ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

উন্নত দেশগুলোতে কেন কোচিং আছে?

কিছুদিন আগে জাপান ফেরত এক বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিলো৷ কথায় কথায় যা হয় সচরাচর, আমরা উন্নত দেশের সাথে নিজেদের দেশের তুলনা করি এবং নিজেরা কেন পিছিয়ে আছি সেটা নিয়ে কথা উড়িয়ে চায়ের কাপে ঝড় তুলি। আমার সেই বন্ধুটি জানালো, জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তার মুগ্ধতার কথা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, জাপান কেন এতটা এগিয়ে গেছে? ওখানকার শিক্ষকদের পড়ানোর ধরণ নিশ্চয়ই খুব আলাদা। ওখানে নিশ্চয়ই আমাদের দেশের মতো কোচিং সেন্টার নেই?

আমার বন্ধুটি তার অভিজ্ঞতার আলোকে জানালো, জাপান এমন একটি দেশ, যেখানকার মানুষ ভীষণ কষ্টসহিষ্ণু। ওরা কেন এগিয়ে আছে, তা বুঝতে হলে দেখতে হবে তার কিভাবে কাজ করে। একজন জাপানি যে পরিমাণ কষ্ট সহ্য করে, পরিশ্রমী মনোভাব নিয়ে কাজ করে তার শুরুটা কিন্তু হুট করে হয় না। এখানে এদের শিক্ষাব্যবস্থার কথা উল্লেখযোগ্য। জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা পৃথিবীর শীর্ষ শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর একটি। এখানে ছাত্রদের স্কুল পর্যায়ে অনেক পড়াশুনা করতে হয়।

কিন্তু, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, প্রতিযোগিতায়, ইনোভেশনে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকতে তারা স্কুলের বাইরে প্রাইভেট পড়ে। এই ব্যবস্থাকে তারা ‘জুকু’ বলে অভিহিত করে। এটি অনেকটাই কোচিং সেন্টারের মতো। এই ‘জুকু’ দুইরকম হয়। ধরুন, কেউ ব্যক্তিগত সৃজনশীলতাকে উন্নত করতে গান শিখছে, মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট বাজানো শিখছে কিংবা অন্য যেকোনো ধরণের ক্রিয়েটিভ কাজ। স্কুলের বাইরে আরো গভীরে গিয়ে শেখবার জন্য তারা এ ধরণের ‘জুকু’তে যায়। আরেকধরণের ‘জুকু’ সহশিক্ষা আছে যা সরাসরি একাডেমিক পড়াশুনার সাথে সম্পৃক্ত।

অন্যরকম বিজ্ঞানবাক্স

সহজভাবে যদি বলি, স্কুলে, কলেজে যা পড়ানো হয় সেইসবই আরো ভালভাবে হজম করার জন্য তারা এধরণের ‘জুকু’তে যায়। জাপানের মানুষের মধ্যে ‘জুকু’ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে তবে অধিকাংশ মানুষ ‘জুকু’কে ‘দ্বিতীয়’ স্কুল হিসেবে বিবেচনা করে যা মূলধারার স্কুলের শিক্ষার সাথে প্রতিযোগিতায় নিজেকে এগিয়ে রাখার মাঝখানে যে শিক্ষার গ্যাপ তা দূর করে।

জাপান ফেরত বন্ধুর কথাসূত্রে হয়ত জানতে পারলাম জাপানের শিক্ষাব্যবস্থার কথা। কিন্তু, ডিজিটাল বাংলাদেশে বসে বিশ্বের প্রতিটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কেই জানা যায় খুব সহজে। আমার কাছে মনে যারা শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন, বাস্তবায়নের সাথে জড়িত তাদের আরেকটু গুগল ব্যবহার করা দরকার আছে। আমরা যখন প্রায়ই বলি, আমরা দেশকে উন্নত করব, শিক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্বমানের করব তখন আমাদের দেখতে হবে বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা যেসব দেশে আছে, তারা আসলে কি করছে। তারা কেন এগিয়ে আছে।

বর্তমান পৃথিবীতে শিক্ষাব্যবস্থার রোলমডেল যদি ধরা হয়, তাহলে ফিনল্যান্ডের নাম। কিন্তু, আপনি যদি ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে রোলমডেল হিসেবে নেয়ার মতো অবস্থা থেকে আমরা অনেক অনেক যোজন ব্যবধানে দূরে। কারণ, ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা আসলে শেখানোর ব্যবস্থা। সেখানে, অল্প বই, কম জানো, কিন্তু যা জানো সলিড জানো এমন টাইপ নীতি তাদের। এখানে শিশুদের উপর চাপ নেই। রেজাল্টের চাপ নেই। গাদা গাদা হোমওয়ার্কের বোঝা নেই। এখানে শিশুদের তিন থেকে ছয় বছর পর্যন্ত একজন শিক্ষকের কাছে পড়তে হয়। খেলাটা এখানেই। ফিনল্যান্ড সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় শিক্ষক নিয়োগে৷ আমাদের দেশে শিক্ষকতায় যারা আসেন, তাদের অনেকেরই আচরণ দেখে মনেই হয় না তারা আসলে পেশাটাকে ভালবাসেন। ফিনল্যান্ডে শিক্ষকতা রীতিমতো স্বপ্নের পেশা। আমাদের দেশে বিসিএস পাশ করা যেমন কষ্টসাধ্য, সে দেশে শিক্ষক নিয়োগ এমনই। কঠোর ফিল্টারিংয়ের মধ্য দিয়ে সেরা মানুষদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কিছুটা বিভ্রান্তিকর। আমরা চাই সৃজনশীলতা, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি কিন্তু, সৃজনশীল প্রশ্ন বোঝেন এমন শিক্ষকই নেই আমাদের দেশে। আবার একই সাথে আমাদের এখানে প্রচুর পড়ার চাপ। সৃজনশীলতা চাই, আবার শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন রেজাল্ট অরিয়েন্টেড করে ফেলেছি আমরা সৃজনশীলতার চেয়ে এখানে জিপিএ ফাইভ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার উপাদান জাপানের মতো, কিন্তু আমরা আসলে জাপানের শিক্ষাব্যবস্থাকেও বুঝতে পারিনি ঠিকমতো হয়ত।

