সিনেমা হলের গলি

ওরাও সিনেমা বানায়, আমরাও সিনেমা বানাই…

কলকাতার এবছরে মুক্তি পাওয়া প্রথম সিনেমা বিজয়া। বিসর্জন সিনেমার সিক্যুয়াল এটা। সিনেমার রিভিউ পড়লাম, বিসর্জনের চেয়ে একটু যেন ফিকে মনে হয়েছে অনেকের কাছে। তবু, ভালোর সীমানা খুঁজতে গেলে বিসর্জনের সঙ্গে টেক্কা দেয়াটাই তো যথেষ্ট। বিসর্জনের কাছাকাছি মানে যে সিনেমা যেতে পারে, সেটাকে ‘ভালো সিনেমা’ বলতে দ্বিধা হবার কথা নয়। জয়া আহসানের অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে, গল্পের গাঁথুনিও নাকি চমৎকার ছিল। টালিগঞ্জে গল্পনির্ভর সিনেমার যে ধারাটা গত কয়েক বছর ধরে চলছে, সেখানে বিজয়া একটা নতুন সংযোজন। বোঝাই যাচ্ছে, ওরা লাইনে আছে।

আরেকটু দূরে, বলিউডে যাই। ২০১৮ সালটা ছিল বলিউডের জন্যে গেম চেঞ্জিং একটা বছর। ভালো গল্প না থাকলে, নির্মাণে মুন্সীয়ানা না পাওয়া গেলে গেল বছর দর্শকেরা সেসব সিনেমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন। তিন খানের সিনেমাও নাম লিখিয়েছে এই তালিকায়। আবার আন্ধাধুন, বাধাই হো, হিচকি, প্যাডম্যান, রাজি’র মতো সিনেমাগুলো পেয়েছে দুর্দান্ত সাফল্যের দেখা। বড় তারকা নয়, এই সিনেমাগুলোর সাফল্যের নেপথ্যে কাজ করেছে ভালো গল্প, দুর্দান্ত অভিনয় আর দারুণ মেকিং।

গত বছরের ধারাবাহিকতাটা ২০১৯ সালেও ধরে রেখেছে বলিউড। এবছর একইসঙ্গে মুক্তি পেয়েছে দুটো সিনেমা, উরি এবং অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার। এরমধ্যে উরি সিনেমাটা মুক্তির মাত্র তিনদিনের মাথায় হিট ভার্ডিক্ট পেয়ে গেছে, প্রথম পাঁচদিনে সিনেমার আয় ছাড়িয়েছে পঞ্চাশ কোটি রূপিরও বেশি। ওয়ার্ড অফ মাউথ ভালো হওয়ায় ছুটির দিন শেষ হবার পরেও ব্যবসা অব্যহত আছে সিনেমাটার।

উরি’র গল্পটা ২০১৬ সালে পাকিস্তান সীমান্তে ভারতীয় সেনাদের সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের সত্যি ঘটনা অবলম্বনে। মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন ভিকি কৌশল এবং ইয়ামি গৌতম। দুজনের কেউই বড়সড় স্টার নন, তবুও সিনেমাটা বক্স অফিসে ভালো করেছে, সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে নিয়েছে, তার কারণ একটাই, সিনেমায় চমৎকার একটা গল্প আছে, সেই গল্পটাকে সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে, পরিচালকের গল্প বলার ধরণটা দর্শকের পছন্দ হয়েছে। সব মিলিয়ে ‘উরি’ তাই দেখা পেয়েছে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের।

উরি’র সঙ্গে সাবেক ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর জীবনের ঘটনাবলী নিয়ে নির্মিত ‘অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ সিনেমাটাও মুক্তি পেয়েছে। এবং সমালোচকদের মতে, এটা একটা প্রোপাগাণ্ডা সিনেমা। এবছর ভারতে জাতীয় নির্বাচন, আর সেই নির্বাচনকে ঘিরে কংগ্রেসকে শায়েস্তা করার জন্যেই নির্মিত হয়েছে এই সিনেমা- এরকম।অভিমত অনেকের। আর তাই মুক্তির আগে নানারকমের আলোচনা থাকলেও, শেষমেশ সিনেমাটা মুখ থুবড়ে পড়েছে বক্স অফিসে।

সিনেমার শেষ অংশে থাকে ক্লাইম্যাক্স। আমরা এখন সেই জায়গায় চলে এসেছি। নিজেদের দেশে আসা যাক এবার। ঢালিউডে এবছর মুক্তি পাওয়া প্রথম সিনেমার নাম ‘আই অ্যাম দ্য রাজ’! ভুল পড়েননি, নামটা ঠিকই লিখেছি। গ্র‍্যামাটিক্যাল মিসটেক যেটা আছে, সেটা সিনেমার সংশ্লিষ্ট লোকজনের হয়েছে, আমাদের নয়। যাই হোক, ছোটবেলায় শুনেছিলাম, নামে নাকি কোন ভুল নাই। যাহাই বায়ান্নো, তাহাই তেপ্পান্নো। আর তাই নামের বিচারে ‘আই অ্যাম রাজ’ কিংবা ‘আই অ্যাম দ্য রাজ’ অথবা ‘আয়্যাম দারাজ’- এর মধ্যেও ভুল ধরে কাজ নেই কোন। যে সিনেমার সর্বস্বটাই ভুলে ভরা, সেটার নামের ভুল খুঁজে কি হবে?

কালজয়ী এই চলচ্চিত্রটা নিয়ে কথা বলার যোগ্যতা আমার নেই, বলতে চাইও না। ইউটিউবে ট্রেলার আছে, দেখলেই বুঝে যাবেন, নির্মাতা কি এক ‘মাস্টারপিস’ বানিয়েছেন! এইট প্যাক বডিওয়ালা নায়কের মুখে ‘অ্যায়াম দারাজ! অ্যায়াম দারাজ’ চিল্লাফাল্লা শুনেই খায়েশ মিটে যাওয়ার কথা যে কারো। আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়। এই সিনেমাগুলোর পেছনে টাকা ঢালেন কারা? তাদের কি টাকা রাখার জায়গার অভাব পড়েছে? সেন্সরবোর্ডে কারা বসেন? কারা এগুলোকে অনুমোদন দেন? এরকম একটা সিনেমা কিভাবে সেন্সর পাশ করে আসে, যেখানে শনিবার বিকেল-এর মতো সিনেমাকে আটকে দেয়া হয়! এটার পেছনে যুক্তিটা কি আসলে? আমার খুব জানতে ইচ্ছে হয়।

সোনালী অতীত নিয়ে আমরা গর্ব করি, চলচ্চিত্রের সেই সোনালী দিন গত হয়েছে অনেক আগে। আমাদের ইন্ডাস্ট্রি গত দেড়যুগ ধরেই লড়ছে, কোনরকমে টিকে আছে। তবুও ভালো সিনেমার সংখ্যা বাড়ছে ধীরে ধীরে। গতবছরেই যেমন মাটির প্রজার দেশে, স্বপ্নজাল, দেবী বা দহনের মতো সিনেমা এসেছে। সেই ইন্ডাস্ট্রির নতুন বছরটা যখন শুরু হয় আই অ্যাম দ্যা রাজ দিয়ে, তখন আফসোস বা হতাশা কোনটাই জন্ম নেয় না মনের ভেতরে। কেমন যেন একটা বোধশূন্য অবস্থায় চলে যেতে বাধ্য হই শুধু…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button