ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

নিজেদের ‘আপার ছাত্রলীগ’ দাবি করা ছাত্রলীগকেও এমন স্বেচ্ছাচারী হতে হবে কেন!

বিগত ছাত্রলীগ কমিটি যখন সম্মেলন দিচ্ছিলো না, সভাপতি সাধারণ সম্পাদক ব্যতীত বাকিদের মূল্যায়ণ করা হয় না বলে অভিযোগ তুলা হয়েছিল, তখন একটি নতুন মেরুকরণের আভাস দেখা যায়। ছাত্রলীগের একটি পক্ষ সম্মেলন করে নতুন কমিটির দাবি তোলে। মজার ব্যাপার হলো, স্রেফ সম্মেলনের দাবি করার কারণে গত কমিটির নেতাদের অনুসারীদের হাতে মার খেতে হয় সম্মেলন চাওয়া কিছু নেতাকর্মীকে। নতুন সম্মেলনের সেই দাবি যায় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্ত। প্রধানমন্ত্রী নিজে পদপ্রার্থীদের ডেকে কথা বলেন। গোয়েন্দা রিপোর্ট হয়। সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের ফলাফল বর্তমান ছাত্রলীগ কমিটি। এই কমিটি শেখ হাসিনার তত্ত্বাবধানে গঠিত হওয়ায় বর্তমান কমিটির প্রতি সবার এক্সপেকটেশন অনেকটা বেড়ে যায়।

সত্যি বলতে এই কমিটির কাজকর্ম বেশ ইতিবাচক মনে হয়েছিল। অন্তত কথাবার্তা বেশ সেন্সিবল মনে হতো। কিন্তু, সময়ের সাথে সাথে এই কমিটি কতটুকু যোগ্যতা প্রমাণ করতে সমর্থ হলো, নেতাকর্মীদের মন জোগাতে সমর্থ হলো? সম্মেলনের পর এক বছর হয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি তারা দিতে পারেনি। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র মতে, কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ দুইবছর। সেই দুইবছরের সীমা পেরিয়ে বিগত কমিটি নতুন করে সম্মেলনের আয়োজনের কোনো আগ্রহ না দেখানোর ফলেই তো অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ হয়েছিল। যার ফলাফল বর্তমান কমিটি। সেই নতুন কমিটি নিজেদের দুই বছর মেয়াদের অর্ধেকটা শুধু সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক দিয়েই কাজ চালিয়ে নিলেন!

শোভন রাব্বানী ছাত্রলীগ

যাইহোক, অবশেষে ৩০১ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে সবাই ফুল নিয়ে শুভেচ্ছা জানাবে, আনন্দ উদযাপন করবে এটাই আকাঙখিত ছিল। কিন্তু, গতকাল দেখা গেল ভয়ংকর এক কাণ্ড। মধুর ক্যান্টিনে পদবঞ্চিত এবং যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি দাবি করা বেশ কিছু নেতারা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে গেলে সেখানে তাদের উপর অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার নেপথ্যে বর্তমান কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীরা জড়িত বলে আক্রান্ত নেতারা অভিযোগ করেন। স্বার্থের রাজনীতি মুখ্য হয়ে গেলে আদর্শ সেখানে কেবলমাত্র সাইনবোর্ড হয়ে যায়। বর্তমান ছাত্রলীগের অবস্থা সেরকম হয়ে গেল কিনা কে বলতে পারে!

নিজেদের ‘আপার ছাত্রলীগ’ বলে দাবি করা নেতাদের কমিটির বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ ভাবনার খোরাক যোগায়। এমন কমিটি উপহার দেয়ার জন্য নিশ্চয়ই শেখ হাসিনা এদেরকে দায়িত্ব দেননি। সদ্যঘোষিত ৩০১ সদস্যের কমিটিতে বিতর্কিত অনেককে স্থান দেয়ার অভিযোগ আছে। এই কমিটির প্রতি যেভাবে একের পর এক অভিযোগ বের হচ্ছে, তাতে করে এদের হাতে ছাত্রলীগ কতটুকু নিরাপদ তা আলোচনার দাবি রাখে।

গতকাল নতুন কমিটির বিপক্ষে নিজেদের ক্ষোভ জানাতে গেলে যেভাবে তাদের উপর আক্রমণ করা হয়, বিশেষত নারী নেতৃবৃন্দকে যেরকমভাবে হামলা করে রক্তাক্ত করা হয়েছে তা নজিরবিহীন। ‘আপার ছাত্রলীগ’ দাবি করা নেতার অনুসারীরা নারীদের প্রতি এরকম অসহিষ্ণু আচরণ কিভাবে করতে পারলো! যদিও আহত নারী ছাত্রলীগ নেত্রীদের কেউ কেউ এর আগে ক্যাম্পাসে ভিন্নমত দেয়া অন্য নারী ছাত্রীদের উপর হামলা চালিয়েছেন সংগঠনের নির্দেশে, ছত্রছায়ায়। সেসব ঘটনার বিচার হয়নি কখনো। এবার তারা নিজ সংগঠনের সহযাত্রীদের হাতেই মার খেলেন এর বিচার কি তারা আদায় করতে পারবেন? কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ছাত্রলীগের রাজনীতিতে এই ঘটনা নিঃসন্দেহে একটি কালো দাগ হয়ে থাকবে।

