ব্রেকফাস্টসহ।

৩.একরাত ছিলাম নুসা লেম্বনগ্যানের Jenggala Hills এ।পাহাড়ের ক্লিফ এর ওপর একটা রিসোর্ট।দূরে তাকালে মাউন্ট আগুং। ইন এ ওয়ার্ড, ব্রেথ টেইকিং ভিউ। এখানে পার নাইট ৭৫০০ ছিল।ব্রেকফাস্ট ছিল না এখানে। আমরা দেশ থেকে একজন ড্রাইভার এর সাথে যোগাযোগ করে গেছিলাম। আমরা কই কই যেতে চাই তার একটা লিস্ট করে পাঠিয়েছিলাম। উনি কবে কোথায় যাবো সেটা সাজিয়ে দিয়েছিল। তাকে আমরা সব জায়গায় ঘোরানো বাবদ ৫০০ ডলারে ঠিক করে যাই..

বালি, ইন্দোনেশিয়া

প্রথমে আমাদের ট্যুরের ইটিনিরারি বলে নেই।
১৬ সেপ্টেম্বর রাত ০০.৫০ মিনিটে মালিন্দো এয়ারে যাত্রা শুরু করি,মাঝে কুয়ালালামপুরে ট্রানজিট ছিল। ১৬ সেপ্টেম্বর বালির স্থানীয় সময় সকাল ১১.৪৫ মিনিটে পৌছাই বালিতে,হোটেলে চেক ইন করি।

১৭ সেপ্টেম্বর সকালে গিলির উদ্যেশ্যে রওনা দেই। গিলিতে ১৭,১৮ সেপ্টেম্বর নাইট স্টে করে ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে বালিতে চলে আসি এবং আবার বালিতে চেকইন করি। বালিতে ১৯,২০,২১,২২ সেপ্টেম্বর থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর সকালে নুসা লেম্বংগ্যানে যাই এবং সেখানে হোটেলে চেকইন করি।

২৩ সেপ্টেম্বর নুসা লেম্বংগ্যানে নাইট স্টে করি এবং ২৪ সেপ্টেম্বর সকালে সেখান থেকে নুসা পেনিডা যাই,সারাদিন ঘুরে সেইদিন বিকালেই বালিতে আবার ব্যাক করি এবং হোটেলে চেকইন করি।

২৫ তারিখ চেক আউট করে সারাদিন বালিতে ঘুরে রাত ১১ টার ফ্লাইটে ব্যাক করি,মালিন্দোতেই। সব মিলিয়ে বাসা থেকে বের হই ১৫ তারিখ রাতে আর বাসায় ফিরি ২৬ তারিখ দুপুরে,৯ রাত ১০ দিনের প্লান। বাকিটুকু বিস্তারিত বলছি।

ডে ১ (১৬ সেপ্টেম্বর)-

সকাল ১১ টা নাগাদ আমরা বালি এয়ারপোর্ট থেকে সব ফর্মালিটি সেরে বের হই। বাইরে আমাদের ড্রাইভার আমাদের নামের প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেল টেরেস যেতে ৪৫ মিনিটস মত লাগে,রাস্তায় প্রায় ২লাখ রুপাইয়া (১২০০) দিয়ে একটা সিম কার্ড কিনি। যদিও খুব বেশি লাগেনি সিম কার্ডটা। তবু সেইফটির জন্য কিনে রাখা।

দুপুর ১২ টা নাগাদ আমরা হোটেল টেরেসে চেইক ইন করি। কিছুক্ষনই ছিলাম রুমে। ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে পড়ি শহর,বিচ ঘুরতে। রাস্তায় খেয়ে নেই Warung Totemo নামে একটা রেস্টুরেন্টে। খুবই ভাল ছিল খাবার। ওইখান থেকে হেটে বিচে যাই।সানসেট দেখি। সন্ধ্যায় শহর ঘুরতে যাই। মাইন্ড ব্লোইং সিটি। পার্টি চলছে সব সময়। কিছু না করে হেটে বেড়ালেও দিব্যি সময় কেটে যাবে। রাতে ডিনার করে হোটেল এ ফিরি রাত নটার দিকে।ডেইলি যত টায়ার্ডই থাকি না কেন, ঘন্টা ২ পুল সাইডে বসে দেন ঘুমাতে যেতাম।