একই ধরণের আরো কয়েকটা দেশ আছে, যারা শিক্ষাব্যবস্থায় বিশ্বে ঈর্শনীয় অবস্থায় আছে। সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়ার নাম আমরা নিতে পারি। দক্ষিণ কোরিয়ায় ৮১.১ শতাংশ ছাত্রছাত্রী কোচিং সেন্টারের সাহায্য নিয়েছে (২০১৪ সালের তথ্যমতে)। এই দক্ষিণ কোরিয়ান শিক্ষাব্যবস্থা পৃথিবীর সেরাদের একটি। এখানে স্কুলে অবশ্য ফেল করলেও পরের শ্রেণীতে অগ্রসর হতে পারব ছাত্ররা। কিন্তু কলেজে পড়বার জন্য তাদের কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়৷ ফলে, স্কুলের শিক্ষার বাইরে গিয়ে আরেকটু ভাল ফলের আশায় এই দেশটিতে দীর্ঘ কয়েকযুগ ধরেই ছায়াশিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে কোচিংয়ের বিস্তার ঘটেছে। এখনো এই ধারাটির জনপ্রিয়তা কমেনি। ইংল্যান্ডের লন্ডনের মতো জায়গায়ও ৩৭% ছাত্রছাত্রী বলেছে তারা স্কুলের বাইরে ছায়াশিক্ষা কার্যক্রমের সাহায্য নিয়েছে৷ আপনি সিঙ্গাপুরে যান। কোনো ছাত্রকে জিজ্ঞেস করেন, স্কুলের ক্লাসের পর তাদের প্ল্যান কি? উত্তর আসবে, তারা স্কুলের পর প্রাইভেটে ক্লাস করতে যাবে।

অন্যরকম বিজ্ঞানবাক্স

এই দেশগুলোর পৃথিবীর উন্নত দেশের তালিকায় এবং এদের শিক্ষাব্যবস্থা সবচাইতে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত৷ এসব দেশে পড়ালেখা করতে যাওয়া অনেকের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের দেশগুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এত বিখ্যাত, এত উন্নত হবার পরেও সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের ছায়াশিক্ষাতে কেন যেতে হয়? স্কুলের পাশাপাশি তারা কোচিংয়েও কেন যোগ দিচ্ছে? কারণ, কি স্কুলে স্যাররা পড়াতে পারে না? তা নয় নিশ্চয়ই। তাদের ক্ষেত্রে মূল কারণ, তারা নিজেদের আরেকটু এগিয়ে রাখতে চায়। পড়াটাকে আরো ভালভাবে হজম করতে এই ছায়াশিক্ষা কার্যক্রমগুলো তাদের সাহায্য করে।

আমাদের দেশে অনেককে বলতে শুনি, কোচিং নাকি শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ফেলছে। কোচিংয়ের জন্য শিক্ষাব্যবস্থার অধঃপতন! একটা গোটা শিক্ষাব্যবস্থার ভুলকে ঢাকতে শুধু কোচিংয়ের উপর সব দোষ ঠেলে দেয়াটা কেমন কৌশল তাদের? হুট করে সৃজনশীল পদ্ধতি আবিষ্কার করা হলো, শিক্ষাজীবনের দশবছরে একটু পর পর বোর্ড পরীক্ষা দিয়ে ছাত্রদের প্রেশার বাড়ানো হলো, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব – সর্বোপরি শিক্ষাব্যবস্থার উপরই অনেক কাজ করার আছে। স্কুলে আপনি এমন শিক্ষক দিয়ে ক্লাস করাচ্ছেন, যে শিক্ষকতাকে দায় ভাবে না। প্যাশন ভাবে না। ছাত্র কতটুকু শিখলো, সেটা নিয়ে গভীরে গিয়ে ভাবার দায় তার নেই।

সবাই এক না অবশ্যই, তবে অবস্থাটা সুখকরও না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত হলে, সিঙ্গাপুর, জাপানের মতো হলে কোচিং হয়ত শুধু সহায়ক হিসেবে কাজ করত কিংবা কাজ করার দরকার আদৌ আছে কিনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠানো যেত। কিন্তু, বর্তমান অবস্থায় কোচিং সেন্টার ছাত্রছাত্রীদের জন্য অনেক বড় সাপোর্টের জায়গা। এখানে কোচিংয়ের উপর শিক্ষাব্যবস্থার গলদের দায় চাপানো পুরোপুরি অবিবেচকের মতো চিন্তাভাবনার বহিঃপ্রকাশ হবে। কোচিং যদি শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসই করত, তাহলে জাপান, সিঙ্গাপুর, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইংল্যান্ড ইত্যাদি দেশগুলোতে এতদিনে শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি বিলুপ্তই হয়ে যেত!

Comments
Tags

Related Articles

Back to top button