মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

‘প্রশ্ন ফাঁস’ না, সমস্যার মূলে ‘উত্তর ফাঁস’!

প্রশ্ন ফাঁস তো বটেই, তারও আগে ছোটবেলা থেকে যে জিনিসটি ক্রমাগতভাবে আরো ভয়ংকরভাবে আমাদের সৃজনশীলতা নষ্ট করেছে, সেটি হচ্ছে উত্তর ফাঁস। ব্যাপারটা কীরকম একটু বুঝিয়ে বলি। 

ইংরেজি বিষয়ে একটা প্রশ্ন ছিলো। অনেকটা এরকম, একটা গল্পের দুই থেকে তিন লাইন দেয়া থাকবে। সেই দুই থেকে তিন লাইন থেকে বাকিটা উত্তর করতে হবে। বাকি গল্প শেষ করতে হবে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই প্রশ্নের উত্তরে স্যাররা কখনো বলেননি যে, যার গল্প যত ক্রিয়েটিভ হবে সে তত নাম্বার পাবে। স্যাররা বরং নাম্বার দিতেন যার গল্প যতটা বইয়ে দেয়া গল্পের কাছাকাছি যেতে পারবে তার ভিত্তিতে। গল্পের প্রথম ওই দুই তিন লাইন বই থেকে কমন না আসলেও সমস্যা নাই। স্যাররা একটা টেকনিক শিখিয়ে দিত। প্রথম দুই লাইনে যা-ই থাকুক, গল্পকে টেনে নিয়ে যেতে হবে কুমিরের ওই খাঁজ কাটা খাঁজ কাটা গল্পটার মতো।

উত্তর ফাঁসের ব্যাপারটা ধরতে পারছেন? যখন নির্দিষ্ট উত্তর ঠিক করাই থাকে, শিক্ষকরাও সৃজনশীলতা প্র‍্যাকটিস না করে মুখস্থ ফর্মুলা শিখিয়ে দেন, তখন এই শিক্ষার ফলাফল কি কখনো ভাল আসবে? আমাদের দেশে শিক্ষকদের একটা বড় অংশ সৃজনশীলতা বোঝেন না, সৃজনশীল প্রশ্ন করতে পারেন না। তার চেয়ে বড় কথা, শিক্ষক হিসেবে জ্ঞ্যান অর্জনের যে আনন্দ ছড়িয়ে দেয়াটা তাদের দায়িত্ব হবার কথা সেটা অনেকাংশে তারা পালন করতে পারছেন না।

এর কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে, অনেক কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে। প্রথমত, প্রশ্ন হলো আমাদের দেশে স্কুল, কলেজে যারা শিক্ষকতা করেন তারা কতটুকু প্যাশন নিয়ে এই পেশাটাকে ভালবাসেন? আমরা বলি, শিক্ষকদের স্থান মাথা পিতার পরেই। সুতরাং, তাদের মর্যাদাও সেই পরিমাণ হওয়া উচিত। কিন্তু, শিক্ষকদের পড়ানোর স্টাইল, ছাত্রদের মধ্যে জীবনবোধের শিক্ষা প্রবেশ করানোর তাড়না, পড়ালেখাকে আরো মজাদার করে তুলার তাড়না সেই অর্থে দেখা যায় না।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল স্তম্ভ হওয়ার কথা বোধহয় শিক্ষকদের। কিন্তু, তারা ঠিক ততটাই প্রেডিক্টেবল যতটা আমাদের ছোটবেলায় লেখা ‘এইম ইন লাইফ’ রচনা। আমাদের শেখানো হয়েছে, এইম ইন লাইফ রচনাতে লিখতে হবে আই ওয়ান্ট টু বি আ টিচার/ডক্টর। ভবিষ্যতে ডাক্তার হয়ে গ্রামের দিকে যেয়ে গরীব রুগীদের বিনা চিকিৎসায় সেবা করাই হবে আমার লক্ষ্য। এসব লিখলে চাক্কা নাম্বার। অথচ, ছোটবেলায় কি বিচিত্র ইচ্ছাই না থাকে আমাদের, কি নিষ্পাপ স্বপ্ন আমরা দেখি

অন্যরকম বিজ্ঞানবাক্স

গণিতের মতো ইন্টেরেস্টিং সাবজেক্টকে ভয় পেতে শুরু করি তখনই যখন দেখি, স্যারদের সমাধান করা উত্তর এর বাইরে অন্য কোনো উত্তর গ্রহণযোগ্য হতো না। অংক শেখার চেয়ে তখন নির্দিস্ট উত্তর মুখস্থ করার দিকে ঝুঁকে পড়েছিলাম। বাড়ির প্রাইভেট টিচার বলতো, যেভাবেই করো, উত্তর মিললেই হলো। আর স্কুলের স্যার বলতো, বেশি বুঝো নাকি, এইটা তো কিছুই হয় নাই। আমার নিয়মে না করলে নাম্বার পাবা না!

