সিনেমা হলের গলি

সিটি অফ গড: সিনেমাপ্রেমীদের আলোচনার শীর্ষে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক গল্পের সিনেমা

ব্রাজিল নামটা শুনলেই অনেকের মনে পড়ে একটা দেশের কথা, যে দেশটা দুনিয়াতে ফুটবলের জন্য বিখ্যাত। ব্রাজিলের নাম শুনলেই রোনালদো, নেইমার, রোনালদিনহো- এসব ফুটবল তারকার ছবি মনে ভেসে ওঠে, তাই না? ব্রাজিল বিশ্বে বিখ্যাত এই ফুটবলের জন্যই, কিন্তু আজ ব্রাজিলের ফুটবল সমাচার নিয়ে আলোচনা করবো না। ব্রাজিলের মুভি ইন্ড্রাস্ট্রির একটি সিনেমা নিয়ে আলোচনা করবো। হ্যাঁ, অন্যান্য দেশের মতো তাদেরও নিজস্ব একটা ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রি রয়েছে এবং নানা সময়ে সেই ইন্ড্রাস্ট্রি আমাদের উপহার দিয়েছে নানা ইউনিক প্লট সমৃদ্ধ ফিল্ম। এরকমই এক সিনেমা নিয়ে আলোচনা করবো, যা এখনও সিনেমাপ্রেমীদের আলোচনায় শীর্ষে অবস্থান করছে। সিনেমাটির নাম “City Of God (2002)”, যে সিনেমাটিতে একটি কিশোরের জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনাবলী এবং তার সাথে সাথে সেই সময়কার ব্রাজিলের অপরাধ জগতের জান্তব কিছু দৃশ্য দেখানো হয়েছে যা আমাদের ধারণা দেবে মাদক, অস্ত্র এবং অর্থের দোর্দন্ড প্রতাপে নাভিশ্বাস উঠা একটা জনপদের চালচিত্র।

পর্তুগিজ ভাষার এই সিনেমাটিতে আপনি জীবনের প্রায় সকল উপাদানই খুঁজে পাবেন। পাবেন পরিস্থিতি কিংবা বয়সের দোষে বখে যাওয়া এক কিশোর গ্যাংস্টারের মনোজগত সম্পর্কে ধারণা, পাবেন স্নিগ্ধ ভালোবাসার বাতাবরণে তার বদলে যাওয়া অভিব্যাক্তির সম্যক চিত্র, পাবেন প্রভাব বিস্তার করার জন্য দুই গ্যাং এর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, খুন, সেক্স, ড্রাগস- কী নেই এই সিনেমায়! এই কিশোর গ্যাংস্টার ব্রাজিলের মাদকের সাম্রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে, মাদক ব্যবসা এবং তার সাম্রাজ্য রক্ষা করার জন্য খুন করতেও যে পিছপা হয় না। সিনেমায় ভায়োলেন্সের প্রকোপ এত বেশি, মাঝে মাঝে মনে হতেই পারে মানুষের জীবনের বুঝি আসলে কোনো মূল্য নেই!

পরিচালক ফার্নান্দো মাইরেলেস ষাটের দশক থেকে শুরু করে আশির দশক পর্যন্ত ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরোর এক বস্তি “ফ্যাভেলা” এর লোমহর্ষক অপরাধ জগতের খুঁটিনাটি তুলে ধরেছেন। এই সিনেমাটির নির্মাণও বেশ চমকপ্রদ। পুরো ঘটনা দেখা হয়েছে রকেট নামের এক যুবকের মাধ্যমে। না, একটু আগে যে কিশোরের কথা বলছিলাম তার নাম না এটা। রকেট হচ্ছে এমন একটা ক্যারেক্টার, যে বুকের ভেতরে ফটোগ্রাফার হওয়ার স্বপ্ন লালন করে। রকেট বেশ সহজ সরল মানুষ। অপরাধমনস্ক যে কিশোরের কথা বলেছিলাম, তার নাম লিল ডাইস। রকেটের একদম বিপরীত পার্সোনালিটি সম্পন্ন ব্যাক্তি। আসলে এই দুটো ছেলের জীবনের বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রের গল্প এগিয়েছে।

