ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

গরুর চেয়ে মানুষের জীবন যখন তুচ্ছ; সীমান্তে বিজিবির গুলির নেপথ্যে কী?

ঠাকুরগাঁওয়ে বিজিবির গুলিতে তিনজন নিহত। গতকালের এই ঘটনাটি খতিয়ে দেখবার যথেষ্ট দরকার আছে। বিজিবির পক্ষ থেকে যে কারণ বলা হয়েছে, ঘটনার প্রকাশিত ভিডিওর সাথে সেই বিবরণে পার্থক্য আছে। বিজিবির দাবি, আত্মরক্ষায় তারা গুলি চালিয়েছে। আবার একই সাথে তাদের দাবি, যারা তাদের গুলিতে নিহত হয়েছে, সবাই গরু চোরাচালান দলের সদস্য। বিজিবির হাতের নিশানার তারিফ করতেই হয়। তেরো বছর বয়সী জয়নাল নামের যে ছেলেটাও গুলিতে মারা গেল, যে ছেলেটি অস্টম শ্রেণীতে পড়ালেখা করে সেও কি তবে গরু চোরাচালান দলের সদস্য? সেও কি তবে বিজিবির উপর আক্রমণ করতে এসেছিল? বিজিবি আত্মরক্ষায় তাই অব্যর্থ নিশানা দিয়ে তাকে মেরে ফেললো!

ঘটনার শুরু হয় গতকাল মঙ্গলবার। প্রতি সপ্তাহের এদিন এখানে হরিপুর উপজেলায় যাদুরানী হাট বসে। এই হাট গবাদিপশু কেনাবেচার জন্য বিখ্যাত। এই হাটেই বহরমপুর গ্রামের কিছু মানুষ গরু নিয়ে যাচ্ছিলেন বিক্রির উদ্দেশ্যে। বহরমপুর গ্রামের হাবিবুর রহমান জানান, তিনি গরুগুলো কিনেছিলেন দুই সপ্তাহ আগে। নেকমরদ হাট থেকে নিলামের মাধ্যমে কেনা দুটি গরু ক্রয়ের কাগজপত্রও তার সাথে ছিল। কিন্তু, বিজিবি সদস্যরা গরুগুলো ধরে নিয়ে যায়। বিজিবির দাবি এগুলো ভারতীয় গরু।

ঠাকুরগাঁও, সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা

বিজিবি সদস্যরা এই গরুগুলো তাদের ভটভটিতে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ ধরেন। গ্রামবাসীর সাথে এটি নিয়ে তর্কাতর্কি হয় বিজিবির সদস্যদের। বেতনা সীমান্ত থেকে এক – দেড় কিলোমিটার ভেতরে একটি মোবাইল টাওয়ারের পাশে স্থানীয় লোকজন বিজিবির গাড়ি আটকায়। তারা প্রতিবাদ জানায়। গরু ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে। একপর্যায়ে গাড়িটিকে ঘিরে অনেকমানুষ দাঁড়িয়ে যায়। একজনকে দেখা যায় বিজিবির গাড়িতে উঠে গিয়ে তর্কাতর্কি করতে। সে বাকিদেরও গাড়ির দিকে আসতে বলে৷ এর কিছুমুহুর্ত পরেই দেখা যায়, বিজিবির গাড়ি থেকে একটি গরু নেমে যাচ্ছে। গরুটি কি ক্ষুব্ধ মানুষরাই টেনে নামাচ্ছে নাকি, নিজ থেকে নেমে যাচ্ছে সেটা ভিডিওতে স্পষ্ট নয়। এরপরই আচমকা শুরুর হয় বিজিবির গুলি। মুহুর্মুহু গুলিতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সমবেত মানুষ। বিজিবির গুলিতে দুইজন স্পট ডেড, একজন নিহত হয় হস্পিটালে নিয়ে যাওয়ার পর। নিহতরা হলেন- গফুয়া ইউনিয়নের রুইয়া গ্রামে নজরুল ইসলামের ছেলে নবাব ও জহিরুলের ছেলে সাদেক মিয়া এবং বহরমপুর গ্রামের নূর ইসলামের ছেলে অস্টম শ্রেণী পড়ুয়া কিশোর জয়নাল। পরে সোহেল নামক আরো একজনের মৃত্যুর খবরও শোনা যায়।

