মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

রহমত আলীর পোড়া ডিমের জন্য প্রার্থনা…

রহমত আলী পেশায় একজন রিকশা চালক। যেনতেন রিকশা চালক নয়, একেবারে গুলশান-বনানী এলাকার রিকশা চালক সে। এই এলাকার রিকশাচালকদের আলাদা এক ধরণের ইউনিফর্মের মত আছে। এই বিষয়টা রহমত আলী ভালোই উপভোগ করে। নিজেকে বেশ অফিসার অফিসার বলে মনে হয়। এর আগে সে ধানমণ্ডি এলাকায় রিকশা চালিয়েছে, সেখানে তার কোন বিশেষ পোশাক ছিলো না। বিশেষ পোশাক মানেই বিশেষ সম্মান- এই কথাটি রহমত আলী মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। এই কোটির মত পোশাকটি তাই সে বিশেষ ভাবে রক্ষণাবেক্ষণের চেষ্টা করে। পড়নের সাদা শার্টটি বহুদিনের ব্যবহারে প্রায় বনানী ১১ নাম্বার রাস্তার রঙ ধারণ করলেও, এই কোটি সদৃশ পোশাকটি সে ধুয়ে-শুকিয়ে পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে যত্নশীল।

এই মুহুর্তে রহমত আলী এসেছে ডিম পোড়া খেতে। এই ডিম পোড়ার খবরটি তাকে জানিয়েছে রাসেল। রাসেল এই এলাকায় দিনের বেলা একটি বাড়িতে সিকিউরিটি গার্ড এবং রাতের বেলা গাঁজার সাপ্লায়ার হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। তবে রাসেলের সাথে রহমত আলীর সখ্যতার কারণ খুঁজতে গেলে আমাদেরকে বেশ আয়েশ করে, হাতে চায়ের কাপ বা পানপাত্র সাথে নিয়ে বসতে হবে। শুধু এইটুকু জেনে রাখাটাই যথেষ্ট যে রাসেল গাঁজা টেনে বেশ চমৎকার বাঁশি বাজাতে পারে এবং রহমত আলী একজন সঙ্গীত সমঝদার ও সংস্কৃতি মনষ্ক মানুষ।

গুলশান ডিএনসিসি মার্কেটে আগুন লাগার খবর বাতাসে ভেসে ভেসে এ প্রান্তে অবস্থানরত রহমত আলীর কানে আগেই পৌছেছিলো। সে বরাবরই ঝামেলা এড়িয়ে চলা মানুষ, তাই ওদিকে ছুটে যায়নি। ভেবেছে যাত্রী পেলে আস্তে আস্তে এগোনো যাবে। অনেক আগে একবার এক বস্তিতে আগুন লাগার সময় সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুটো পরিবারকে তাদের জিনিস পত্র বের করে আনতে সাহায্য করেছিলো এবং আরো তিনটি পরিবার আগেই ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে যাওয়ায় তাদের জিনিসপত্র নিজের মনে করে সাথে নিয়ে এসেছিলো, যতটুকু সম্ভব। কিন্তু ফিরে এসে সে আর তার রিকশাটি খুঁজে পায় নি। উদ্ধারকৃত জিনিসপত্রের মূল্য তার রিকশা হারানোর ক্ষতির পরিমাণ পুষিয়ে দিতে পেরেছিলো কিনা জানা না গেলেও, এই ঘটনাটি রহমত আলী আল্লাহর তরফ থেকে তার প্রতি চুরির শাস্তি হিসেবে মেনে নিয়েছিলো বলেই আমরা জানতে পারি।

Image Source- dhakatribune.com

আগুনের আচ যেন অনেক দূরে অবস্থান করা রহমত আলীর মস্তিষ্কে আঘাত করছে। তাই রাসেল যখন তাকে খবর দিলো যে মার্কেটের পুড়ে যাওয়া অনেক জিনিসের মধ্যে নানাবিধ খাদ্য দ্রব্য এখনো খাবার উপযোগী অবস্থায় আছে এবং ডিউটি থাকায় রাসেল যেতে না পারলেও রহমত আলীর অবশ্যই সেখানে যাওয়া উচিত, তখন রহমত আলীর মধ্যে যে অনুভূতির জন্ম হয়েছিল, সেটা বিশ্লেষণ করে আমরা ধারণা করতে পারি প্রাগৈতিহাসিক কালের সেই গুহামানবের অনুভূতির কথা, যখন সে প্রথম বারের মত কাঁচা হরিণের মাংস আগুনে ঝলসিয়ে খেতে পেরেছিলো।