কিছু কিছু শিক্ষকের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিলো নিখুঁত সাজেশন দেয়ার ক্ষমতার কারণে। উনাদের কাছে প্রাইভেট পড়লে যে সাজেশন পাওয়া যায়,তাতে শতভাগ কমন পাওয়ার নিশ্চয়তা। আমাদের ঘুরে ফিরে সেই উত্তরগুলোই পড়তে হতো,যেগুলো প্রায় আসবে বলে নিশ্চয়তা থাকে। চিন্তা করে দেখুন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নামে সৃজনশীল হলেও আমরা শুধু শর্টকাটে ভাল রেজাল্ট করার সৃজনশীলতা খুঁজে বেড়াই। উত্তর ফাঁসের সিস্টেম আমাদের নিজস্বতা কুড়ে কুড়ে বিনষ্ট করে।

অথচ, ব্যাপারগুলো কি এমন হবার কথা ছিল? ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা দুনিয়ার সবচাইতে সেরা বলে বিবেচিত। তারা সবচাইতে বেশি বিনিয়োগ করে শিক্ষকদের উপর, সবচাইতে বেশি জোর দেয় শিক্ষকদের নিয়োগব্যবস্থায়। শিক্ষকতা পেশাকে তারা এত বেশি সম্মানের চোখে দেখে যে, দিনের পর দিন শিক্ষক হবার জন্য, শিক্ষকতা পেশায় উর্ত্তীণ হবার জন্য তারা কঠোর পরীক্ষা দেয়। কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে কেবল তারা স্বপ্নের এই পেশায় আসে। যখন এই পেশাটা তাদের স্বপ্ন, তাদের পড়ানোর সিস্টেমও তাই ততটাই দুর্দান্ত হয়, ততটা ডেডিকেশন তারা দেখান ক্লাসরুমে।

আমাদের দেশের শিক্ষক নিয়োগ লিখে গুগলে সার্চ করুন, লজ্জাজনকভাবে যাবতীয় দুর্নীতির খতিয়ান আপনার সামনে চলে আসবে। শিক্ষক নিয়োগের দুর্নীতি ভয়াবহ মাত্রা অতিক্রম করেছে। বিগত কয়েকবছরে পত্রপত্রিকায় ব্যপকভাবে প্রকাশিত হয়েছে এই খাতে দুর্নীতির চালচিত্র। যারা অনিয়মের মধ্যে দিয়ে এই পেশায় প্রবেশ করে, তারা কতটুকু নিয়ম শেখাবে, তারা কতটুকু শিক্ষা দান করবে সেই প্রশ্ন তো থেকেই যায়।

তারচেয়েও লজ্জাজনক হলো, প্রশ্নফাঁসের যে মহামারি আমাদের দেশে বিস্তার হয়েছে সেখানেও শিক্ষকদের নাম এসেছে বারংবার। একবার তো সাবেক শিক্ষামন্ত্রী একদম রাখঢাক না রেখেই বলেছিলেন, “প্রতিটি কেন্দ্রে পরীক্ষার দিন আধঘণ্টা আগে প্রশ্ন ছাপিয়ে পরীক্ষা নেয়ার কথা হয়েছে। কিন্তু আমরা যখন বুঝলাম, আসল প্রশ্নফাঁসকারী তো শিক্ষক, তখন আধাঘণ্টা আগে দিয়েই লাভ কী!”

অন্যরকম বিজ্ঞানবাক্স

আর দুর্নীতির হদিস পেতে বেশিদূর যেতে হবে না। জাতীয় দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের ৯ ফেব্রুয়ারি,২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদনে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্কুলে নিয়োগ থেকে এমপিওভুক্ত হতে ৪ থেকে ১০ লাখ টাকা অনৈতিক পথে খরচ করতে হয় শিক্ষকদের। আর এই নিয়োগ-বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে উপজেলা পর্যায়ে গড়ে উঠেছে সিন্ডিকেট। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “প্রধান শিক্ষক পদে এলাকাভেদে ১০ থেকে ১৫ লাখ, সহকারী শিক্ষক পদে ৮ লাখ, ভোকেশনাল শিক্ষক পদে ৭ লাখ ও মাদ্রাসায় শিক্ষক পদে নিয়োগ পেতে হলে ৫ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়া এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।”

শিক্ষাখাতে বিশেষত শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি আসলে ওপেন সিক্রেট। এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। এই যখন অবস্থা তখন আমরা কিভাবে আশা করব, এই পদ্ধতিতে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক নৈতিকতার দায় থেকে পড়ালেখা শেখাবেন? এর কনসিকুয়েন্স কি হয় তা আমরা দেখতে পাই যখন দেখি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাসরুমে শ্রেণীশিক্ষক থাকেন না, থাকলেও তাদের গাফেলতি লক্ষ্য করা যায়৷ তারা সেই গৎবাঁধা পড়ার স্টাইলের বাইরে বের হতে চেষ্টা করেন না। সৃজনশীলতার বদলে তারা উত্তর কি হবে সেটা ঠিক করে দেন৷ এই উত্তরফাঁস তো চলেই, সাথে কখনো কখনো এদের কেউ কেউ জড়িত হন প্রশ্নফাঁসে!

এই অনিয়ম কবে বন্ধ হবে? শিক্ষাখাতের স্তম্ভ যদি হয় শিক্ষকগণ, তাদের নিয়োগে দুর্নীতি বন্ধ করে এই খাতের মেরুদণ্ড সবার আগে ঠিক করাটাই অগ্রাধিকার হওয়া দরকার.. 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button