এই কমিটির প্রতি অনেক অভিযোগের দুটি অভিযোগ বেশ চিন্তায় ফেলে দেয়ার মতো। একটি হলো, পদ দেয়ার বিনিময়ে কক্সবাজারের এক নেতার কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগ। এটি সত্যি হলে বলতে হয়, বঙ্গবন্ধুর হাত গড়া সংগঠন ছাত্রলীগ রাজনীতি ব্যবসার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। আরেকটি অভিযোগ তো বেশ ভয়াবহ।

জারিন দিয়া নামক এক পদপ্রত্যাশী নেত্রী যা ইঙ্গিত করেছেন তাতে ছাত্রলীগে নারীদের পদ পাওয়ার জন্য যৌনতা কি যোগ্যতা নাকি সেই প্রশ্ন সামনে চলে আসে। তিনি তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন, “রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং গোলাম রাব্বানী ভাই আপনাদের মধুভর্তি মেয়ে লাগে। বড় বড় প্রোগ্রামে মেয়েদের মুখ না দেখলে তো আপনাদের মন ভরত না। শোভন ভাই আপনি একদিন আমাকে সবার সামনে বলছিলেন কী রে চেহারা সুন্দর আছে; তো সেজেগুজে আসতে পারো না! আমি সেজেগুজে আসতে পারি নাই দেখে আমাকে কমিটিতে রাখলেন না?”

গোলাম রাব্বানীকে উদ্দেশ্য করে তিনি লিখেছেন, “গোলাম রাব্বানী ভাই আমাকে সবার সামনে বলছিলেন দুইদিনের মেয়ে কেমনে পোস্ট পাইছো বুঝি নাই! কয়জনের বেডে গেছো রিপোর্ট করলেই জানা যাবে। মনে আছে গোলাম রাব্বানী ভাই?? আমি তখন আপনার যোগ্য কথার জবাব দিয়েছিলাম। আজ তার শোধ নিলেন?”

বর্তমান কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজপথ দাপিয়ে বেড়ানো বিগত হল কমিটির অনেক নেতৃবৃন্দকে মূল্যায়িত হতে দেখা যায়নি। বিগত কমিটির সাথে সুসম্পর্ক থাকাকে অযোগ্যতা বলে বিবেচনা করার অভিযোগ আছে। ফলে, এই কমিটিতে অনেক আনকোরা মুখকে ভাল ভাল পদে দেখা গেলেও, যোগ্যতা সত্ত্বেও অনেককে পেছনে পড়ে থাকতে হয়েছে। ঢাবির ভিসি পুত্র, মিস ওয়ার্ল্ড লাবনী, ছাত্রলীগ সভাপতি শোভনের ভাই ছোটন এই কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন।

কিন্তু জায়গা হয়নি দীর্ঘদিন সংগঠনকে সময় দেয়া অনেক নেতার। বরং বিবাহিত, অছাত্র, মাদকসেবী, চাকরিজীবি, রাজাকারপুত্রকে এই কমিটিতে জায়গা দেয়া হয়েছে বলে পদবঞ্চিত নেতারা দাবি করছেন। এই দাবিগুলো সত্য হলে ‘আপার ছাত্রলীগ’ নিয়ে আপাকে নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ, ‘আপার ছাত্রলীগ’ শব্দযুগলের সুবিধা নিয়ে তারা শেখ হাসিনার নাম বিক্রি করে স্বেচ্ছাচারিতা করেন বলেন বলে পদবঞ্চিতদের অভিযোগ।

ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ছাত্রলীগ নিজেদের মধ্যে যে কাদা ছোঁড়াছুড়ির সংস্কৃতি চালু করেছে, রক্তাক্ত করার ইতিহাস গড়ছে, নারী নির্যাতনের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটাচ্ছে তা রাজনীতির জন্য সুখকর কোনো আলামত নয়। ‘আপার ছাত্রলীগ’ বলা নেতারা কি বুঝতে পারছে না, তাদের এসব কীর্তি যে আপার ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করছে? হাজার হোক, আপার সামনে দাঁড়িয়ে তারা নিশ্চয়ই স্বপ্নের ছাত্রলীগ গড়বার অঙ্গীকার দিয়েছিল। এটা কোনোভাবেই কি এখন স্বপ্নের ছাত্রলীগ, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ছাত্রলীগ আছে?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button