সিনেমা হলের গলি

উত্তর থাকলে ঝেড়ে কাশুন!

রুম্মান রশীদ খান:

গত বছরের BIGGEST HIT ‘দেবী’র পরিচালক অনম বিশ্বাস। ২০১৭ সালের BIGGEST HIT ‘ঢাকা অ্যাটাক’-এর পরিচালক দীপংকর দীপন। ২০১৬ সালের BIGGEST HIT ‘‘আয়নাবাজি’র পরিচালক অমিতাভ রেজা চৌধুরী।

লক্ষ্য করে দেখুন: প্রত্যেকটি সফল চলচ্চিত্রের পরিচালকই নবাগত। বড় পর্দায় ১ম পদার্পণেই তারা ছক্কা পিটিয়েছেন। তার মানে কি প্রমাণ হলো? প্রমাণ হলো যে, দর্শক নতুন ‘আইডিয়া’ চাইছে। নতুন ভাবে গল্প বলার ধরণ সাদরে গ্রহণ করছে। বিষয়টি ইতিবাচক। কিন্তু উল্টোদিকে হতাশার খবরও রয়েছে: অমিতাভ রেজা চৌধুরী ও দীপংকর দীপনের ১ম চলচ্চিত্র সফল হবার পর দীর্ঘদিন কেটে গেছে। এর মধ্যে তাদের পরিচালনায় বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মাণের খবরও বিভিন্ন সময় আকাশে বাতাসে উড়ে বেরিয়েছে। তবে দু:খজনক হলেও সত্যি, এখন পর্যন্ত কোনো চলচ্চিত্রেরই শুটিং ফ্লোরে যাবার খবর আমরা জানতে পারিনি। ‘দেবী’ মুক্তি পাবার ৪ মাস হতে চললো, অনম বিশ্বাসের নাটক নির্মাণের খবর শুনেছি, নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণের খবর শুনিনি। কিন্তু কেন? পাশের দেশ কিংবা যে কোনো দেশে একটি সফল চলচ্চিত্রের পরিচালকের তো বসে থাকতে হয় না। আমাদের সব সফল চলচ্চিত্রের সফল নির্মাতারা তাদের নির্মাণের ধারাবাহিকতা কেন ধরে রাখতে পারেন না? তারা চান না? নাকি সমস্যা অন্য কোথাও? নাকি তারা নোংরা রাজনীতির শিকার?

সালাহউদ্দিন লাভলুর মত সফল নাট্যকার, নির্মাতা ‘মোল্লাবাড়ির বউ’-এর মত চূড়ান্ত ব্যবসাসফল ও জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নির্মাণের ১৪ বছর পরও কেন আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারেননি? আরিফিন শুভ-মেহজাবীন/ আরিফিন শুভ-মাহিয়া মাহি/ রিয়াজ-শাবনূরকে নিয়ে কত চলচ্চিত্র নির্মাণের খবর শুনেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো চলচ্চিত্রেরই ক্ল্যপস্টিক দেখা যায়নি। কেন?

‘মনপুরা’ নির্মাণের ৯ বছর পর কেন গিয়াসউদ্দিন সেলিমকে আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হলো? তিনি বসে ছিলেন নাকি তাকে বসিয়ে রাখা হয়েছিল? যদি তিনি বসে থাকার প্রশ্ন থাকে, আমরা কেন তাকে বসিয়ে রেখেছিলাম? কেন আরেকটি সফল চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য আমরা তাকে উদ্বুদ্ধ করলাম না? সমস্যাটা আসলে কার? আমাদের না নির্মাতাদের?

২০১৭ সালে শাকিব খান-অপু বিশ্বাস-আনিসুর রহমান মিলন অভিনীত ‘রাজনীতি’ যারাই দেখেছিলেন, প্রশংসা করেছেন। সেই বুলবুল বিশ্বাস কেন এখনও বড় পর্দায় নতুন কোনো চলচ্চিত্র নিয়ে আসতে পারেননি? অসংখ্য সফল মিউজিক ভিডিওর নির্মাতা তানিম রহমান অংশু কেন তার ১ম চলচ্চিত্র ‘আদি’ এখনো মুক্তি দিতে পারেননি? ‘আদি’র ট্রেলার তো দুই বছর আগেই প্রশংসা কুড়িয়েছিল। অথচ প্রশংসিত ট্রেলার পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র হয়ে কেন আমাদের সামনে হাজির হতে পারেনি? আরিফিন শুভ-পূর্ণিমা জুটি অভিনীত মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ পরিচালিত ‘ছায়া-ছবি’র সম্পূর্ণ কাজ শেষ হবার পরও কেন ৭ বছর ধরে আঁতুরঘরে পচে মরছে?