কিন্তু রহমত আলী ঘটনাস্থলে পৌঁছে বুঝতে পারলো তার আরো আগেই এখানে আসা দরকার ছিলো। সে অবাক হয়ে লক্ষ করলো এখানে শুধু পোড়া ডিম নয়, নানাবিধ পোড়া সবজি, এমনকি পোড়া মাংসেরও ব্যবস্থা আছে। এবং এসকল পোড়া খাদ্যদ্রব্য এবং খাওয়া যায়না এমন সব খাবারের লোভে অসংখ্য প্রাণী এখানে এসে ভীড় জমিয়েছে। এই সকল প্রাণীদের মধ্যে মানুষের সংখ্যাই বেশি। এছাড়াও অদূরে সাত আটজন কাক আর তিনজন গম্ভীর কুকুরের উপস্থিতি আমরা দেখতে পাবো। কাক গুলোর মধ্যে তিনটি ধূসর এবং বাকি গুলো কালো রঙের। কুকুরদের মধ্যে একজন বাদামী, একজন সাদা এবং একজন সাদা কালোর মিশ্রণ। এছাড়া মানুষদের মধ্যে বেশিরভাগ শার্ট-প্যান্ট, কয়েকজন গেঞ্জি, অল্প কিছু লুঙ্গি আর গোটা কয়েক হোমরাচোমরা এখানে ভীড় করেছে। সবাই খাচ্ছে, যে যার মত।

মানুষগুলোর জন্য বরং কুকুর এবং কাকদের বেশ অসুবিধা হচ্ছে। রহমত আলী কুকুর এবং কাক গুলোর জন্য গভীর বেদনা অনুভব করলো। ডিম পোড়া বা নিদেন পক্ষে একটা আলু পোড়া পাওয়া যাবে এই আশায় সে ঘটনাস্থলের ভিতরে প্রবেশ করতে সচেষ্ট হলো। সেখানে কেউ একজন ক্ষীণ স্বরে এভাবে মালিকের অনুমতি ব্যতীত ডিম পোড়া খাওয়া ঠিক হচ্ছে কিনা- এমন উদ্ভট, হাস্যকর এবং অবান্তর একটি প্রশ্ন উত্থাপন করার চেষ্টা করলে সেখানে উপস্থিত একজন দার্শনিক মন্তব্য করলেন, “আরে মিয়া এইগুলান জিনিস তো নষ্টই হইয়া গেছে। আমরা যদি একটা দুইটা খাই তাতে পবলেমটা কোন খানে?” রহমত আলীর মধ্যে যদিও দ্বিধাদ্বন্দ্বের কোন অস্তিত্ব থাকার কথা নয়, কিন্তু আমরা যদি ধরে নেই সেখানে সূক্ষ্ণ একটা দ্বন্দ্বের রেখা কোথাও না কোথাও ছিলো, এই দার্শনিক ব্যাখ্যার পর সেটি আর থাকার কথা নয়।

রহমত আলী দেখলো বেশ কজন প্রাণী, যারা কিনা ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ প্রজাতির, তারা কিছু ডিম পকেটে ভরে নিয়ে যাচ্ছে। যদিও রহমত আলী জানে না যে হোমো স্যাপিয়েন্স শব্দের অর্থ ‘জ্ঞানী মানুষ’ , তবুও এই মানুষ গুলোর জ্ঞান দেখে সে চমৎকৃত হয়। শুধু নিজে খেলেই তো হবে না, অন্যদের কথাও ভাবতে হবে। প্রায় শুক্রবার, যেসব শুক্রবারের আগের রাতে সে নেশা করা থেকে বিরত থাকে, সেসব শুক্রবারে মসজিদে জুম্মার নামায আদায় করতে গেলে মাঝেমধ্যেই তবারক হিসেবে জিলিপি পায় সে। করুণ মুখ করে সে আরো দুটো অতিরিক্ত জিলিপি আদায় করতে কখনই ভুল করে না। এই অতিরিক্ত জিলিপি সে তার ছেলে আর দ্বিতীয় স্ত্রীর জন্য নিয়ে যায়। যতদূর জানা যায়, এতে তারা সাধারণত খুশিই হয়ে থাকে।

