খেলা ও ধুলা

কী হতো এই ম্যাচটি ফাইনালে হলে!

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি ভক্ত-সমর্থকের চাওয়া, ষষ্ঠবারের মত বিশ্বকাপ ট্রফিটি ঘরে তুলুক ব্রাজিল। শুক্রবার প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ে যদি হেরে বসে ফ্রান্সের কাছে, তাহলে কাজানে বেলিজিয়ামের বিপক্ষে ব্রাজিলকে মাঠে নামতে হবে লাতিন আমেরিকার সর্বশেষ আশা ভরসার প্রতীক হিসেবেও।

কিন্তু সে কাজটি কি খুব সহজ হবে ব্রাজিলের পক্ষে? সেজন্য যে তাদেরকে নিজেদের সাম্প্রতিক অতীতের ধারাপাত ভেঙেও বেরিয়ে আসতে হবে। ২০০২ সালের পর থেকে বিশ্বকাপের নক আউট পর্বে কোন ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে জয়ের দেখা পায়নি সেলেসাওরা। সেমিফাইনালে পৌঁছাতে চাইলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে এবার সেই কাজটিই করে দেখাতে হবে তাদেরকে।

২০০২ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানিকে ২-০ ব্যবধানে হারানোর পর, টানা তিনটি বিশ্বকাপে ইউরোপীয় দলের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। ২০০৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তারা হেরে গিয়েছিল ফ্রান্সের কাছে, যারা শেষ পর্যন্ত সে আসরের রানার্স আপ হয়েছিল। ২০১০ সালেও তারা বিদায় নিয়েছিল শেষ আট থেকেই। সেবার তাদেরকে হারতে হয়েছিল নেদারল্যান্ডসের কাছে। এবং নেদারল্যান্ডসও সেবারের আসরের রানার্স আপই হয়েছিল। আর ঘরের মাঠে সর্বশেষ ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তো তারা ৭-১ গোলে নাস্তানাবুদ হয়েছিল আসরের চূড়ান্ত বিজয়ী জার্মানির কাছে।

তবে ব্রাজিলের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় হলো, বিশ্বকাপে দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলোর বিপক্ষে বেলজিয়ামেরও রেকর্ড একেবারেই বাজে। তারাও কখনোই বিশ্বকাপের নক আউট পর্বে কোন দক্ষিণ আমেরিকার দলের বিপক্ষে জয়ের দেখা পায়নি। জয় তো দূরে থাক, তারা এমনকি কোন গোলও দিতে পারেনি! সর্বশেষ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালেও তারা ১-০ ব্যবধানে হেরে গিয়েছিল আর্জেন্টিনার কাছে।

আর্জেন্টিনার কাছে হেরে বিদায় নেয়া সেই বেলজিয়াম দলটির অধিকাংশ সদস্যই এবারের বিশ্বকাপেও রয়েছে। এবং এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে তারা বেশ ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়ে এসেছে। গ্রুপ পর্বে তিনটি ম্যাচেই যেমন জয়ের দেখা পেয়েছে, তেমনি রাউন্ড অফ সিক্সটিনে জাপানের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পরও ম্যাচের একদম অন্তিম মুহূর্তে রোমাঞ্চকর এক কাউন্টার অ্যাটাকের মাধ্যমে জাপানের জালে তৃতীয়বারের মত বল জড়িয়ে জয় ছিনিয়ে এনেছে তারা।

সকলেই এতদিনে জেনে গেছেন, বেলজিয়ামের এই দলটিকে বলা হচ্ছে তাদের সোনালী প্রজন্ম। এবং ধারণা করা হচ্ছে এই সোনালী প্রজন্মের জন্য বিশ্বজয়ের এটিই শেষ সুযোগ। এই দলটিতে এক কথায় যেন বসেছে তারার মেলা। গোলরক্ষক হিসেবে রয়েছেন থিবো কর্তোয়া। মধ্যমাঠে রয়েছেন কেভিন ডি ব্রুইন ও এডেন হ্যাজার্ড। রোমেলো লুকাকু আছেন অগ্রভাগে।