বিজিবির দাবির সাথে ভিডিওর মিল সামান্য। বিজিবি দাবি করে তাদের উপর দুইতিনশ লোক ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা করে। ফলে তারা আত্মরক্ষায় গুলি করেন। কিন্তু, ভিডিওতে দেখা যায়, লাটিসোঠা আছে কিছু মানুষের হাতে, বাকিরা নিরস্ত্র। তারা বিজিবির ভটভটি ঘিরে শোরঘোল করছিলো। এক্ষেত্রে বিজিবি আত্মরক্ষার্থে ফাঁকা গুলি ছুড়তে পারত, কিন্তু, ভিডিওতে আমরা লক্ষ্য করলাম, প্রথমবার গুলি ছোঁড়ার পর মানুষ দিকবিদিক ছুটছিল, ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিলো তবুও বিজিবি গুলি বন্ধ করেনি। মুহুর্মুহু গুলি চালিয়ে গেছে। যার ফলশ্রুতিতে একজন কিশোর শিক্ষার্থীকেও নিহত হতে হলো।

ঠাকুরগাঁও, সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা

সন্দেহের বশে বিজিবি গরু আটক করেছে ভাল কথা, এই গরু রক্ষা করার জন্য বিজিবির আত্মরক্ষার্থে তিনজন মানুষ মেরে ফেলতে হবে? সীমান্তবর্তী এলাকা এমনিতেই সেনসিটিভ এলাকা। এখানকার মৃত্যুগুলো রহস্যময়। কে আসল চোরাচালান কারবারী, কে সাধারণ এগুলো বিচার হওয়ার আগেই এখানে ঘটে যায় মারাত্মক হত্যাকাণ্ড। কেউ মারা গেলেই তাকে চোরাচালান বলে দিলেই কি এসব মৃত্যু জাস্টিফাইড হয়ে যায়?

চোরাচালান বন্ধে এত তৎপরতা দেখে আমাদের অবশ্য গর্বিতই হওয়ার কথা, কিন্ত দেশে মাদকের এত আগ্রাসন, সীমান্ত দিয়েই তো এসব মাদক প্রবেশ করে। এগুলো তো এতদিনে বন্ধ হলো না? কিন্তু, সীমান্তে ঠিকই চোরাচালান বন্ধে তৎপর বাংলাদেশ- ভারত দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। এবং তাদের গুলিতে প্রায়ই মানুষ নিহত হচ্ছে। যারা নিহত হচ্ছে তারা চোরাচালানের সাথে জড়িত – এমন একটা কমন জাস্টিফিকেশন আমরা শুনি। কিন্তু, এরকম ঘটনায় কি সাধারণ মানুষও আক্রান্ত হচ্ছে কিনা?

এই ঘটনায় তদন্ত কমিটি করে মূল ঘটনা কি এই রহস্য আগে উন্মোচিত হোক। কেন যার গরু ক্রয়ের কাগজ আছে তার কাছ থেকে গরুগুলো নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কেন আত্মরক্ষার নামে এভাবে মুহুর্মুহু গুলি ছোঁড়া হয়েছে, এখানে কি মানুষের মৃত্যু এড়ানো যেত কিনা এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। মানুষের জীবনকে এতটা তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের সাথে যেন আর বিচার না করা হয়, মন চাইলেই গুলি করে মানুষ মারা যায়, কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও ভুলের কারণে নিরীহ কোনো মানুষ মারা গেলে তাকে আর পরে ফিরিয়ে আনা যায় না…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button