অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

সম্পদের ভাণ্ডার নিয়েও যে দেশের মানুষ ভুগছে দারিদ্র‍্যের কষাঘাতে!

‘কঙ্গো’ দেশটার নাম শুনলে সবার আগে মাথায় কি আসে? গৃহযুদ্ধ, শান্তিরক্ষা মিশন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী- তাই তো? এর বাইরেও কঙ্গোর আলাদা একটা পরিচয় আছে, লক্ষ লক্ষ দরিদ্র‍্য মানুষে ভর্তি এই দেশটার মাটির নিচে খনিজ সম্পদের যে প্রাচ্যুর্য্য আছে, সেটা ঠিকঠাক ব্যবহার করতে পারলে কঙ্গো হয়তো ইউরোপের কোন ধনী দেশকেও ছাড়িয়ে যেতে পারতো আয়-উন্নতির দিক থেকে।

আয়তনের দিক থেকে কঙ্গো হচ্ছে বিশ্বের এগারোতম বৃহত্তম রাষ্ট্র। প্রায় সাড়ে তেইশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের বড় একটা অংশ জুড়ে আছে গহীন জঙ্গল এবং নদী। প্রায় আট কোটি মানুষের বসবাস এই দেশে, এদের বেশিরভাগই দরিদ্র‍্য লোকজন। গৃহযুদ্ধের কারণে কঙ্গো কখনোই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারেনি, সমৃদ্ধিও অর্জিত হয়নি তাই।

আফ্রিকার মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা কঙ্গো টিকে আছে কঙ্গো নদীর কারণে। নদীর নামেই নামকরণ করা হয়েছে কঙ্গো দেশটার। অবশ্য, ১৯৯৭ সালের আগে এই দেশের নাম ছিল জায়ার। মাছ ধরা, বানিজ্যিক পণ্য আনা নেয়া থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা- সবকিছুর জন্যেই কঙ্গো নদীর ওপরে নির্ভরশীল থাকতে হয় তাদের।

‘কঙ্গো’ পুরো বিশ্বেরই অন্যতম স্রোতস্বিনী নদী। কোথাও কোথাও কঙ্গো নদীর স্রোত এতই প্রবল যে, সেখানে মানুষ বা নৌকা নামানো হলে ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে এক মূহুর্তও লাগবে না। এই স্রোতের গতিকে কাজে লাগিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে হাইড্রোলিক পাওয়ার প্রোজেক্ট, সেই বিদ্যুতের আলোতেই আলোকিত হচ্ছে কঙ্গো।

বাংলাদেশের সাথে একটা জায়গায় কঙ্গোর বেশ ভালো মিল আছে। দুই দেশেরই শহরাঞ্চল ঘনবসতিপূর্ণ। মানুষজন দরিদ্রসীমার নিচে বাস করে। রাজধানীতে ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যাম আছে দুই দেশেই, আছে লোডশেডিংও। বাংলাদেশের মতো কঙ্গো-কেও নদীমাতৃক দেশই বলা যায়।

অন্য অনেক আফ্রিকান দেশের মতো কঙ্গোর লোকজনও দারুন আমুদে। পকেটে টাকা নেই, পেটে খাবার নেই, তাতে কি? ফুর্তির জায়গায় সব ঠিকঠাক। কোট-প্যান্ট পরে অদ্ভুত সাজ দিয়ে উৎসব-অনুষ্ঠানে তারা নেচে-গেয়ে বেড়াচ্ছে, কোন ভাবনা-চিন্তা নেই!

টাকা দিয়ে এখানে সব কাজ হয়। চুরি-ডাকাতি-খুন সবই আছে। দুর্নীতি আছে, আছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও। ক্ষমতাবানেরা চাইলে যে কোন কিছুই করতে পারে কঙ্গোতে। টাকা ঢাললে বাঘের দুধ থেকে মেয়েমানুষ, সবই পাওয়া যায় হাতের মুঠোয়।

এ তো গেল শহরাঞ্চলের কথা। কঙ্গোর জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ বাস করে গ্রামে। গ্রাম বলতে আমরা যেমন ‘ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়’ ভাবি, তেমন কিছু নয় আসলে। গ্রাম মানে এখানে গহীন জঙ্গল বা পাহাড়ের উপত্যকায় একসঙ্গে কয়েকশো মানুষের বসবাস।

আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া নেই সেখানে, নেই শিক্ষার উপস্থিতিও। প্রাচীন রীতিনীতি আর কুসংস্কার মেনে চলে এসব মানুষ। জীবন এখানে যুদ্ধের আরেকটা নাম। প্রকৃতি আর পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয় প্রতিটা মূহুর্ত। বন্য জন্তু শিকার করাটাই কঙ্গোর গ্রামের অধিবাসীদের প্রধান কাজ। আদিম মানুষের মতো দলবেঁধে শিকারে বেরোয় তারা।

ক্যামেরায় ছবি তোলা বা ভিডিও করতে চাইলে তাদের অনেকেই আপত্তি তোলে। কারণ তারা বিশ্বাস করে, কোন মানুষের ছবি তোলা হলে তার নাকি আয়ু কমে যায়।

