মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

এই ছাত্রলীগ কে দিয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?

(১) কাটাবনের পশু-পাখি বিক্রির দোকানের উলটো দিকে দাঁড়িয়ে রইলাম প্রায় পাক্কা আধা ঘন্টা। তারিখ ৮ ই সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৭ টা বা ৮টা প্রায়।

যদি আমি হিসেবে ভুলও করে থাকি তাহলে ছাত্রলীগের ক্যাডারদের প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ টি মটর বাইকের একটা শোভা যাত্রা শেষ হতেই লেগে গেলো এই সময়।

বাইক যাত্রার মাঝে একটা কালো জীপ গাড়ি। এস্কর্ট করে নিয়ে যাচ্ছে হোমড়া চোমড়া কাউকে। রাস্তার লোকেরা বলছিলো শোভন নাইলে রাব্বানি যাচ্ছে। তাই এই বহর।

আমি ভীনদেশী নাগরিক বিহবল হয়ে তাকিয়ে রই সেই যাত্রার দিকে। যেন এক অসীম যাত্রা এটি। এক বাইকে দুইজন বা তিনজন করে এক প্রবল সরব হই হই রই রই যাত্রা। ছাত্রলীগের সর্দার ক্যাপাসে যাচ্ছে তার বিশ্বস্ত চামুন্ডাদের নিয়ে।

আবরার
ছাত্রলীগের পিটুনিতে নিহত বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহিম

(২) জাতীয় ইলেকশনের আগের রাত কিংবা তারও একদিন আগের রাত। গভীর রাতে আমি আর রিফাত গেছি টি এস সি তে চা পান করতে। আমরা রাজু ভাষ্কর্যের পেছনের উঁচু যায়গায় বসে রয়েছি আর চা পান করছি।

চট করে এক যুবক একটা রিকশা থেকে সুপারম্যানের মত আমাদের সামনে ঝাঁপ দিয়ে নামলেন। নেমেই চা ওয়ালা ছোট্ট কিশোরের ঝুলি থেকে দশ থেকে বারোটা প্লাস্টিকের চায়ের কাপ নিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে আবার রিকশায় উঠে চলে গেলো। আমি আর রিফাত কিছুই বুঝলাম না। চা ওয়ালা কিশোরটিকে জিজ্ঞেস করতেই সে বল্লো, স্যার কিছুনা… কিছুনা…

চাপাচাপি করতেই জানলাম এই ছাত্রলীগের চামুন্ডা মনে করে এই ক্যাম্পাসটি তার বাবার অথবা চাচার। যে কারও ঝুলি থেকে টান দিয়ে টাকা নিতে পারে, খাবার নিতে পারে কিংবা সেই লোকটিকেই মেরে ফেলতে পারে ফলে গরীব চা ওয়ালা কিশোরের কাছ থেকে ঝাঁপ দিয়ে খপ করে প্লাস্টিকের কাপ নেয়াটা আর এটা নিয়ে কথা বলাটাই হাস্যকর ব্যাপার।

অনেক চেষ্টা করলাম শ্রীমানের নামটি জানবার। কিশোরটি বল্লোই না। আমি চলে যাব লন্ডনে দুদিন পর কিন্তু চা ওয়ালা কিশোরকে চা এই ক্যাম্পাসেই বিক্রি করতে হবে। বেঁচে থাকতে হবে। জানের কাফফারা হিসেবে কয়েকটা প্লাস্টিকের কাপ হলো জানের সদকা। এটি নিয়ে বাহাসের কিছু নেই।

আবরারের বাবা কাঁদছেন ছেলের শোকে, আর খুনী জীয়ন হাসছে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েও!

(৩) দুটো ব্যাপার। এক হচ্ছে, একদল লোক কপালে চোখ উঠিয়ে বলছে ছি ছি ছাত্রলীগ এই কাজটা করলো? আর দুই হচ্ছে,যথাযোগ্য চেষ্টা নিয়ে একদল লোক প্রমাণ করবার চেষ্টা চালাচ্ছে খুনের শিকার আবরার ছেলেটি শিবির নয় বরং তাঁর পুরো পরিবার আওয়ামীলীগের মহা সমর্থক।

দুটি ক্ষেত্রেই আসলে আমাদের জানতে বা অজান্তে আমরা কোনো না কোনোভাবে অন্যায়কে জাস্টিফাই করবার উপাদান রেখে যাচ্ছি এমনভাবে যেটির রিপারকেশন বড় ভয়াবহ।

আমি যুক্তির খাতিরে কিংবা অযুক্তির খাতিরেই প্রশ্ন তুলে বলি, যদি নিহত আবরার শিবির সমর্থকও হয়েও থাকেন কিংবা শিবিরের সাথে জড়িতও হয়ে থাকেন কিংবা তাঁর পুরো পরিবার শিবির হয়ে থাকেন তাহলে তাঁকে হত্যা করবার লাইসেন্স কি রাষ্ট্র ছাত্রলীগকে কিংবা রাষ্ট্র নিজেই সেই হত্যার লাইসেন্স পায় কিনা?

(৪) আবরারের দুই বাহুতে কালশিটে দাগ ছিলো প্রখর। বুঝতে পারা যায় আবরারকে প্রবল ভাবে দু হাতে পেটানো হয়েছে। যতদূর জানা যায়, আবরারের অপরাধ তিনি প্রভু ভারতের বিরুদ্ধে একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছেন শনিবারে।

আমি আবরারের ফেসবুক প্রোফাইল স্ক্রল করি। করতে থাকি। প্রোফাইলে লেখা রয়েছে-

“অনন্ত মহাকালে মোর যাত্রা অসীম মহাকাশের অন্তে”

অনন্ত মহাকালেই চলে গেলো ছেলেটি। সুতীব্র ডোজের কিছু এন্টি ডিপ্রেশনের ঔষধ শরীরে থাকায় আমি খানিকটা নির্বাক থাকি। অনুভূতি খুব একটা কাজ করে না অথবা করতে চায়না। নার্ভ শক্ত করে তাকিয়ে রই কম্পিউটার স্ক্রীণের দিকে।

(৫) মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, এই মোবাইল কে দিয়েছে, এই ফেসবুক কে দিয়েছে, এই ইউটিউব কে দিয়েছে। সংসদের দাঁতাল নেতারা সমস্বরে বলেছিলেন আওয়ামী লীগ…আওয়ামীলীগ…

রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা করার পর তাই ফারুক ওয়াসিফ ভাই প্রশ্ন করেছিলেন “এই রামদা কে দিয়েছে?”

উত্তর তিনি পাননি কিংবা পাওয়া যায়নি। তারপরেও আমি সেই সুরেই শুধু একটা প্রশ্ন করি,

“এই ছাত্রলীগ কে দিয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?”

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button