সবমিলিয়ে বেলজিয়ামের এই দলটির মধ্যে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মত সকল রসদই বিদ্যমান। কিন্তু ২০১৪ বিশ্বকাপে হতাশাজনক বিদায়, আর ২০১৬ বিশ্বকাপে ওয়েলসের কাছে হতবুদ্ধিকর পরাজয়ের ফলে অনেকের মধ্যেই সংশয় সৃষ্টি হয়েছে এই দলটির কার্যকারিতা নিয়ে।

জাপানের বিপক্ষে তাই দলটি যখন ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েছিল, অনেকেই ধরে নিয়েছিল যে হয়ত আরও একবার সমর্থকদের আশার আলো দেখিয়েও শেষমেষ নিরাশার অন্ধকারে ঠেলে দেবে তারা। কিন্তু ইতিহাসের অনেক হিসাব-নিকাশই পাল্টে দিয়ে, চমকপ্রদ এক জয় পায় তারা। ১৯৭০ সালে পশ্চিম জার্মানি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুই গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত জয়ের দেখা পেয়েছিল। কিন্তু সেজন্য খেলা গড়িয়েছিল অতিরিক্ত সময়ে। নির্ধারিত নব্বই মিনিটের মধ্যেই বিশ্বকাপে এ কীর্তি শেষ গড়েছিল পর্তুগাল। ১৯৬৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে তিন গোলে পিছিয়ে পড়েও শেষ হাসি হেসেছিল তারা।

বেলজিয়াম বনাম ব্রাজিল, বেলজিয়াম বনাম জাপান, ২০১৮ বিশ্বকাপ

জাপানের বিপক্ষে টানটান উত্তেজনার সেই ম্যাচে অসাধারণ হার-না-মানা মানসিকতার প্রদর্শন করে জয় পাওয়ায় বেলজিয়াম শিবিরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে নতুন করে আত্মবিশ্বাসের চোরাস্রোত বয়ে গেছে, আর সেই আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে নতুন আঙ্গিকে উজ্জীবিত হয়ে তারা মাঠে নামবে ব্রাজিলের বিপক্ষে, সে কথা নিঃসন্দেহে বলে দেয়া যায়। এবং তাদের চোখও যে থাকবে ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উত্তরণের, তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে!

অধিনায়ক হ্যাজার্ড তাই ম্যাচ শেষে বলেছিলেন, “হয়ত ভবিষ্যতে যাতে কাজে লাগাতে পারি, সেজন্য এমন একটি ম্যাচ আমাদের দরকার ছিল।”

এদিকে কোচ রবার্তো মার্তিনেজের বিপক্ষে দল সাজানো নিয়ে যত অভিযোগই থাকুক, জাপানের বিপক্ষে ম্যাচে সফল দুইটি সাবস্টিটিউশনের মাধ্যমে প্রশংসার জোয়ারে ভেসেছেন তিনি। বদলী হিসেবে মাঠে নামানো মারুয়ান ফেলাইনি আর ন্যাসের চ্যাডলী দুজনেই যে গোল পেয়েছেন, সেই কৃতিত্বের অনেকটাই ভাগিদার মার্তিনেজও।

বেলজিয়াম বনাম ব্রাজিল, বেলজিয়াম বনাম জাপান, ২০১৮ বিশ্বকাপ

তবে জাপানের বিপক্ষে পরিষ্কার ফেবারিট হিসেবে মাঠে নামলেও, কাজানে ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচে তার দলকে আন্ডারডগ হিসেবে ধরে নেয়াই ভালো হবে বলে মার্তিনেজের বিশ্বাস। পাশাপাশি তিনি এটিও মনে করেন যে প্রত্যাশার চাপ কম থাকার ফলেই এ ম্যাচে তার দল অনেক বেশি নির্ভার ও স্বাধীনভাবে নিজেদের খেলাটি খেলতে পারবে।

“আমার মনে হয় যেকোন ছোট বাচ্চাই স্বপ্ন দেখে বিশ্বকাপে অংশে নেয়ার, এবং কোয়ার্টার ফাইনালের মত বড় ম্যাচে ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করার। আমাদের খেলোয়াড়দের জন্য সেই স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে। তাই ম্যাচের প্রথম সেকেন্ড থেকেই আমরা খেলাটিকে উপভোগ করতে পারব।”

