মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

‘খেলার সাথে রাজনীতি মেশাবেন না’ এবং কুমিল্লার নির্লজ্জ পাকিস্তান প্রীতি!

তামিমের দুর্দান্ত এক ইনিংসে ভর করে বিপিএলের শিরোপা ঘরে তুলেছে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স। মাঠেই আনন্দ উদযাপন করে নিয়েছেন ক্রিকেটারেরা, দলের মালিকপক্ষও মাঠে নেমে এসেছিলেন খেলোয়াড়দের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে। তবে সেটা করতে গিয়েই জঘন্য একটা মূহুর্তের সৃষ্টি করেছেন সাবেক বিসিবি সভাপতি এবং বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। কুমিলা ভিক্টোরিয়ান্স ফ্র‍্যাঞ্চাইজির মালিক তিনিই, তবে কাগজে-কলমে সবকিছু দেখভাল করেন মোস্তফা কামালের মেয়ে নাফীসা কামাল। শিরোপা জয়ের পরে কুমিল্লার পাকিস্তানী ক্রিকেটার শহীদ আফ্রিদীকে জড়িয়ে ধরার একটা ছবি নিয়েই আসলে আপত্তিটা।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, আনন্দের আতিশয্যে আফ্রিদির বুকে ঠাঁই নিয়েছেন মুস্তফা কামাল, আফ্রিদীও একেবারে বড় ভাইয়ের মতো তাকে বাহুর সংযোগস্থলে জায়গা দিয়েছেন! মুজিবকোট পরিহিত মুস্তফা কামালের মুখের এক্সপ্রেশান দেখে মনে হচ্ছে, আফ্রিদী না থাকলে কুমিল্লার শিরোপা জেতা সম্ভবই হতো না! মুস্তফা কামাল যে আবেগ নিয়ে আফ্রিদীকে জড়িয়ে ধরেছেন, এতটা আবেগ বোধহয় শিরি-ফরহাদ কিংবা লাইলি মজনুর প্রেমেও ছিল না!

মুস্তফা কামাল কি ভুলে গিয়েছিলেন যে তিনি বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন মন্ত্রী? অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতো গুরত্বপূর্ণ একটা দপ্তর সামলানোর ভার যাকে দেয়া হয়েছে, সেই মানুষ যদি নিজের প্রটোকল ভুলে মাঠে নেমে পাকিস্তানী খেলোয়াড়দের অতি আবেগে জড়িয়ে ধরতে থাকেন, সেটা যে কতটা লজ্জার বিষয় আমাদের জন্য, এই ব্যাপারটা কি তিনি জানেন? আফ্রিদীর বুকে তার লেপ্টে থাকা ছবিটা দেখে আমাদের মাথা যে হেঁট হয়ে যায়, সেটা কি তিনি বুঝতে পারেন না?

আ হ ম মুস্তফা কামালের পাকিস্তানপ্রীতি নতুন কোন বিষয় নয়। তিনি যখন বিসিবি সভাপতির পদে ছিলেন, তখনও পাকিপ্রেমের নমুনা দেখিয়েছেন। আইসিসির সভাপতি হবার নেশায় পাকিস্তানের ভোট পাবার লোভে জঙ্গীবাদে আক্রান্ত এই দেশটাতে সাকিব-তামিমদের পাঠানোর বন্দোবস্ত তো প্রায় করেই ফেলেছিলেন! শেষ মূহুর্তে ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রতিবাদের মুখে সেই সফর বাতিল করা হয়েছিল, তবে প্রমীলা ক্রিকেট দল ঠিকই পাকিস্তান সফর করে এসেছে।

বিপিএলে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের মালিক তারা, দলটাকে পাকিস্তানের-বি টিম বানিয়ে ফেলেছেন মোটামুটি। এই একটা জায়গায় বাবা-মেয়ের দারুণ মিল। শহীদ আফ্রিদী, ওয়াহাব রিয়াজদের মতো বাতিল হয়ে যাওয়া ক্রিকেটারদের পূনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স। অন্যান্য দল যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড বা আফ্রিকান খেলোয়াড়দের দলে ভেড়াচ্ছে, তখন কুমিল্লা তাদের পাকিস্তানপ্রীতি নিয়েই ব্যস্ত। যেন দলে দু-চারটা পাকিস্তানী খেলোয়াড় না থাকলে ব্যাপারটা পূর্ণতাই পায় না!