সিনেমার শুরুটাই হয়েছে রূপক ভাবে দেখানো একটি দৃশ্যের মাধ্যমে। প্রথমে দেখানো হয় একটি মুরগী, মানুষ নামক কিছু দো পেয়ে দৈত্যের হাত থেকে বাঁচার জন্য পালানোর চেষ্টা করছে। একটু আগে তার স্থান হওয়ার কথা রান্না করার জন্য চুলায় বসানো ডেকচিতে, কিন্তু জবাইয়ের ঠিক আগে ফোস করে মুরগীটা লিল জির হাতের ফাঁক গলে পালিয়ে যায়। লিল জি তার পিচ্চি বাহিনী নিয়ে মুরগী ধরার অভিযানে বের হয়, তাও আবার অস্ত্রশস্ত্র হাতে নিয়ে। ঠিক সেই সময়ে দৃশ্যপটে আবির্ভাব হয় রকেটের। লিল জি মুরগীটাকে ধরতে না পেরে রকেটকে বলে ধরে দিতে, কিন্তু ঠিক সেই সময়ে বিপরীত দিক থেকে হঠাৎ পুলিশের আগমন ঘটে। একদিকে লিলজি আর তার গ্যাং, অন্যদিকে পুলিশ। এর মাঝে পড়ে রকেটের মনে হঠাৎ ফ্যাভেলার কিছু স্মৃতি মনে পড়ে। মুভি তখন টার্ন করে ফ্ল্যাশব্যাকের দিকে।

রিও থেকে বিচ্ছিন্ন এই ফ্যাভেলা নামক বস্তিটির আরেক নাম ছিল ‘সিডাড ডি ডয়েস’ বা ‘সিটি অব গড’। এই এলাকার পদে পদে বিরাজ করছে দারিদ্র্য। মানুষ পেটের ভাত জোগাবার জন্য এমন কোনো কাজ নেই, যা করছে না। পেটে ক্ষুধা থাকলে আপনি যত শক্ত মনোবলের মানুষই হোন না কেন, মনে নীতি নৈতিকতা বেশি আশ্রয় প্রশ্রয় পাবে না। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ ক্ষুধার তাড়নায় আর ভালোভাবে বেঁচে থাকার আশায় মাদক আর অস্ত্রের ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়ে। সাক্ষাৎ কুরুক্ষেত্র এই জায়গাটা, যেখানে পুলিশও যেতে গড়িমসি করে।

“সিটি অফ গড”- চলচ্চিত্রটিকে ভাগ করা যায় তিনটি দশকে। ষাটের দশকে রকেট এবং লিল এই দুটো চরিত্রকে একে ওপরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এই দশকের ঘটনাবলীতে স্থান পায়, “টেন্ডার ট্রিও” নামের এক চোরের দলের কথা যারা ফ্যাভেলায় চুরি, ডাকাতি করে বেড়ায়। এই চোরের দলের মূল হোতা ছিল তিনজন। শ্যাগি, ক্লিপার এবং গুস। এই টেন্ডার ট্রিউয়ের একজন ভক্ত ছিল ছোট্ট লিল। অপরদিকে, চোরের দলের হোতাদের একজন গুস ছিল রকেটের বড় ভাই। শ্যাগি, ক্লিপার এবং গুসের চোখ ধাঁধানো উত্থান যেমন দেখানো হয়েছে, তেমনি তাসের ঘরের মতো হঠাৎ করে তাদের পতনও দেখানো হয়েছে। এই অপরাধ চক্রের মধ্যেও শ্যাগির প্রেম-ভালোবাসা দর্শকমনে দোলা দিয়ে যাবে। একই সাথে যখন তার প্রেম পূর্নতা পায় না, সেই সময়টাতেও দর্শক কষ্ট পাবে। হৃদয়বিদারক এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে শ্যাগির মৃত্যুর সাথে সাথে তার প্রেমিকার ঘর বাঁধার স্বপ্নও ছিড়ে খন্ড খন্ড হয়ে যায়।

৭০ এর দশকে সিটি অফ গডে মাদকের সাম্রাজ্য বিস্তারের কাহিনী অত্যন্ত র ভাবে দেখানো হয়েছে। রকেটের ফটোগ্রাফার হওয়ার স্বপ্নের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর এই দশকে স্থাপিত হয়, একই সাথে লিলের ধীরে ধীরে একজন ত্রাস সৃষ্টিকারী গ্যাংস্টারে রূপান্তরিত হওয়ার দৃশ্যাবলীও বিভিন্ন দমবন্ধ পরিস্থিতির মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়।