ডে ২ (১৭ সেপ্টেম্বর) – ড্রিমি গিলি

সকাল ৯ টায় Padang Bay পোর্ট থেকে গিলির উদ্দেশ্যে ফাস্ট বোট ছাড়ে। আমাদের ফাস্ট বোটের নাম ছিলো পুতরি আইল্যান্ড। সকাল ৬টায় ফাস্ট বোট এজেন্সির মাইক্রোবাস এসে আমাদের হোটেল টেরেসের লবি থেকে তুলে নেয়। ফাস্ট বোটের বুকিং আমাদের ড্রাইভারই দিয়ে রেখেছিল। সেই ৫০০ ডলার এর ভিতর ইনক্লিউডেড। চাইলে নিজেরাও বুকিং দেওয়া যায় বালিতে পৌছে। আমরা ঝামেলা এড়াতে আমাদের ড্রাইভার কেই দায়িত্ত দিয়ে দিয়েছিলাম।সেই ফাস্ট বোট জার্নিটাই ইনক্রেডিবল ছিল।পুরো ২ টা ঘন্টা বোট এর ছাদে ছিলাম।নীল জল,উত্তাল সমুদ্র।

গিলি ত্রাওয়াংগানেও সবাই পার্টি করতে যায়। সো বোটেও পার্টি পার্টি ইমেইজ ছিল। যারা এক্সট্রিমলি নির্জনতা পছন্দ করেন তারা বোট এর ছাদে না উঠে নিচে বসে ঝিমুতে পারেন। বেলা ১১ টায় আমরা গিলিতে পৌছাই।সেখান থেকে কিছু ডলার ভাংগাই।এক্ষেত্রে একটু সাবধান থাকা ভাল। সেখানে ডলার প্রতি ১৪,৭০০ রুপি পেয়েছিলাম,আর ডলার ভাঙ্গানোর পরে লাখ রুপীর নোটগুলো ভালভাবে গুনে নেওয়া ভালো। নোট জাল হয় না,কিন্তু ভাঙ্গানোর সময় দুই একটা নোট এদিক সেদিক হতে পারে,তাই সাবধান থাকা ভালো। ঘোড়ার গাড়িতে করে পোর্ট থেকে উটারা ভিলাসে পৌছাই। ২০ মিনিট এর মত লাগে।

একটু দূরে মেইন পয়েন্ট থেকে। হানিমুনারসদের জন্য বেস্ট। বাট পার্টি করতে গেলে এত দূরে না থাকাই ভাল। ভিলায় ঢুকে মনটাই ভাল হয়ে গেল।এত্ত সুন্দর! এত্ত এত্ত সুন্দর।ছিমছাম,গোছানো,বিশাল বড় রুম,পেছনে বিশাল ক্লজেট,পাশে বিশাল পাথরের তৈরি বাথরুম।পার্ফেক্ট! এর চেয়ে বেশি সুন্দর কিছু আশা করিনি। প্রাইভেট পুলে কিছুক্ষন থেকে বাথ নিয়ে রেডি হয়ে বের হয়ে পড়ি আমরা আইল্যান্ড হপিংয়ে। স্বপ্নের মত সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে ওরা দ্বীপটাকে। আর ঘুরে বেড়ানোর একমাত্র যান বাইসাইকেল। আমাদের ভিলা থেকে ফ্রি দুইটা সাইকেল দেয় আমাদের দুই দিনের জন্য।কিন্তু আমি আমার ওয়াইফকে পেছনে নিয়ে পুরো সময়টাই ঘুরেছি,বিকেলটা কাটাই গিলি এক্সাইল নামের একটা সানসেট বারে বসে। সেই প্রতিক্ষীত গিলি সুইংয়ে অসংখ্য ছবি তুলি। বিচে বসে মাউন্ট আগুংয়ের পেছনে সূর্যের অস্ত যাওয়া দেখি। পুরো আইল্যান্ডের ৭০% ঘুরছি প্রথম দিন।রাতে সি ফুড ডিনার করি বিচ সাইড রেস্তোরাঁয়।

