ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

চাঁদ দেখা কমিটি ও একটি তামাশার গল্প!

ঈদ যেমনই কাটুক, চাঁদ দেখার ঘোষণার সাথে সেই সন্ধ্যাটায় একটা উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। একটা অদ্ভুত আবহ তৈরি হয়। বিশেষ করে ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ..’ গানটা টিভিতে যখন বাজে তখনই একটা ভাইব তৈরি হয়। মনে হয় সত্যিই ঈদ এসেছে।

তারাবির নামাজটা পড়তে হয় না। সেহরি খেতে উঠতে হবে বলে মায়েদের তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ার বাধ্যকতা থাকে না। বাপ চাচারা একটু রিল্যাক্স করতে পারেন। বোনেরা মেহদির ডিজাইন বইটা সামনে রেখে হাত রাঙাতে পারে। চাঁদ রাতের সন্ধ্যায় বাইরে বের হয়ে দেখি মানুষের স্রোত। সবাই ঘর ছেড়ে বেরোয়। ছোট ছোট ছেলেপেলে রাস্তা মাতিয়ে রাখে। রিকশাওয়ালারা ছুটে শেষসময়ে বাড়তি কিছু ক্ষেপ মারার জন্যে। রাস্তাঘাট একটু বেশি আলোকিত মনে হয়। মনে হতে থাকে নগরী ঘুম থেকে জেগে উঠেছে।

উৎসব শুধু একটা ঘোষণা না, তারিখ না। এটা তার চেয়ে বেশি কিছু। অনেকগুলো মুহুর্ত মিলে তৈরি হওয়া কিছু স্মৃতি। আমাদের জীবনে কি আছে! এসব সুন্দর মুহুর্তগুলোই তো দিনশেষে থাকে। এগুলোই যদি নষ্ট হয়ে যায় বেখেয়ালিতে..

ঈদের দিনের চেয়েও চাঁদ রাতটা অনেকের কাছে বেশি উপভোগ্য। এসব রাত এভাবে নাটক করে নষ্ট দেয়ার জন্যে নয়। ঈদ নিশ্চয়ই হবে কালকে, হয়ত হিসেব মতো কালই হওয়ার কথা। কিন্তু, মাঝখানের এমন নাটক দেখে মনে হচ্ছে, ঈদটা কেউ চাপিয়ে দিলো শেষমেষ। এভাবে তামাশা না করলেও পারতেন তারা।

আমাদের শৈশবের চাঁদরাতের কথা মনে পড়লে আজকালকার সময়ের ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর জন্য কেমন মায়া লাগে। যেমনই হোক, আমরা কালকে ঈদ এই ব্যাপারটাকে কি দারুণভাবে উপভোগ করতাম। অন্যদিন দেরি করে ঘরে ফেরা যাবে না কিন্তু চাঁদরাতে একটু স্বাধীনতা মিলতো। এলাকার বন্ধু বান্ধবের সাথে একটু বেশিক্ষণ আড্ডা দেয়ার সুযোগ মিলত। ঈদ নিয়ে বাড়তি একটা টান টান উত্তেজনা তৈরি হয়ে যেত। কখনো কোনো বন্ধু কিভাবে যেন আতশবাজি ম্যানেজ করে ফেলত এবং সেসব নিয়ে কিছুক্ষণ আনন্দ করতাম।

এখনকার দিনে সেসব এমনিতে কিছুটা ফিঁকে হয়ে গেছে হয়ত। তবুও, চাঁদরাত বলে একটা আমেজ এখনো আছে। কিন্তু, এই বছর চাঁদ দেখা কমিটির কারণে কেমন ঘুরে গেল সব। উনারা জানালেন, চাঁদ দেখা যায়নি। ঈদ বৃহস্পতিবার হবে। এরপর নানা মুনির নানা মত। কত আলাপ আলোচনা উঠলো। অতঃপর মানুষ ঈদের প্রস্তুতি বাদ দিয়ে আরো একদিন রোজা রাখার জন্য মানসিকভাবে তৈরি হলো। তারাবির নামাজ হলো মসজিদে। সেহরির রান্না করে অনেক মায়েরা আমার মায়ের মতো ঘুমাতেও গেল।