রহমত আলী লক্ষ করলো এখানে ভদ্রলোকেদের আনাগোণা যথেষ্ট। ভদ্রলোক সম্প্রদায়ের মধ্যে দোকানদাররাও আছে, বিহবল চেহারা দেখে যাদের আলাদা করে শনাক্ত করা সম্ভব। রহমত আলী যথেষ্ট দক্ষ হলে বিহবলতার মাত্রা পরিমাপ করে ক্ষতির পরিমাণ বের করে ফেলতে সক্ষম হতো। কিন্তু যেহেতু রহমত আলী সেই অনুপাতে দক্ষ নয় এবং ক্ষতির মাত্রা পরিমাপের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্তরাও এখানে উপস্থিত তাই আমরা এ যাত্রায় রহমত আলীকে ছেড়ে দিতে পারি।

দায়িত্বপ্রাপ্তরা এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের দায়িত্ব প্রদানকারী দায়িত্ববানরা এখানে ডিম পোড়া খেতে এসেছে কিনা সেটা ভেবে রহমত আলীর সাথে সাথে আমাদেরও কৌতূহল সৃষ্টি হয়। শ্রবণ শক্তি প্রখর হয়ে থাকলে কাছাকাছি কোন চলমান প্রাইভেট কারের রেডিওতে প্রচারিত খবর থেকে আমরা জানতে পারবো দায়িত্ববানরা ইতিমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ফেলেছে। রহমত আলী শেষ পর্যন্ত এই দায়িত্ববানদের এখানে আসার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। তদন্ত কমিটিকে আপ্যায়ন করার জন্য প্রয়োজনীয় নাস্তার ব্যবস্থা এই পোড়া ডিম থেকে করা হবে কি না সেটা নিয়ে তার আর কোন সন্দেহ থাকে না।

Image Courtesy- The daily star.

কিন্তু আমাদের সন্দেহ থেকে যায়। আমরা জানতে পারি না রহমত আলী শেষ পর্যন্ত কটা ডিম খেয়েছিলো বা আদৌ সে কোন ডিম খেতে পেরেছিলো কিনা। সে কি অতিরিক্ত কিছু ডিম তার ছেলে এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর জন্য নিয়ে গিয়েছিলো? যেহেতু রাসেল তাকে এই খবরটি দিয়েছে এবং যেহেতু রাসেলের বাঁশি তার বেশ ভালো লাগে সেহেতু সে কি রাসেলের জন্যও ডিম নিয়ে গিয়েছিলো? আমরা আরো জানতে পারি না ডিম ঠিক কতটুকু পুড়েছিলো? ওগুলো খেতে কি যথেষ্ট পরিমাণে সুস্বাদু ছিলো? তবে আমরা একটু চেষ্টা করলে এই তথ্য গুলো তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে খুঁজে পেতে পারি। তাদেরকে আপ্যায়ন কালে যে পোড়া ডিম তাদের খেতে দেয়া হয়েছে সেটার ব্যাপারে যাবতীয় তথ্য তারা তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে লিখে রাখবে- এটুকু আস্থা আমাদের, তাদের প্রতি রয়েছে।

মনুষ্য পরিচালিত বিভিন্ন প্রাচীন সংস্থা, এই যেমন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, তাদের প্রতিও রহমত আলী এবং আমাদের এই টুকু আস্থা রয়েছে যে, ভদ্রলোকেরা যেন পোড়া ডিম আরাম করে বসে খেতে পারে, সে ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ তারা গ্রহণ করবে। এই সুযোগে রহমত আলীর মনের কথাটা আমরা এই কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে রাখতে পারি। রিকশাচালক রহমত আলীর আর্জি, মানুষের কথা না হলেও এই শহরের কাক এবং কুকুরদের উন্নয়নের ব্যাপারে তারা যেন একটু বিশেষ ভাবে চিন্তা করে। তদন্তকারী কমিটিও বিষয়টি ভেবে দেখবে বলে আশা করা যায়।

রহমত আলীকে ছেড়ে তাই আমরা তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করি। আর প্রার্থনা করি যেন রহমত আলী এরপর এ ধরণের ঘটনায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যথেষ্ট পরিমাণ পোড়া ডিম সংগ্রহ করতে পারে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button