মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

‘ভাল আছি’ বলে অভিনয় করে আর কতদিন বাঁচব এই নষ্ট নগরে?

মানুষের নিজের ওপর না আসলে মানুষ বুঝতে পারে না কী চলছে দেশে! আমি সবকিছু থেকে সরে গিয়েছিলাম। বিপ্লব, প্রতিবাদ, হতাশা, ভালোলাগা- সবকিছু একান্ত নিজের করে নিয়েছিলাম। মুখ বুজে থেকেছি ধর্ষণ, মৃত্যুতেও। আমার একজনের লেখা দিয়ে কী হবে, আমার একজনের কথা দিয়ে কী হবে। ফেসবুকে লিখে কিছু হয় না। নিজের মতো করে বাঁচো যতটুকু বাঁচতে পারো এই নষ্ট নগরে।

এখন নিজের ওপর আসাতেই আসলে লেখা। দেশ উন্নতির পথে যাচ্ছে, মেট্রোরেল হচ্ছে, পদ্মাসেতু হচ্ছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে, দারুণ ব্যাপার। দেশের জন্য আমি খুশি। আমি অখুশি নিজের জন্য আসলে। চারুকলার দিকে অনেকদিন পর গিয়ে সেদিন বুকটা মোচড় দিয়ে উঠেছে। কতো স্মৃতি এই রাস্তায় আমার, সে রাস্তার মাঝ বরাবর এখন ক্ষত।

আব্বু চলে যাবার পর বাড়ির কাজে হাত দিয়েছি। চেষ্টা ছিল যতটুকু সম্বল তা দিয়ে অন্তত নিজেরা থেকে দু-একটা বাসা ভাড়া দিয়ে চলতে পারবো। বাজেটের পর রডের দাম বাড়লো টন প্রতি ১৪ হাজার টাকা, সিমেন্টের বস্তাপ্রতি ১০-১২ টাকা। সবচেয়ে আশায় ছিলাম এই ভেবে যে গ্যাসের দাম হয়তো বাড়বে না। সেটাও বাড়লো আর সাথে সাথে প্রতিটা জিনিসের দাম বাড়লো।

ব্যবসায়ীরা মজুদ করে বাজেট পাশের আগেই আমাদের খুবলে খেলো, এখন বাজেট পাশের পর কী তাণ্ডব চালাচ্ছে সবাই জানে। আমি খুশিমনে ভ্যাট দেই, সরকার আছে-দরকার আছে। কিন্তু তা সরকার পর্যন্ত যাচ্ছে নাকি সেটার নিশ্চয়তা পাচ্ছি না। কালো টাকা সাদা হচ্ছে, আর আমাদের রঙিন স্বপ্নগুলো ধূসর।

প্রতি মাসে সংসারের খরচের বড় অংশ আসে সঞ্চয়পত্র থেকে। সেখানেও ভ্যাট বসানো হয়েছে। প্রতি মাসে প্রায় দুই হাজার টাকা কেটে রাখছে সরকার। এই মাসে টাকা আসার ম্যাসেজ পাবার পর আম্মু চিন্তায় পড়ে গেছেন কীভাবে কী করবেন। কী করবো আসলেই!

আমি যাতায়াতের ক্ষেত্রে নির্ঝঞ্ঝাট থাকতে পছন্দ করি। একটা সময় বাসে এত জার্নি করেছি যে এখন আর উঠতেই ইচ্ছা করে না। তাই স্যালারির ভালো একটা অংশ যাতায়াতে চলে যায়। রিকশা আমার প্রতিদিনের সঙ্গী। হেডফোন কানে গুঁজে কোলাহল থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে যতটুকু সম্ভব যানজটের ক্লান্তিকে পাশ কাটিয়ে অফিসে গিয়ে নতুন দিনের শুরু করি। টাইমলি অফিস মেইন্টেন করতে আলসেমী ছাড়া শত্রু ছিল না আর।

আজ থেকে আমার নির্ঝঞ্ঝাট যাতায়াতেও বা হাত ঢুকিয়ে দেয়া হল। কোন ধরণের সার্ভে না করে, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এর কোন ব্যবস্থা না করে, দেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকার মেইন রোডে রিকশা বন্ধ করে দিলো। এখন প্রতিদিন আমাকে ঘুরে অথবা পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ঝুলে অথবা হেঁটে অথবা কোনো এক উপায়ে অফিস টাইমের আগে অফিসে পৌঁছাতে হবে। কোনো অজুহাত দেয়া যাবে না সেখানেও।

অর্থের সাথে অসম দৌড়ে আছি, সময়ের সাথে মানসিক দৌড়ে আছি। তবুও নাকি এই দেশে-এই শহরে বেঁচে থেকে বলতে হবে- ভালো আছি। কী হাস্যকর!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button