কিন্তু, বাংলাদেশ বলে কথা। এখানে কত কিছু পালটে যায়, কত অস্বাভাবিক কাজ স্বাভাবিক রুপে ঘটে যায়। তাই বলে চাঁদ দেখা নিয়েও এমন হতে হবে? রাত এগারোটায় প্রেস ডেকে ঘোষণা দেয়া হলো, কাল ঈদ। ব্যাখ্যা শুনানো হলো কিভাবে কি হয়েছে। প্রথমে নাকি সব সোর্স বলেছে চাঁদ দেখা যায়নি৷ হেফাজতের শফি হুজুরও নাকি বলেছে সে নিশ্চিত চাঁদ দেখা যায়নি। তাই ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো ঈদ হবে না। কমিটির লোকরাও নাকি তারাবি পড়তে গিয়েছেন বাইতুল মোকাররমে। তখন তাদের কাছে আবার খবর আসে, কোথাও কোথাও চাঁদ দেখা গেছে। স্বাক্ষীও নাকি পাওয়া গেছে।

এই যে এত নাটকীয়তা এসবের মানে কি? প্রযুক্তির এই যুগে চাঁদ দেখা নিয়ে এমন টুইস্ট কি হাস্যকর না? সৌদিতে ঈদ হয়েছে বলে পরেরদিন বাংলাদেশে ঈদ হবে এমন একটা সাধারণ মতবাদ কিভাবে যেন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এখন কি সৌদির সাথে সামঞ্জস্য করেই চাঁদের ঘোষণা দেয়া হলো কিনা, নাকি মানুষের চাপে, জনগণের চাপে, ফেসবুকে সমালোচনার চাপে ঘোষণা দেয়া হলো কে জানে! এর নেপথ্যে কি আছে তা আমাদের জানা হবে না।

কেউ কেউ রসিকতা করে প্রধানমন্ত্রীকে চাঁদ দেখা যাওয়ার ঘোষণায় ধন্যবাদ জানিয়েছে। কারণ, আজকাল সব কিছুতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ না থাকলে সিদ্ধান্ত আসে না। সব ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে, এবং সব ইস্যুতে তাকে মুখস্থ ধন্যবাদ জানানোর রীতির কারণে এই রসিকতার জন্ম হয়েছে।

এর আগে অনেকে সারকাজম করে লিখেছেন, আড়ং ক্ষমতা দেখিয়ে ঈদ পিছিয়ে দিয়েছে যেন তারা আরো একদিন ব্যবসা করতে পারে। কেউ কেউ আবার “আলহামদুলিল্লাহ আরেকটা রোজা রাখার সুযোগ পাওয়া গেছে” বলে শুকরিয়া আদায় করেছেন। আবার কেউ কেউ চাঁদ দেখা বিষয়ক হাদিস এনে হাজির করেছেন এবং জানিয়েছেন চাঁদ দেখে ঈদ করতে হবে, তাই চাঁদ যেহেতু দেখা যায়নি এটা নিয়ে বাড়াবাড়ির কিছু নেই। আচ্ছা তারা কি এখন চাঁদ দেখা কমিটির কথায় কনভিন্স হয়েছেন নাকি তারা রোজা রাখবেন কাল?

এরকম জলঘোলা পরিস্থিতি দেখে মানুষও হতচকিত হয়ে আছে আসলে। বাংলাদেশে এক এরশাদ আছেন যার কথায় কেউ পুরোপুরি বিশ্বাস করে না। কারণ আপনি যখন এরশাদের কোনো কথা বিশ্বাস করবেন, ঠিক তার পরই এরশাদ কথা ঘুরিয়ে ফেলবে। নিজের কথা নিজেই ফিরিয়ে নিবে। চাঁদ দেখা কমিটি এরশাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার পথে বেশ এগিয়ে গেল। অনেকে তো বলছেন সেহরি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। বলা যায় না, আবার যদি নতুন কোনো ঘোষণা আসে…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button