আ হ ম মুস্তফা কামালের নির্বাচনী আসন কুমিল্লায়। সেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তার নামে পোস্টার-ব্যানার লাগিয়েছে, সেসবে মুস্তফা কামালের নামের আগে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ খেতাবটা উল্লেখ করা আছে বিশেষভাবে। একজন মুক্তিযোদ্ধা কি করে পাকিস্তানের প্রেমে অন্ধ হন? সরকারের মন্ত্রী থাকা অবস্থায় কি করে তিনি একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট জেতার আনন্দে হিতাহিত জ্ঞান ভুলে পাকিস্তানী এক ক্রিকেটারের বুকে আশ্রয় নেন? নিজের আত্মসম্মানের কথা নাহয় না’ই ভাবলেন তিনি, যে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব তিনি করেন, যে রাজনৈতিক দলটার কারণে তিনি মন্ত্রীত্ব ভোগ করছেন, সেই দলের আদর্শকে তিনি কি করে অপমান করেন?

আ হ ম মুস্তফা কামাল ক্রিকেটের মানুষ, শহীদ জুয়েলের কথা তার অজানা থাকার কথা নয়। সেই জুয়েল, রাজপুত্রের মতো ছেলেটা, আজাদ স্পোর্টিঙের হয়ে মাঠে শটের ফুলঝুরি ছোটানো সেই যুবক। জুয়েল স্বপ্ন দেখেছিলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি দেশের হয়ে খেলবেন, অধিনায়কত্ব করবেন! জুয়েলের স্বপ্ন পূরণ হয়নি, পাকিস্তানী হায়েনারা গলাটিপে মেরে ফেলেছিল সেই স্বপ্নটাকে।

ক্র‍্যাকডাউনের রাতে শহীদ আজাদদের মগবাজারের বাসা থেকে পাকিস্তানী সেনাদের হাতে ধরা পড়া জুয়েল ফিরে আসেননি কখনও। জুয়েলের আহত হাতের আঙুলগুলো মুচড়ে দিয়েছিল হায়েনারা, যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠেছিলেন জুয়েল, কিন্ত মাথা নত করেননি এক মূহুর্তের জন্যেও। অত্যাচারের স্টিম রোলার সয়েছেন, জীবনটাও উৎসর্গ করেছেন দেশের জন্যে, তবুও সঙ্গী-সাথীদের নাম উচ্চারণ করেননি একবারের জন্যেও!

ক্রিকেট সংগঠক শহীদ মুশতাকের কথা কি মনে আছে মোস্তফা কামালের? অপারেশন সার্চলাইটের রাতে যাকে গুলি করে মেরে ফেলেছিল পাকিস্তানী সেনারা, তিনদিন ধরে তার লাশটা পড়েছিল ক্লাব অফিসের বাইরে। জনাব মুস্তফা কামাল, জুয়েল-মুশতাকদের রক্তের ওপর দিয়ে হেঁটে যে দেশটা আমরা পেয়েছি, সেই দেশের মন্ত্রী হয়ে আপনি যখন পাকিপ্রেমে অন্ধ হয়ে পাকিস্তানী এক খেলোয়াড়ের বুকে আশ্রয় নেন, তখন ঘৃণায় আমাদের গা রি রি করে ওঠে। জুয়েল-মুশতাকদের অকথ্য অত্যাচার করা হয়েছিল, মেরে ফেলা হয়েছিল তাদের! আর আপনি কিনা পাকিস্তানীদের বুকে আশ্রয় নিচ্ছেন!

এসবের কথা বাদই দিলাম। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা- পাকিস্তান তো এখনও পেছনে লেগে আছে বাংলাদেশের ক্ষতি করার জন্যে। আইএসআই জোর চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে, বাংলাদেশকে একটা জঙ্গীবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্যে। আপনার নেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই, এমন নির্লজ্জ পাকিপ্রেম দেখানোর আগে সেসব কথা কি আপনার মনে পড়ে না মাননীয় মন্ত্রী? নাকি আপনিও ‘মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই’ কিংবা খেলার সাথে রাজনীতি মেশাবেন না’ তত্বের অনুসারী হয়ে সব ভুলে যান? কিন্ত আমরা যে ভুলতে পারি না, আমরা শুওরের সাথে সহবাসের ফতোয়া অস্বীকার করি, আমরা পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্বের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি!

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button