একদম সাগরের পানি যেখানে আছড়ে পড়ছে,সেখানে আমাদের বসার টেবিল,সাথে লাইভ মিউজিক,সেই সময় এর অনুভুতিগুলো বলে বোঝানো যাবে না। রাতে ফেরার সময় পরের দিন স্নোরকেলিং এর বুকিং দেই।দুইজনের জন্য টোটাল ২ লাখ রুপি (১২০০ টাকা প্রায়)।পর দিন সকাল ১০ টায় গ্লাসবোট নিয়ে যাবে আমাদের।

বালি, ইন্দোনেশিয়া

ডে ৩ (১৮ সেপ্টেম্বর)

ঘুম থেকে উঠে ভিলার কাউন্টারে ফোন করি ব্রেকফাস্ট দিয়ে যাওয়ার জন্য। ব্রেকফাস্ট এর অপশন কন্টিনেন্টাল আর ইংলিশ/আমেরিকান,আমরা প্রথম দিনের জন্য কন্টিনেন্টাল বেছে নেই। আধ ঘন্টার ভিতর রাজকীয় কন্টিনেন্টাল ব্রেকফাস্ট চলে আসে।পুল সাইডে বসে ব্রেকফাস্ট করে স্নোরকেলিং এর জন্য রওনা হই। সাইকেল পোর্টের পাশে পার্ক করে তালা দিয়ে দেই। গ্লাসবটম বোটে করে স্নোরকেলিংয়ের জন্য যাই। তিনটা স্পট এ নিয়ে যায়।

সাঁতার না জানায় আমার এক্সপেরিয়েন্স অত ভাল ছিল না। লাইফ জ্যাকেট পড়ে স্ট্রাগল করতে হইছে রীতিমতো। বাট এটা না করলে অনেক বড় জিনিস মিস হতো। এই সুযোগ আর কখনো পাই কি না পাই। এদিন লাঞ্চ করি গিলি এয়ারে। ৩ টার দিকে ফিরে আসি আবার হোটেলে। রেস্ট নিয়ে বের হয়ে পড়ি সাইকেল নিয়ে বাকি আইল্যান্ড ঘুরতে। পুরো আইল্যান্ড ঘোরা শেষ করে ডিনার করি আরেকটা সী সাইড রেস্টুরেন্টে। ডিনার করে একটা বারে বসি কিছুক্ষন। রাত ১১টা নাগাদ ভিলায় ফিরি।অনেকটা সময় পুল সাইডে শুয়ে ছিলাম। ভাবতেই কষ্ট হচ্ছিল যে গিলি তে দিন শেষ। পর দিন সকাল ১১ টায় ফেরার বোট।

ডে ৪ (১৯ সেপ্টেম্বর)

সকালে আবার একটা ফাটাফাটি ইংলিশ ব্রেকফাস্ট দেয় ওরা। খেয়ে দেয়ে ঘোড়ার গাড়ি তে করে চলে আসি পোর্টে। বোট ছাড়ে ১১ টায়।দুপুর ২ঃ৩০টায় এগেইন হোটেল টেরেসে চেইক ইন করি। তারপর ফ্রেশ হয়ে সাইকেল নিয়ে বের হয়ে যাই দুই জন মিলে। এদিন পান্তাই কুতা বীচ আর কার্তিকা প্লাজা টা ঘুরলাম। রাতে ডিনার করে হোটেলে ফিরলাম।

এই গল্পের শেষ হয়নি এখনো। বালি নিয়ে যে পূর্ণাঙ্গ ট্রিপের খোঁজে ছিলাম, তেমনই একটি ট্রিপ দেয়ার চেষ্টা করেছি। তাই গল্পটা একটু বড়। পরবর্তী আর্টিক্যালে বাকি গল্পটা হবে। সবার ভ্রমণ হোক সুন্দর৷

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button