তবে ব্রাজিল কোচ তিতে এ ধরণের কোন ধারণায় বিশ্বাসী নন। অনেকেই ব্রাজিলের হেক্সা জয় নিশ্চিত বলে ধরে নিলেও, সামগ্রিক বিশ্বকাপে তো নয়ই, এমনকি বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচেও নিজেদের ফেবারিট বলে মানতে নারাজ তিনি। তার মতে, “সবার সামনেই সমান সুযোগ রয়েছে। যেকোন কিছু হতে পারে।”

ব্রাজিল, বিশ্বকাপ ফুটবল, নেইমার, মেক্সিকো, উইলিয়ান

এ ম্যাচের বিজয়ী দল ফ্রান্স কিংবা উরুগুয়ের বিপক্ষে সেইন্ট পিটার্সবার্গে সেমিফাইনাল খেলবে আগামী মঙ্গলবার।

এখন পর্যন্ত এবারের আসরে সবচেয়ে বেশি গোল করেছে বেলজিয়াম, মোট ১২টি। রোমেলো লুকাকুর একার পা থেকেই এসেছে চারটি গোল। তবে তার আরও সাত সতীর্থও নাম লিখিয়েছেন স্কোরশিটে।

অপরদিকে এখন পর্যন্ত নিজেদের রক্ষণভাগই ব্রাজিলের সবচেয়ে শক্তির জায়গা। চার ম্যাচ শেষে উরুগুয়ের পাশাপাশি তারাই সবচেয়ে কম একটি গোল হজম করেছে। তবে ব্রাজিলের আক্রমণভাগকে এখনও পুরোপুরি জ্বলে উঠতে দেখা যায়নি, যা টুর্নামেন্টের আগামী দিনগুলোতে তাদের চিন্তার কারণ হতে পারে।

বেলজিয়াম ম্যাচের আগে আরও একটি বিষয় নিয়ে চিন্তার ভাঁজ পড়তে পারে ব্রাজিল সমর্থকদের কপালে। মেক্সিকোর বিপক্ষে দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে দ্বিতীয়বারের মত হলুদ কার্ড দেখায় এ ম্যাচে অনুপস্থিত থাকবেন মধ্যমাঠের খেলোয়াড় ক্যাসিমিরো। এতদিন ব্রাজিল রক্ষণের সামনে শক্ত দেয়াল গড়ে তুলেছিলেন তিনি। তাই নিঃসন্দেহে তার অভাব অনুভূত হবে ব্রাজিলের খেলায়। তার পরিবর্তে ফার্নান্দিনহোকে শুরুর একাদশে নেয়া হতে পারে।

ব্রাজিল, বিশ্বকাপ ফুটবল, নেইমার, মেক্সিকো, উইলিয়ান

যেমনটি দেখা গেছে ব্রাজিলের গত চারটি ম্যাচে, বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচেও সবার নজর থাকবে ব্রাজিল ফরওয়ার্ড নেইমারের দিকে। এবং সেটি শুধু তার অসাধারণ গতি আর খেলোয়াড়ি দক্ষতার জন্যই নয়, পাশাপাশি মাঠে তার বিতর্কিত অভিনয়শৈলী প্রদর্শনের কারণেও।

তবে নেইমারকে সাবধান থাকতে হবে যেন তিনি আরেকবার হলুদ কার্ড দেখে না বসেন। কারণ তাহলে ব্রাজিল যদি সেমিফাইনালে ওঠেও, সেখানে দেখা যাবে না তাকে। একই আশঙ্কা রয়েছে ফিলিপে কৌতিনহো আর ফিলিপে লুইসের সামনেও। অপরদিকে বেলজিয়ামের জান ভার্টোঙ্গন আর ডি ব্রুইনও একটি করে হলুদ কার্ড দেখেছেন।

পরিশেষে বলা যায়, কাজানে দুর্দান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি ম্যাচের অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্ববাসী, যেখানে র‍্যাংকিং এর দ্বিতীয় স্থানে থাকা দলটি মুখোমুখি হবে তৃতীয় স্থানে থাকা দলটির। টুর্নামেন্টের ফরম্যাটই এরকম, তাই এ ব্যাপারে কিছু বলার নেই কারও। তবু ব্রাজিল-বেলজিয়াম ম্যাচটি দেখতে দেখতে অনেক ফুটবল রোমান্টিক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতেই পারেন, “কী হতো এই ম্যাচটি ফাইনালে হলে!”

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button