মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

এই যে ভালোবাসা, এই যে কান্না- এর নামই হয়তো জীবন!

রোজ সকালে আমাদের ঘুম থেকে উঠতে হয় চাকুরিতে যাবো বলে। আমাদের সাথে উঠতে হয় দুই বছর বয়সী আমাদের ছেলেটাকেও। রেজে ঘুম থেকে ওঠাতে ওকে ভীষণ মায়া লাগে। তবুও ওঠাতে হয়। কারণ ওকে ডে কেয়ারে দিয়ে আসতে হবে। রোজ সকালে আমরা তিনজন একসাথে বের হই। ছেলেটা ভাবে আমরা কোথাও বেড়াতে যাচ্ছি। ভীষণ খুশি হয়। আমার অফিসের সামনে এসে নাফিসা চলে যায়। ছেলেটা আমাকে জড়িয়ে থাকে। ভাবে বাবা তো আছে। কিন্তু যেই আমি আমাদের ডে কেয়ার দোলনার সামনে যাই ও শুরু করে তীব্র কান্না। বুঝে যায় ওকে রেখে এখন আমিও চলে যাবো।

আমাদের ডে কেয়ারটা বেশ ভালো। তবুও আমার ছেলেটা যখন দেখে আমি ওকে রেখে চলে যাচ্ছি ও কাঁদে। আমি জানি না ও কতক্ষণ কাঁদে। আমি মন খারাপ করে চলে আসি। অপেক্ষা করি সন্ধ্যা নামার। কারণ রোজ সন্ধ্যায় আবার ওকে হাসতে দেখি। আমরা যেমন আট দশ ঘন্টা অফিস করি আমার দুই বছরের ছেলেটাও ততোক্ষণ ডে কেয়ারে থাকে। আমি মাঝখানে আর ওকে দেখতে যাই না। কারণ যদি চলে আসতে চায়। কাজ শেষে রোজ সন্ধ্যায় আমি যখন ওকে আনতে যাই ও দৌড়ে ছুটে আসে। তখন আর কাউকে সে চেনে না। জড়িয়ে থাকে আমায়। যেন সারাদিনের অভিমান ভাঙে। তখনো আমার কান্না পায়।

শৈশব

আমি দেখি, শুধু তো আমার ছেলেটাই ডে কেয়ারে থাকে তাই নয়, আরও শ খানেক বাচ্চা আছে। কারও বয়স ছয় মাস, কারও তিন বা চার। আমি যখন রোজ কাজ শেষে ডে কেয়ারে ছেলেকে আনতে যাই ওরা প্রত্যেকে দরজায় আওয়াজ শুনে ভাবে, হয়তো ওদেরও নিতে এসেছে। ওরা কেউ অভিমান করে। কেউ কেউ আমার কাছেও ছুটে আসে। আমার মাঝে মধ্যে মনে হয় সব চাকুরি বাকুরি ছেড়ে এই ডে কেয়ারে বাচ্চাদের সাথে কাটিয়ে দেই।

আমি জানি শুধু আমরা একা নয় এই শহরে আমাদের মতোই হাজারো কর্মজীবী বাবা-মাকে রোজ বাচ্চাদের নিয়ে এই লড়াইটা করতে হয়। মাঝে মধ্যে মন খারাপ হলে মনে হয়, মা বেঁচে থাকলে খুব ভালো হতো। মাঝে মধ্যে মনে হয় শুধু বাচ্চাদের জন্য হলেও যৌথ পরিবারের ধারণাটা ভালো। আবার ভাবি, বাবা মা সবাই থাকার পরেও সবাইকে তো যুদ্ধটা করতেই হচ্ছে। আবার যখন দেখি শুধু মা বা শুধু বাবার কাছে অনেক বাচ্চা বড় হচ্ছে তখন বুঝি এ আরেক যুদ্ধ।

আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, এই যে একটা ঢাকা শহরে আমরা বড় হচ্ছি সেই শহরটা তো মোটেও শিশুবান্ধব নয়। স্কুলে আমাদের বাচ্চাদের খেলার জায়গা নেই। কোথাও বেড়াতে যাওয়ার জায়গা নেই। আমাদের বাচ্চাদের রঙিন কোন শৈশব নেই। কতো কিছু যে রোজ আমার মাথায় আসে। মনে হয় আমরা আমাদের শিশুদের জন্য ঠিক কী রেখে যাচ্ছি!

শৈশব

আবার নানা হতাশার মধ্যেও আমি আশা দেখি। কখনো জোর করে, কখনো ইচ্ছে করে। এই যেমন, আমার দুই বছরের ছেলেটাকে আমি রোজ জাতীয় সঙ্গীত শোনাই। এখন যখন ও ভাঙা ভাঙা গলায় বলে আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসিইইইই, তখন আবার আমার চোখটা ভিজে যায়। মনে হয়, কখনো দেশ ছেড়ে যাবো না। এই যে ভালোবাসা, এই যে কান্না এর নামই হয়তো জীবন। এই জীবনের কারণেই হয়তো রোজ বলি, শুভ সকাল বাংলাদেশ। ভালোবাসি বাংলাদেশ।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button