আশির দশক হচ্ছে সিনেমার সবচেয়ে জটিল দশক। দৃশ্যপটের এমন অভাবনীয় পরিবর্তন দর্শক খেয়াল করবেন, যা ভাবাই যায় না! কিছু ক্ষেত্রে খেই হারিয়েও ফেলতে হয়! গ্যাংস্টারদের সবসময় প্রভাব বিস্তার করে চলতে হয়, নয়তো তাদের ব্যবসা পরিচালনায় অসুবিধা হয়। লিলের প্রতিদন্ধী এক গ্যাংস্টার হাজির হয়, যার নাম ক্যারট। লিল আর ক্যারটের মাঝে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করা নিয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলতে থাকে। পুরো সিটি অফ গডই বলা যায় লিল এবং ক্যারট- এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তবে লিল আর ক্যারটের মধ্যকার এই ক্ল্যাশে আর কারো লাভ না হলেও লাভ হয় রকেটের। রকেট তখন একটা পত্রিকা অফিসে কাজ করে। লিলের মনে হঠাৎ ইচ্ছে জাগে পত্রিকায় নিজের ছবি দেখার। সে রকেটকে ডেকে পাঠায় তার গ্যাং এর ছবি তোলার জন্য। রকেট ছবি তুলে পত্রিকা অফিসে নিয়ে যায় ডেভেলপের জন্য, কিন্তু তার তোলা সেই ছবি দুর্ঘটনাক্রমে পত্রিকায় ছাপা হয়ে যায়। লিল জি তার ছবি দেখে খুশি হলেও রকেট ভাবে ঠিক উল্টো। মনে মনে ভাবে এই ছবি দেখে লিল জি নিশ্চয়ই তাকে মেরে ফেলবে। রকেটের তোলা ছবি দেখে পত্রিকা অফিস থেকে বলা হয় আরও কিছু ছবি তুলে দিতে। তবে সে পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় সেই মুরগি। একপাশে লিল জি, অন্যপাশে পুলিশ, মাঝখানে মুরগি আর রকেট। একটু পরে সেখানে উপস্থিত হয় ক্যারট বাহিনী। এখন কী হবে?

সিনেমাটিতে ফার্নান্দো মাইরেলেসের সাথে সহ পরিচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন কটি লান্ড। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত পাউলো লিন্‌স-এর উপন্যাস “সিদাদ দি দেউস” অবলম্বনে চিত্রনাট্য লিখেন ব্রাউলিও মানতোভানি। সিনেমার ট্যাগলাইন হল, “Fight and you’ll never survive….. Run and you’ll never escape.” চলচ্চিত্রটি এ পর্যন্ত বহু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছে। সেরা চিত্রনাট্য, সেরা চিত্রগ্রহণ, সেরা সম্পাদনা, সেরা পরিচালক- এ চার ক্যাটাগরিতে ২০০৪ সালে একাডেমি পুরস্কার মনোনয়ন পায়। বিখ্যাত মার্কিন চলচ্চিত্র সমালোচক রজার ইবার্ট এই ছবিকে মার্টিন স্কোরসেজি পরিচালিত ‘গুডফেলাস’ ছবির সাথে তুলনা করেছেন এবং তিনি মনে করেন এটি সে ধরণের তুলনার যোগ্য। তার মতে এই ছবি সৃজনশীল অনেক কিছু করতে পেরেছে।

এ ছবির অধিকাংশ অভিনেতাই আগে কখনও অভিনয় করেননি। পরিচালক সিদাদ দি দেউস বস্তির অধিবাসী বেশ কয়েকজনকে দিয়ে অভিনয় করিয়েছেন। তবে, পরিচালক সবার ভেতর থেকে অভিনয়টা বেশ ভালোভাবেই বের করে আনতে পেরেছেন বলবো। রকেট চরিত্রে আলেকজান্ডার রড্রিগেজ, লিল জি চরিত্রে লিন্ড্রো ফিরমিনো দ্য হোরা দারুণ অভিনয় করেছেন। সিনেমার নির্মাণশৈলী দারুণভাবে মুগ্ধ করেছে আমাকে। ফিল্মের স্টোরি বেশ জটিল, কিন্তু জটিল এই প্লটকেই ডিরেক্টর অত্যন্ত সহজবোধ্য ভাবে দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। সিনেমাটোগ্রাফি,পরিচালনা,সম্পাদনা,চিত্রনাট্য এবং গল্প লিখনের জন্য অস্কার সমালোচক মহলে পেয়েছিলো ভূয়সী প্রশংসা। সিনেমাটি কঠোরভাবে ১৮+।

আইএমডিবিতে ৮.৬ এবং রোটেন টমেটোজে ৯২% ফ্রেশ রেটিং পাওয়া ১৩০ মিনিটের এই সিনেমাটি আশা করি আপনার ভালো লাগবে। এই মুভি থেকে অন্তত একটি লেসন পাবেন সবাই। লক্ষ্যের পথে অবিচলভাবে হাটলে ভাগ্যও আপনাকে সঙ্গ দিয়ে “সাফল্য” নামক জায়গায় পৌঁছে দেবে।

ফিচার্ডের ছবি: obscurendure

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button