ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

বুয়েট কেন হবে মধ্যযুগীয় টর্চারসেল?

বুয়েট- দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞান বিভাগের প্রতিটা শিক্ষার্থীর স্বপ্নের গন্তব্যস্থল। ভর্তিপরীক্ষায় এখানে একটা আসনের জন্যে যে পরিমাণ প্রতিদ্বন্দ্বীতা হয়, সেটার সাথে বিসিএস ছাড়া বাংলাদেশের আর কোন প্রতিযোগীতামূলক পরীক্ষাকেই মেলানো যাবে না। অথচ এখন আমরা জানতে পারছি, দেশসেরা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটাকে নাকি মধ্যযুগীয় টর্চারসেলে পরিণত করেছিল রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি নিয়ে ঘোরা একদল অমানুষ। আবরার ফাহিমের মৃত্যুটা না হলে হয়তো কখনোই জানা হতো না, হাজার হাজার শিক্ষার্থীর স্বপ্নগুলোকে কিভাবে দুমড়ে মুচড়ে পায়ের নিচে পিষে দুঃস্বপ্নের প্রহরে পরিণত করছে ‘বড়ভাই’ নামধারী পলিটিক্যাল ক্যাডারেরা।

আবরারের হত্যাকাণ্ডের পরে অনেকেই সাহস করে মুখ খুলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছেন তাদের বুয়েট জীবনের বিভীষিকাময় স্মৃতিগুলোর কথা। কষ্ট, ব্যাথা আর অপমানের যে গল্পগুলো তারা মনের গহীন কোনে চাপা দিয়ে রেখেছিলেন, হৃদয় খুঁড়ে সেই বেদনাই জাগিয়ে তুলছেন তারা। সেসব লেখা পড়ে আমার মাথায় প্রশ্ন ঘুরছে, কোন সমাজে বাস করছি আমরা? বুয়েটের ছাত্র মানেই মেধাবী একজন মানুষের একটা ইমেজ তৈরী হয় চোখের সামনে, সেটাকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে এই লেখাগুলো। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে দেশের সেরারাই ভর্তি হয় বুয়েটে, তাদের মধ্যেই একদল যখন এমন নৃশংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, তখন বিস্ময় আকাশ ছোঁয়াটাই স্বাভাবিক।

ঢাকার বাইরে থেকে আসা ছাত্রদের আবাসনের জন্যে হলই একমাত্র ভরসা। আর সেই ভরসার জায়গাটাই আবরারদের জন্যে পরিণত হয় আতঙ্কের এক অভয়ারণ্যে। দিনের বেলায় খুব একটা ঝামেলা হয় না, কিন্ত রাত নামলেই হলগুলোর চেহারা বদলে যেতে থাকে। বড়ভাইদের রুমে ডাক পড়ে জুনিয়রদের, বিচার বসে, সেখানে বাদী সিনিয়রেরা, বিচারকও তারাই। অভিযোগ আসে, জুনিয়র হয়ে সিনিয়রকে কেন সালাম দেয়া হয়নি, কেন বড়ভাইকে দেখার পরেও অমুক ছেলেটা বসেছিল, কেন অমুক বিষয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে- এসব হচ্ছে অপরাধ। শাস্তির মাত্রাটাও নির্ধারণ করে দেন ওই বড় ভাইয়েরাই।

শুরুটা হয় চড়-থাপ্পড় দিয়ে। একজন একজন করে নিজেদের হাতের শক্তি পরীক্ষা করেন। তারপর আসে কোমরের বেল্ট, ক্রিকেট স্ট্যাম্প, লাঠি। এমন নয় যে দু’চার মিনিট পেটালাম আর ক্ষোভ মিটে গেল। এরা মারে মনের খুশিতে, উদ্দেশ্য থাকে, এই বেয়াদবকে শিক্ষা দিতে হবে। একজনের দম ফুরিয়ে গেলে আরেকজন আসেন, কিন্ত মারধর চলতে থাকে ননস্টপ।

মাঝখানে আহত ছেলেটাকে খাওয়ানো হয়, পানি দেয়া হয়, তারপর শুরু হয় আবার মারধর। আর এরা জানে, কোথায় কিভাবে আঘাত করতে হবে। কোমরের নিচের অংশ, পায়ের তালু- যেগুলো মানুষকে সহজে দেখানো যাবে না, এমন জায়গাগুলোই থাকে এদের টার্গেটে। পরদিন পরীক্ষা থাকুক কিংবা ছেলেটা হোক অসুস্থ, নির্যাতনের মাত্রা তাতে কমবেশি হয় না মোটেও। হিটলারের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের নির্যাতকেরা বোধহয় এতটা অমানুষ ছিল না, এরা যতো বড় অমানুষ।

বেসরকারী এক টিভি চ্যানেলের এক টক-শোতে ডাকা হয়েছিল আবরারের এক সহপাঠীকে। তিনিই বলছিলেন, আবরারকে যে কক্ষে নিয়ে পেটানো হয়েছে, সেই ২০১১ নম্বর রুম এবং পুরো ব্লকটিকেই তারা অভিশপ্ত হিসেবে ভাবেন। কারণ এখানে নিয়ে রোজই ছাত্রদের অত্যাচার করা হয়। এখানে কারো ডাক পড়লেই তারা বুঝে না, আজ এই ছেলের কপালে পিটুনি আছে। এই কক্ষেই থাকতেন বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, যাকে আবরার খুনের দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যাকে তাকে শিবির আখ্যা দিয়ে পেটানোর বহু নজির আছে এই কক্ষে।

