মতামত

ভারত যখন চাঁদে পাড়ি দিচ্ছে, আমরা তখন ট্রল করছি!

চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণের ঠিক কয়েক মিনিট আগে ভারতীয় নভোযান চন্দ্রযান-২ এর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে কন্ট্রোল রুমের। সেই যোগাযোগ এখনও স্থাপন করা সম্ভব হয়নি, তবে ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন (সংক্ষেপে ইসরো, লেখার পরবর্তী অংশে সংস্থাটিকে এই নামেই ডাকা হবে) চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, চন্দ্রপৃষ্ঠে খোঁজ পাওয়া গেছে চন্দ্রযান-২ এর ল্যান্ডার মডিউল, যার নাম দেয়া হয়েছিল বিক্রম।

ভারতের চন্দ্রবিজয়ের অভিযান অপ্রত্যাশিত একটা ধাক্কা খেয়েছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। যে কোন মহাকাশযানের জন্যে অবতরণের আগের পনেরো মিনিট খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে মহাকাশযানের গতি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা হয়, ভারী এই যানটি মহাশূন্যে ভাসতে থাকে পালকের মতো। নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে কোথাও একটু উনিশ-বিশ হলেই সব শেষ। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা এই সময়টার নাম দিয়েছেন ফিফটিন মিনিটস ফিয়ার বা পনেরো মিনিটের আতঙ্ক। চন্দ্রযান-২ ও এই সময়েই ঝামেলায় পড়েছে, চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২.১ কিলোমিটার দূরে থাকা অবস্থায় কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে যোগাযোগ।

অভিযানটা সফল হলে আমেরিকা, রাশিয়া এবং চীনের পরে চাঁদে সফল অভিযান পরিচালনা করা চতুর্থ দেশ হয়ে যেতো ভারত। স্বাভাবিকভাবেই, ভারতের মহাকাশবিজ্ঞানীদের কাছে খবরটা মন খারাপের বার্তা নিয়েই হাজির হয়েছে। ইসরোর চেয়ারম্যান ড. কে শিবন তো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই ফেলেছেন।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, ইসরোর এই মিশনটা সফল না হওয়ায় সংস্থাটির বিজ্ঞানীদের মন যতোটা না খারাপ হয়েছে, তারচেয়ে বেশি অনেক বেশি আনন্দিত হয়েছে আমাদের দেশের একদল উজবুক মাথামোটা গর্ধভ। তাদের ঘরে ঘরে ঈদের আনন্দ শুরু হয়ে গেছে। ভারতীয় মহাকাশ অভিযান ব্যর্থ হওয়ায় তারা এখন তামাশা আর নোংরামীর বাহারি পসরা সাজিয়ে বসেছে।

আনন্দবাজার পত্রিকা সহ কলকাতাভিত্তিক আরও কিছু বাংলা সংবাদমাধ্যমের নিউজ লিঙ্কের কমেন্টবক্সে এই লোকগুলো গিয়ে নিজেদের বংশপরিচয় দিয়ে আসছে। তারা ভারতকে গালিগালাজ করছে, বিনিময়ে ভারতীয়দের অনেকেও বাংলাদেশের নাম বিকৃত করে সেসব গালির জবাব দিচ্ছে। এতে করে যে নিজের দেশের নামেই কালি লাগছে, সেটা এই মাথামোটার দল বুঝতে পারছে না, পারার কথাও নয় অবশ্য।

আমরা ভারতের ধর্ষণ সংখ্যা নিয়ে কথা বলি, অথচ ভারত ঠিকই ধর্ষণের ঘটনার বিচার করে ফেলে। আমরা ভারতের কোন কোন অঞ্চলের মানুষের টয়লেট ব্যবহার না করার সংস্কৃতি নিয়ে হাসিঠাট্টা করি, সেই ফাঁকে তারা নিজেদের মহাকাশযান চাঁদে পাঠিয়ে দেয়। আর আমরা শুধু পকেটের টাকা ঢেলে অন্য দেশ থেকে স্যাটেলাইট বানাই, অন্য দেশ থেকে সেটা উৎক্ষেপণও করা হয়, সেখানে টাকা ঢালা ছাড়া আমাদের আর কোন অবদান নেই, আমাদের দেশের কোন বিজ্ঞানীর সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই সেখানে।

অথচ ভারত পুরো অভিযানটা পরিচালনা করেছে নিজেদের লোক দিয়ে, সেটার নির্মাণ থেকে নিয়ন্ত্রণ- সবকিছুই করেছেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা, উৎক্ষেপণও করা হয়েছে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে। এই বাস্তবতা মাথায় রাখলে চন্দ্রযানের অভিযান ব্যর্থ হবার অজুহাতে ভারতকে ট্রল করার কোন যোগ্যতাই আমাদের নেই। তবে সেটা আর ক’জনই বা মাথায় রাখে?

মাত্র এক হাজার কোটি রূপি খরচে এই চন্দ্রযান-২ অভিযানটা চালিয়েছে ভারত। বাংলাদেশী মুদ্রায় হিসেব করতে গেলে বারশো কোটি টাকার মতো খরচ হয়েছে। কিছুদিন আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীর দুর্নীতির খবর এসেছিলো পত্রিকায়, জানা গিয়েছিল, প্রায় পনেরশো কোটি টাকার সম্পদ আছে তার! কেরানী পদমর্যাদার লোকজন আমাদের দেশে দুর্নীতি করে পনেরশো কোটি টাকার সম্পদ গড়ে, আর এরচেয়েও কম খরচে ভারত চাঁদে মহাকাশযান পাঠায়। পার্থক্যটা কোথায়, ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখতে পারেন।

মহাকাশ অভিযানে সবচেয়ে সফল যে সংস্থাটি, সেই নাসাও চন্দ্রযান-২ এর অভিযানের পরে ইসরোকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছে, তারা ভবিষ্যতে ইসরোর সঙ্গে কাজ করতে চায়। নাসার একেকটা অভিযানে গড়ে বিশ হাজার কোটি রূপি খরচ হয়, সেখানে এর মাত্র বিশভাগের একভাগ টাকা দিয়েই চাঁদে অভিযান চালিয়ে ফেলেছে। নাসা তাদের একটা বিশেষজ্ঞ দলকে পাঠাচ্ছে ভারতে, তারা ইসরোর সঙ্গে কাজ করবে। আর আমরা বসে বসে ট্রল করবো, করতেই থাকবো, এটাই আমাদের কাজ। ভারত চাঁদে চলে যাচ্ছে, আমরা ফেসবুকের নিউজফিডে নোংরামি করার চক্কর থেকে বের হতে পারছি না, পারবোও না।

এককালে আমরা ছিলাম মাছেভাতে বাঙালী। এখন হয়ে গেছি ট্রলে-গালিতে বাঙালী। আমরা রশিদ খানের বয়স নিয়ে ট্রল করি, সেই রশিদ খান তার নবীন একটা দল নিয়ে চট্টগ্রামে এসে আমাদের টেস্টে হারিয়ে যায়। আমরা ভাব ধরি ক্রিকেটে আমরা ভারতের সমকক্ষ, অথচ নিজেদের মাঠে আফগানিস্তানের কাছেও পাত্তা পাই না। আমরা ভারতের ব্যর্থতার খবর শুনে দাঁত বের করে হাসি, অথচ নিজেদের পেছন থেকে কাপড়চোপড় যে দমকা বাতাসে উড়ে গেছে অনেক আগে, সেটার কোন খোঁজ রাখি না। বড় অদ্ভুত স্বভাব আমাদের!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button