ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

হত্যাকারী ব্রেন্টনের সাথে আমি নৈকট্য অনুভব করি…

নিউজিল্যান্ডের মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর সেখানে এক চমৎকার মানবতার দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিজাব পরে মিডিয়াতে এসেছেন, দেশটির নারীরা একদিন হিজার পরার ঘোষণা দিয়েছেন, আযান প্রচারিত হচ্ছে, নামাযের সিজদার ভঙ্গীতে মাটিতে মাথা ঠেকিয়েছেন অসংখ্য অমুসলিম, খেলার মাঠে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে অসংখ্য মানুষ গলা মিলিয়েছেন, মসজিদের বাইরে অমুসলিমরা মানববর্ম রচনা করেছেন নামাযিদের নিরাপত্তার জন্য। যে একজন সিনেটর রেসিস্ট মন্তব্য করেছিল, এক তরুণ তার মাথায় প্রকাশ্যে ডিম ফাটিয়ে ‘দি এগ বয়’ খেতাব পেয়ে গেছেন! এই কাজের জন্য তিনি যে অনুদান সাহায্য পেয়েছেন, সেই অর্থ তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের দিয়ে দেবার ঘোষণা দিয়েছেন।

এগুলো সবই সভ্য মানুষের, সভ্য জাতির কাজ৷ একটি সভ্য মানবিক সমাজে এমনটাই হওয়ার কথা। এই যে সেখানে সবাই দলে দলে হিজার পরছে, আযান দিচ্ছে- এর মানে কি সবাই দলে দলে মুসলিম হয়ে গেছে? না। এতে কি তারা নিজেরা ধর্মহীন হয়ে গেছে? না। তারা এগুলো করেছে তাদের দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে সাহস দেবার জন্য, তাদের এটা বলার জন্য যে- ‘তোমরা একা নও৷ আমরা সবাই তোমাদের পাশে আছি’। এই ঘটনায় স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা আর ভীতির জন্ম হয়েছে, যে অবিশ্বাসের জন্ম হয়েছে- সেটাকে দূর করার জন্য দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ মুসলিমদের এই প্রতীক নিজেদের মধ্যে ধারণ করেছে প্রেম, মানবতা আর সহমর্মীতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে৷

মুসলিম প্রধান দেশ হওয়াতে আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ এসব কাজে বেশ খুশি৷ তারা বেশ আগ্রহের সাথে এসব খবর শেয়ার দিচ্ছেন ৷ নিউজিল্যান্ডের ঘটনায় আমাদের কি কিছু করার আছে? না নেই৷ আমাদের যেটা করার আছে, সেটা হচ্ছে আমাদের নিজেদের দেশে যেন এমন না ঘটে সেটা নিশ্চিত করা, যে ঘৃণাবাদ থেকে এসব সন্ত্রাসের জন্ম সেই ঘৃণাবাদকে প্রত্যাখ্যান করা৷ কিন্তু হায়, আমাদের মানসিকতা তো নিউজিল্যান্ডের সাধারণ মানুষের থেকে ঐ ঘৃণাবাদের চর্চাকারী- হত্যাকারী সন্ত্রাসীর সাথে বেশি নিকটবর্তী!

এই দেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উপরে রুটিন মাফিক হামলা হয়। মন্দিরে মণ্ডপে প্রতিমা ভাঙচুর দেখে আমরা বুঝতে পারি সামনে পূজা আসছে! পাড়া ধরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও আমরা দেখেছি। রামুতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপরে নৃশংস হামলার পর আমার উচ্চশিক্ষিত বন্ধুদেরকেও বলতে শুনেছি, “মায়ানমারে বৌদ্ধরা মুসলিমদের সাথে যা করে, তাতে ঠিকই হইছে একদম”! এদেশে ওয়াজ মাহফিল গুলোতে অসভ্য ইতর চরিত্রের লোক গুলো ক্রমাগত ভিন্ন ধর্মাবলম্বী, অমুসলিমদের উপরে উদগীরণ করে ঘৃণার বাক্য সমূহ। একের পর এক মুক্তচিন্তার মানুষ গুলোকে নির্মম ভাবে কুপিয়ে হত্যা করার পর দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে দায়িত্বশীল সকলে উপদেশ দেন ‘সংযত হয়ে লেখালেখি’ করতে! দেশের জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে ছোট ছোট বাচ্চাদের শেখানো হয় যে অমুসলিম মানেই খারাপ, বিপথগামী, বাজে চরিত্রের মানুষ। আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ গুলো অত্যাচারের শিকার হবার পাশাপাশি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষিতের থেকে ‘নাক বোচা’ ‘চাইনিজ’ ইত্যাদি অভিধায় হাসাহাসির বিষয়বস্তু হিসেবে পরিগনিত হয়। পুলিশের সহযোগিতায় সন্ত্রাসীরা পুড়িয়ে দেয় সাওতাল গ্রাম৷