কঙ্গোতে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে বাংলাদেশী সেনারা

আগেই বলেছিলাম, কঙ্গো হচ্ছে খনিজ আর প্রাকৃতিক সম্পদের বিশাল এক ভাণ্ডার। এদেশের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকে সাদা রঙের সোনা, যার আরেক নাম রাবার। কেউ রোপন করেনি, প্রাকৃতিকভাবেই কয়েক হাজার মাইল এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে রাবারের ঘন জঙ্গল। সেই জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করা হয় রাবার, তারপর সেগুলো শহরে পাঠানো হয় গাড়ির টায়ার বানানোর জন্যে। কঙ্গোর রাবারের সুখ্যাতি পুরো আফ্রিকাজুড়েই আছে।

কঙ্গোর বুকে ছড়িয়ে থাকা বিশাল আয়তনের রেইনফরেস্ট হচ্ছে কঙ্গোর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সম্পদ। কিন্ত গৃহযুদ্ধ আর স্বৈরতন্ত্রের কবলে পড়া কঙ্গো সেসব সম্পদকে ব্যাবহার করতে পারেনি পুরোপুরি, এখনও পারছে না, কারণ দেশের ভেতরে অস্থিতিশীল অবস্থা।

দক্ষিণ আমেরিকার এল ডোরাডো’র মতো কঙ্গোর গহীন জঙ্গলেও কাঁচা স্বর্ণ পাওয়া যায় বলে গুজব উঠেছে অনেকবার, সেই স্বর্ণের খোঁজে অভিযানেও নেমেছেন অনেক অভিযাত্রী, কিন্ত পাওয়া যায়নি তেনন কিছুই। প্রতিবছর জঙ্গল সাফারি করতে কঙ্গোতে আসেন অনেক পর্যটক। তবে গৃহযুদ্ধের কারণে কঙ্গোর পর্যটন শিল্পও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি সেভাবে।

প্রায় চুয়ান্ন লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছে কঙ্গোর গৃহযুদ্ধে, যেটা শুরু হয়েছিল ষাটের দশকে। চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছে এই যুদ্ধ, এখনও অনেক সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপ মাথাচাড়া দেয় মাঝেমধ্যেই। শরণার্থী শিবিরে এখনও দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক মানুষ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্যে শান্তি মিশনে বাংলাদেশ সহ অন্য অনেক দেশের সেনারা কাজ করছেন সেখানে।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের সবচেয়ে বড় মিশনটা পরিচালিত হয় কঙ্গোতে। বিভিন্ন দেশের প্রায় পঁচিশ হাজার সৈন্য নিয়োজিত আছেন সেখানে, রিফিউজি ক্যাম্পে এই মূহুর্তে প্রায় সাড়ে চার লক্ষেরও বেশি মানুষ বসবাস করছেন, কারণ তাদের যাওয়ার কোন জায়গা নেই।

আট কোটি মানুষের এই দেশটায় প্রায় দুইশো আলাদা জাতিস্বত্বার মানুষের বসবাস, এদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভাষা আছে। প্রায় আড়াইশোরও বেশি ভাষায় কথা বলে কঙ্গোর লোকজন। সরকারী ভাষা অবশ্য ফ্রেঞ্চ। অফিস আদালতে এই ভাষাটাই ব্যবহার করা হয়, তবে সরকারী হিসেব মতে, প্রায় ২১৫টি ভাষা প্রচলিত আছে কঙ্গোতে। জনসংখ্যার শতকরা ৯৫ ভাগই খ্রিষ্টান।

জেনে অবাক হবেন, কঙ্গোর মোট যে পরিমান রাস্তা আছে, এরমধ্যে শতকরা মাত্র দুই থেকে তিন শতাংশ রাস্তা পাকা। বাকি সবই কাঁচা রাস্তা। শহরাঞ্চলের বাইরে বিদ্যুৎ নেই কোথাও, এমনকি শহরের অভিজাত এলাকার বাইরেও বিদ্যুতের সংযোগ পায় খুব কম সংখ্যক মানুষ। জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী, কঙ্গীর মাত্র দশ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ পান।

মাটির নিচে স্বর্ণ, টিন, টাংস্টেন সহ আরও অনেক মূল্যবান ধাতুর বিশাল খনি আছে কঙ্গোতে। কিন্ত প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি না থাকায় সেগুলো উত্তোলন করে কাজে লাগানো যাচ্ছে না কোনভাবেই। ব্যাপারটা হয়ে গেছে গ্রন্থগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধনের মতোই। এদিকে বিদ্রোহী গ্রুপগুলো এসব সম্পদ তুলে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ আছে, এসবের ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে ঝগড়ার কারণেই নাকি কঙ্গোতে শান্তি ফিরে আসছে না কোনভাবেই। সেই শান্তিটা কবে ফিরবে, কঙ্গোর মানুষ জানে না এখনও…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button