কন্টিনিউটির সমস্যা বাদে হাসিবুর রেজা কল্লোলের ‘সত্তা’ দেখে ২০১৭ সালে মুগ্ধ হয়েছিলাম। সেই পরিচালক প্রথম চলচ্চিত্র মুক্তির পরপরই শাকিব খানকে নিয়ে আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষনা দিয়েছিলেন। হতাশার খবর, সবকিছু এখন ঘোষনার মধ্যেই আটকে আছে। রেদওয়ান রনি’র ‘চোরাবালি’ কিংবা ‘আইসক্রীম’ ব্যক্তিগতভাবে আমার ভালো লেগেছিল। বিশেষ করে ‘চোরাবালি’ তো বেশ কিছু শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারই পেয়েছিল। লেগে থাকলে চলচ্চিত্রে হয়তো ভিন্নধারার কিছু করতে পারতেন তিনি। তারপরও এই পরিচালক প্রায় ৩ বছর ধরে চলচ্চিত্র থেকে দূরে রয়েছেন। কেন? ইফতেখার আহমেদ ফাহমীর মত মেধাবী পরিচালককে তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘টু বি কন্টিনিউড’ কেন ছয় বছর ধরে নির্মাণ করতে হয়? নানাবিধ জটিলতার ঘূর্ণিপাকে ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে ফাহমীর ১ম চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছিল ২০১৭ সালে। তারপর যা হবার কথা ছিল, তাই হয়েছে: নীরবতা।

চিত্রনায়ক শাকিব খানকে অস্ট্রেলিয়ায় চিত্রায়িত ‘অপারেশন অগ্নিপথ’ চলচ্চিত্রের টিজারে অসাধারণ লেগেছিল। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে মুক্তি পাওয়া ২ মিনিটের টিজারে শাকিব খানকে দেখে কতবার যে ‘ওয়াও’ বলেছিলাম! অথচ সে ছবিটির সম্ভাবনাও কুঁড়িতেই বিনষ্ট হয়ে গেল। শুনেছি এ ছবিটিও নাকি কখনো সমাপ্ত হবে না। অথচ এ ছবিটির জন্য খোদ শাকিব খানের ভক্তরা তো বটেই, তার নিন্দুকেরাও অপেক্ষা করেছিল।

আরিফিন শুভকেও প্রায় ৩ বছর আগে ‘মৃত্যুপুরী’ ছবির টিজারে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। অথচ সে ছবিটিও অস্তাচলে ডুব দিয়েছে। যতটুকু ধারণা রাখি এর পেছনে কখনো পরিচালকের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, কখনো প্রযোজকের উন্নাসিকতা, কখনো শিল্পীদের শিডিউল জটিলতাই মূল কারণ। কিন্তু এই জটিলতার মাঝখান দিয়ে যে দর্শক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, চলচ্চিত্র জগতটা ডুকরে কাঁদছে, সে খেয়াল কে করবে? এর দায় আসলে কে নেবে? প্রযোজক সমিতি? পরিচালক সমিতি? নাকি অন্য কেউ? আমরা সবাই রোগের সাথে পরিচিত। রোগের উপসর্গও জানি। শুধু তাই নয়, কি ওষুধ কখন খেতে হবে তাও জানি। কিন্তু কোটি টাকার প্রশ্ন: এই ওষুধটা আসলে খাওয়াবে কে? কেন আমাদের সব সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়? কেন আমাদের সফল শিল্পী/ নির্মাতাদের আমরা ধরে রাখতে পারিনা? কেন আমরা সম্ভাবনাময় মেধাগুলোকে পরিচর্যা করতে পারি না? কারো কাছে কি উত্তর আছে? থাকলে আওয়াজ তুলুন। ঝেড়ে কাশুন।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button