আবরারের লাশের কিছু ছবি আমরা দেখেছি ফেসবুক আর পত্রিকায়, আঘাতের চিহ্ন জ্বলজ্বল করছে হাতে, পিঠে। কিন্ত আবরারের সেই বন্ধু দাবী করেছে, আঘাতের ভয়াবহতার পাঁচ শতাংশও আমরা দেখিনি। আবরারের মৃতদেহের পুরোটা যারা দেখেছে, তারা জানে কি ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়েছিল ছেলেটার ওপরে। সাপে কামড়ানো রোগীর মতো নীল হয়ে উঠেছিল তার শরীরের নিচের অংশ, কোমর থেকে পা পর্যন্ত ফুলে ঢোল হয়ে গিয়েছিল, রক্ত জমাট বেঁধে থাকা মারের কালসিটে দাগগুলো দেখে মনে হচ্ছিলো, চামড়ার ওপরে কেউ যেন কালো রঙ করে দিয়েছে।

বুয়েটের হলে হলে নিয়মিতই নির্যাতন চলে, যারা হলে থাকে, তারা এটাকে নিয়তি বলেই ধরে নেয়। এসব ‘কাজে’ ব্যবহারের জন্য স্টাম্প ও লাঠি প্রস্তুত রাখে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। বুয়েটের মোট আটটি হলের মধ্যে তিনটি হলে অন্তত সাতটি টর্চার সেল আছে বলে জানিয়েছে ছাত্ররা। নিজের বন্ধুকে, রুমমেটকে ডেকে নিয়ে পেটানো হচ্ছে, কিন্ত অন্য ছাত্ররা এসবের প্রতিবাদ করার সাহস পায় না, কারণ প্রতিবাদ করলেই নেমে আসবে অত্যাচারের খড়্গ, শুওরের পাল তো দলবেঁধে চলে, তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কি চাট্টেখানি কথা?

buet

সব মিলিয়ে বুয়েট ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ভয়ের ব্যাপার হয়ে উঠেছে গত সাত-আট বছর ধরেই। তবে আপনারা যদি ভেবে থাকেন যে ছাত্রলীগ একাই এসব নির্যাতন করে, তাহলে ভুল। বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে ছাত্রদল করে, শিবির করে। ক্ষমতা পাল্টায়, ক্ষমতাবানের আচরণ তো বদলায় না।

আজ যখন আমরা জানতে পারছি যে ফেসবুকে সরকারী নীতির সমালোচনা করায় এর আগেও অনেককে পেটানো হয়েছিল, ফুটবল খেলায় সিনিয়র দলের বিপক্ষে গোল দেয়ায় কাউকে রুমে আটকে রেখে অত্যাচার করা হয়েছিল, সিনিয়রকে সালাম না দেয়ায় কাউকে মেরে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল, পরে তাকে শিবির অপবাদ দিয়ে ক্যাম্পাসছাড়া করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তখন অবাক লাগে, সত্যিই অবাক লাগে।

মেধাবীদের আস্তানা নামে যে জায়গাটাকে পুরো দেশ চেনে, সেটা যে একটা মধ্যযূগীয় নির্যাতনের কারখানায় পরিণত হয়েছে, সেই তথ্যটা আমরা জানতাম না। এর আগে আবরারের মতো কেউ মার খেয়ে মরে যায়নি, একারণেই হয়তো শুভ্র জ্যোতি টিকাদার বা আশিকুল ইসলাম বিটুদের মতো অমানুষেরা পার পেয়ে গেছে এতদিন, সাধারণ ছাত্রদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েও বুক ফুলিয়ে ক্যাম্পাসে হেঁটে বেড়িয়েছে।

অনেকেই জানতে চাইবেন, বুয়েটের প্রশাসন বা শিক্ষকেরা কি এসব কিছুই জানতেন না? সবই জানতেন তারা, এখনও জানেন। নির্যাতিত ছাত্ররা অভিযোগ করার পরে দলকানা শিক্ষক উল্ট তাকেই গালমন্দ করে বলেছেন- ‘তুমি একটু ওদের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারো না? এত ঝামেলা সৃষ্টি করো কেন?’- এমন নজিরও আছে। যাদের এসব দেখার কথা ছিল, তারা প্রশ্রয় দিয়ে গেছেন, কখনও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি এসবের বিরুদ্ধে, কে জানে, অতীতে ব্যবস্থা নিলে হয়তো আবরারকে মরতে হতো না, আজ অজস্র এক্স-বুয়েটিয়ানকে নিজেদের রোমহর্ষক অতীত অভিজ্ঞতা টেনে আনতে হতো না।

আজ বুয়েট উত্তপ্ত, অগ্নিগর্ভ, নির্যাতিত ছাত্ররা আজ ফুঁসছে তাদের ওপর হওয়া অত্যাচার বন্ধ করার দাবীতে। হলের র‍্যাগিং বন্ধ করার দাবী তুলেছেন তারা, অতীতে হওয়া নির্যাতনগুলোর বিচার চাইছেন। আমরাও চাই, প্রতিটা নির্যাতনের ঘটনার বিচার হোক, একটা অপরাধী হায়েনাও যেন ছাড় না পায়। বুয়েট একটা আবেগের না্ম, একটা সম্মানের নাম। সেই সম্মানের গায়ে কালিমা যারা লাগিয়েছে, এমন অপরাধী একজনকেও যেন ছাড় না দেয়া হয়। এবার যদি না হয় তো কখনোই হবে না। বুয়েট দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, কোন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প তো নয়।

Facebook Comments

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button