খেলা ও ধুলা

হলো না তোমাকে পাওয়া…

ইডেন গার্ডেনে সেদিন ইংল্যান্ড জিতে গেলে তা থাকতো খুব সাধারণ এক ঘটনা হয়ে। সবকিছু প্রেডিক্টেবল হয়ে গেলে, ক্রিকেট সম্ভবত মুচকি হাসে। অজানা অচেনা এক ছেলেকে তাই অসাধারণ করে তুললো ক্রিকেট। তা করেই ক্ষান্ত হলো না, মানুষ অনন্তকাল যেন তা মনে রাখতে পারে তার আয়োজনও চূড়ান্ত হলো ভরাট এক কন্ঠস্বরে। লোকটা বললেন, ‘Carlos Brathwaite! REMEMBER THE NAME!’

কিংবদন্তী হয়ে গেল এই একটি লাইন, কার্লোস ব্রাথওয়েট জায়গা পেয়ে গেল ক্রিকেটের অনাদিকালের বিশাল খাতার এক রঙিন পাতায়। স্যার সোবার্স, ডেসমন্ড হেইন্স, গ্রিনিজ, জোয়েল গার্নার, ম্যালকম মার্শাল, এভারটন উইকস, স্যার ফ্রাংক ওরেলদের দেশ বার্বাডোজ পেল রাত দিন উৎসব করার এক দারুণ উপলক্ষ। সারা ওয়েস্ট ইন্ডিজে বাজলো বাশি আর বাদ্যের সুর, পানশালাগুলো চাহিদা আর যোগানের হিসেব দিতে হিমশিম খেয়ে গেলো।

এমন ‘সাধারণ’ একজনের অনন্যসাধারণ কীর্তিতে আগে কখনো ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ এমন আনন্দে মেতেছে কিনা, তা কেউ মনে করতে পারলোনা। কার্লোস ব্রাথওয়েট আদতে খুব সাধারণ একজন ক্রিকেটার। না আপনি তাকে ব্যাটসম্যান বলবেন, না কেউ বলবে সে বোলার। তবে তার শরীরের জোর নিয়ে কেউ কোন প্রশ্ন তুলতে পারবেনা। অদ্ভুত এক গ্রিপে ব্যাট ধরেন, পেটাতে পারেন মাঠের আনঅর্থোডক্স সব জায়গায়। কিন্তু উইকেটে তার স্থায়িত্ব হয় ক্ষণস্থায়ী। পরের তিন বছরে বলার মত কোন ছাপ রাখতে পারলেন না কোথাও।

কার্লোস ব্রাথওয়েট
Image source – Twitter

কাল পারলেন। ইডেনের পরে ম্যানচেস্টার শহর দেখলো ব্রাথওয়েটের ব্যাটকে তরবারি হয়ে উঠতে। ২৯১ এর দিকে ছুটতে গিয়ে মুহূর্তেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ হয়ে যায় ১৪২/২ থেকে ১৬৪/৭। ব্রাথওয়েট তখন সব হারানো এক ওয়ারিয়র, হারানোর ভয় তুচ্ছ করে তাই ছুটলেন এক অসম্ভবের পিছে, সঙ্গী কেমার রোচ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২১১/৮। ২৪৫ রানে ফিরলেন কিছু সময় সাহস হয়ে থাকা মিলিটারিম্যান শেলডন কটরেল। এক ওভারে তুলে নিলেন পঁচিশটি রান, ম্যাট হেনরি তখন দিশেহারা উদভ্রান্ত এক বোলার। ইডেনের সেই কন্ঠস্বরই তখন কমেন্ট্রিবক্সে, বলে চলেছেন মাঠে আসা দর্শকদের নিয়ে, ‘These wives and girlfriends are having different types of emotions right now.’ কিছু সময় আগেও এই মুখগুলিতে যে হাসি ছিলনা!

প্রথম পেলেন এই স্বাদ, সেঞ্চুরি হলো তার। উৎযাপন করলেন। করল ওল্ড ট্রাফোর্ডে আসা প্রতিটা মানুষ। চূড়ান্ত শিখর তখনো ছোঁয়া হয়নি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২৮৬/৯, লাগবে ঠিক ছয়টি রান। টাইমিং কি একটু গড়বড় হয়ে গেল?

কার্লোস ব্রাথওয়েট

বল তবুও উড়ে যাচ্ছে সীমানা পেরিয়ে, ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখতে। কোত্থেকে এসে বাঁধা হয়ে গেলেন ট্রেন্ট বোল্ট, বল হাতে যিনি ছিলেন দিনের সেরা হয়ে। ইয়ান বিশপ, যিনি হয়ত আরেকটা ক্লাসিক লাইন সৃষ্টিতে তৈরিই ছিলেন, বললেন- ‘The dream has diminished for Carlos Brathwaite.’

 

কিউইরা যখন উৎযাপনে ভেসে যাচ্ছে, যাদের আটকে থাকা নিঃশ্বাস পেয়েছে আবার অক্সিজেনের দেখা, তখন পাশে হাঁটু গেড়ে বসে গেলেন কার্লোস ব্রাথওয়েট। পারলেন না আরো এক রঙিন পাতায় ছবি আকতে। ক্রিকেট যেন আশ্চর্য রকমের এক সমতা এনে দিল।

carlos bratheaite কার্লোস ব্রাথওয়েট
Image source – ICC

ম্যানচেস্টারের মাটি ততক্ষণে তাকে আপন করে নিয়েছে। মাঠে আসা সৌভাগ্যবান প্রতিটা মানুষ দেখে নিল মানুষের সামর্থ্যের অপরিসীম সীমা। শেষ আচড় টানতে পারেননি কার্লোস ব্রাথওয়েট, আবার হয়ত অনেক বছর পর এমন স্বপ্নের মত এক ইনিংস খেলবেন। রেখে যাবেন সাধারণ কারো অসাধারণ হয়ে ওঠার এমন আরেক গল্প। বেঁচে থাকুক ক্রিকেটে এমন চরিত্ররা। ক্রিকেট যেন তাতে হয়ে ওঠে আরো আনন্দময়, সুন্দর।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button