চাইলে এমন হাজারো উদাহরণ দেয়া যায়। কিন্তু আলাদা করে উদাহরণ দেয়ার দরকার আছে কি? আমাদের চরিত্র তো আমরা নিজেরাই ভালো মত জানি। আমাদের দেশের হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষদের মনে যে নিরাপত্তাহীনতা আর অবিশ্বাসের জন্ম হয়েছে, আমরা তা দূর করতে পারিনি। একজন পাহাড়ি বা একজন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছে আমরা এই বার্তাটুকু পৌছে দিতে ব্যর্থ হয়েছি যে, ‘হামলাকারীরা সংখ্যায় কম, আমরা অধিকাংশ মানুষ তোমাদের পাশে আছি’। নিউজিল্যান্ডের মানুষ যে মানবতার চর্চাটুকু করছে সেই চর্চা আমরা কখনই, কোনদিনও করতে পারিনি। বরঞ্চ যে ঘৃণাবাদ থেকে একজন সাদা চামড়ার তথাকথিত ‘হোয়াইট সুপ্রিমেসি’ তে বিশ্বাসী সন্ত্রাসী মসজিদে হামলা চালিয়ে নির্বিকার ভাবে এতগুলো মানুষকে মেরে ফেললো, সেই একই ঘৃণাবাদের চর্চা, সেই একই ঘৃণাবাদের বীজ আমাদের মাটিতে চাষ হচ্ছে, বেড়ে উঠছে বিপজ্জনকভাবে।

কিন্তু আমাদের ‘সচেতন’, ‘মানবিক’, ‘শিক্ষিত’ মানুষেরা কি তাদের ভূমিকা ঠিকমত পালন করছেন? নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর মত হিজাব পরা ছাড়ুন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী যদি স্রেফ নমস্কারের ভঙ্গিতে একটা ছবিও তোলেন তাতেই দেখা যাবে ‘কুরান অশুদ্ধ হয়ে গেছে’। নিউজিল্যান্ডের অমুসলিমদের মত আযান দেয়ার মত না হোক, আমাদের খেলোয়াড় বা অভিনেতারা স্রেফ পূজার শুভেচ্ছা জানালেও তাদের চোদ্দগুষ্টির নাম ভুলিয়ে দেয়া হয়! বড়দিনে ‘মেরি ক্রিসমাস’ বললে আমাদের ধর্ম চলে যায়৷ হিন্দু ধর্মালম্বীদের পুজোতে ঘুরতে গেলেও নাকি কাফির হয়ে যাই আমরা!

নিউজিল্যান্ডের প্রেক্ষাপটে মসজিদে এই হামলার ঘটনা আক্ষরিক অর্থেই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা৷ যতদিন না আমাদের এখানে প্রতিমা ভাঙচুর- মন্দিরে হামলা- ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপরে হামলা এসব ঘটনা একেবারে বন্ধ না হবে বা বিচ্ছিন্ন ঘটনায় পরিণত না হবে, যতদিন না নাস্তিক মুক্তচিন্তার লেখকদের উপর হামলা বা হামলার চেষ্টা হলে সবাই ‘যদি কিন্তু তবে’ ছাড়া প্রতিবাদ করতে পারবে, যতদিন না ধর্ম- জাতি নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিক সমান সুযোগ লাভ করবে ততদিন আসলে আমাদের বহির্বিশ্বের এসব ঘটনা নিয়ে প্রতিবাদ করা সাজে না৷ জানি এসব আশাবাদ ইউটোপিয়ান কল্পনা মাত্র, এদেশে এমনটা হবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

নিউজিল্যান্ডের সর্বস্তরের মানুষের এই যে মুসলিমদের পাশে দাঁড়ানোর বিভিন্ন পদক্ষেপ, এর থেকেও আমরা কিছুই শিখবো না। এর মধ্যেও আমরা ধর্মের মহত্ত্ব খুঁজে পাবো, ইসলামের বিজয় আবিষ্কার করবো কিন্তু মানবতার শিক্ষা, ভালোবাসার উদাহরণটুকু আমাদের চোখে পড়বে না। কারণ ঐ যে, আমাদের মানসিকতা নিউজিল্যান্ডের সাধারণ মানুষ কিংবা মসজিদে নিহত মানুষ গুলোর তুলনায় হত্যাকারী ব্রেন্টনের কাছাকাছি অঞ্চলেই বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে যে!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button